রাজ্য রাষ্ট্র কৃত্যক কমিশন 

রাজ্য রাষ্ট্র কৃত্যক কমিশন 

রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের গঠন 

ভারতের সংবিধানের ৩১৫ ( ১ ) নং ধারায় বলা হয়েছে যে প্রতিটি রাজ্যের জন্য একটি করে রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশন থাকবে । সংবিধানের ৩১৫ ( ২ ) নং ধারায় দুই বা ততোধিক রাজ্যের আইন সভার সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে পার্লামেন্টের উদ্যোগে একটি সংযুক্ত রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশন গঠনের কথাও বলা হয়েছে । 

সদস্যদের নিয়োগ , কার্যকাল ও পদচ্যুতি :

সংবিধানের ৩১৬ নং ধারায় রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের গঠন সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে । রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের চেয়ারম্যান এবং অন্য সদস্যরা রাজ্যের রাজ্যপাল কর্তৃক নিযুক্ত হন । সংযুক্ত রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত হয়েছে । কমিশনের কম পক্ষে অর্ধেক সদস্যকে কেন্দ্র বা রাজ্যের সরকারি কর্মচারী হিসেবে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হতে হয় । 

রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের কার্যকালের মেয়াদ ছয় বছর । তবে ৬২ বছর বয়স পূর্ণ হলে সদস্যদের অবসর নিতে হয় । যে কোনো সদস্য স্বেচ্ছায় রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগ পত্র পেশ করতে পারেন । সদস্যদের অপসারণে রাজ্যপালের কোনো ক্ষমতা নেই । তিনি অবশ্য কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চলাকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারেন । 

রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ থাকলে তাঁকে অপসারণ করার জন্য রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের অভিমত গ্রহণ করেন । সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি তদন্ত করে মতামত দিলে তার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে রাষ্ট্রপতি পদচ্যুত করতে পারেন ।

সদস্যদের বেতন , ভাতা ও চাকরির শর্তাদি :

রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের সদস্যদের বেতন , ভাতা ইত্যাদি রাজ্য আইন সভার অনুমোদন সাপেক্ষ ব্যয় হিসেবে ধরা হয় না । রাজ্যের ‘ সঞ্চিত তহবিল ’ থেকে এই অর্থ দেওয়া হয় । রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের সদস্যদের চাকরি সংক্রান্ত শর্তাদি স্থির করেন রাজ্যপাল , কিন্তু নিয়োগের পরে কোনো সদস্যের স্বার্থহানি করে চাকরির শর্ত বদল করা যায় না । রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের চেয়ারম্যান অন্য কোনো রাজ্য বা কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের সদস্য বা চেয়ারম্যান নিযুক্ত হতে পারেন । কিন্তু তিনি রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে অন্য কোনো পদে নিযুক্ত হতে পারেন না এমনকি , কার্যকাল পরিসমাপ্তির পরেও না । 

রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের ক্ষমতা ও কার্যাবলী

সংবিধানের ৩২০ নং ধারায় রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের কার্যাবলির উল্লেখ করা হয়েছে । সেগুলি হল 

কর্মী নিয়োগে ব্যবস্থা গ্রহণ : 

রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের প্রধান কাজ হল রাজ্য সরকারের অধীনে শূন্য পদগুলিতে কর্মী নিয়োগের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করা । 

রাজ্যপালকে পরামর্শ দান : 

রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশন বিভিন্ন বিষয়ে রাজ্যপালকে পরামর্শ দিয়ে থাকে । এই বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে সমস্ত রকম অসামরিক চাকরি এবং অসামরিক পদে নিয়োগের পদ্ধতি সম্পর্কিত বিষয় ; অসামরিক চাকরি ও পদে নিয়োগ , পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণ সহ প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই ও বিচার ; রাজ্য সরকারের অধীনে নিযুক্ত অসামরিক কর্মচারীদের নিয়মানুবর্তিতা সংক্রান্ত বিষয় ; রাজ্য সরকারের অধীনে অসামরিক পদে কর্মরত অবস্থায় কোনো কর্মী আঘাত প্রাপ্ত হলে তার ক্ষতিপূরণ সম্পর্কিত দাবিদাওয়ার বিচার বিবেচনা ; রাজ্য সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে রুজু করা মামলার ব্যয় নির্বাহ ইত্যাদি । 

রাজ্যপাল কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজন মনে করলে রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের পরামর্শ গ্রহণ করতে নাও পারেন । কোন্ কোন্ বিষয়ে তিনি পরামর্শ গ্রহণ করবেন না , সে সম্পর্কে নিয়মাবলি তৈরি করে যথা শীঘ্র সম্ভব সেগুলিকে অনুমোদনের জন্য রাজ্য আইনসভার কাছে পেশ করতে হয় । 

রাজ্য সরকারকে পরামর্শদান : 

সংবিধানের ৩২০ নং ধারা অনুসারে , রাজ্য সরকার তাদের কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণ , নিয়োগ পদ্ধতি , বদলি ও পদোন্নতি সম্পর্কিত নীতি নির্ধারণের বিষয়ে ; সরকারি কাজে শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখার বিষয়ে ; আইন ভঙ্গের অপরাধে সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের পরামর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য । তবে সংবিধানের ৩৩৫ নং ধারা অনুযায়ী , সরকারি চাকরিতে তপশিলি জাতি ও উপজাতি এবং অনগ্রসর শ্রেণির আসন সংরক্ষণের ব্যাপারে রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের পরামর্শ গ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই । 

অর্পিত দায়িত্ব পালন : 

সংবিধানের ৩২১ নং ধারা অনুসারে , রাজ্য আইনসভা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের কাজের বিষয়ে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ , কর্পোরেশন ও সরকারি সংস্থার কার্য সংক্রান্ত বিষয়ে রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনকে কিছু অতিরিক্ত দায়িত্ব দিতে পারে । 

প্রতিবেদন পেশ : 

সংবিধানের ৩২৩ নং ধারা অনুযায়ী , প্রতি বছর রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশন রাজ্যপালের কাছে তাদের বাৎসরিক কার্যাবলির প্রতিবেদন পেশ করে থাকে । রাজ্যপাল সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনটির একটি প্রতিলিপি রাজা আইনসভায় আলোচনার জন্য দাখিল করেন । এ ছাড়া কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে , কী কী কারণে , রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের সুপারিশ বা পরামর্শ গ্রহণ করা হয়নি তার বিবরণীও তিনি উপস্থাপন করেন । 

উপসংহার 

রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের কাজকর্মের মূল্যায়ন করতে গিয়ে প্রথমেই উল্লেখ করা যায় যে , কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের মতো রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশন একটি পরামর্শদাতা সংস্থা মাত্র । কমিশনের সুপারিশ গ্রহণের বিষয়ে রাজ্য সরকারের ওপরে কোনো বাধ্যবাধকতা সংবিধানে আরোপ করা হয়নি । 

পরিশেষে বলা যায় , রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের কর্মকুশলতা অনেকটাই সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের সদর্থক ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল ।

error: Content is protected !!