হাইকোর্টের ক্ষমতা ও কার্যাবলী

হাইকোর্টের ক্ষমতা ও কার্যাবলী

সংবিধানের ২১৪ নং ধারায় বলা হয়েছে , ভারতের প্রত্যেক রাজ্যে একটি করে হাইকোর্ট বা মহাধর্মাধিকরণ থাকবে । তবে পার্লামেন্ট আইন প্রণয়ন করে দুই বা ততোধিক রাজ্যের বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য মাত্র একটি হাইকোর্ট গঠন করতে পারে । ভারতে বর্তমানে ২৮ টি রাজ্যে মোট ২১ টি হাইকোর্ট রয়েছে । সংবিধানের ২১৬ নং ধারা অনুযায়ী প্রতিটি হাইকোর্ট একজন প্রধান বিচারপতি ও কয়েকজন অন্যান্য বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত হবে । 

হাইকোর্টের ক্ষমতা ও কার্যাবলীকে নিম্নলিখিত কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে আলোচনা করা যেতে পারে :

মূল এলাকা সম্পর্কিত ক্ষমতা 

রাজস্ব সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় হাইকোর্টের মূল এলাকার অন্তর্গত । অনেক ক্ষেত্রে দেওয়ানি মামলাকেও মূল এলাকার অন্তর্ভুক্ত করা হয় । তবে সব হাইকোর্টের মূল এলাকা ভুক্ত ক্ষমতা নেই । শুধুমাত্র কলকাতা , চেন্নাই ও মুম্বাই হাইকোর্টের এই ক্ষমতা রয়েছে । 

আপিল এলাকা সম্পর্কিত ক্ষমতা 

রাজ্যের সর্বোচ্চ আপিল আদালত হল হাইকোর্ট । দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিষয়ে হাইকোর্টে আপিল করা যায় । দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে জেলা জজ ও অধস্তন জেলা জজের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা যায় । হাইকোর্টের কোনো বিচারকের একক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও হাইকোর্টে আপিল করা যায় । এ ছাড়া আইন ও পদ্ধতিগত প্রশ্নে কোনো অধস্তন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল মামলায় ঊর্ধ্বতন আদালত যে রায় দেয় তার বিরুদ্ধেও হাইকোর্টে আপিল করা যায় । 

অন্যদিকে ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে দায়রা জজ এবং অতিরিক্ত দায়রা জজ কোনো ব্যক্তিকে সাত বছরের অধিক কারাদণ্ড দিলে সেই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা যায় । এ ছাড়া কয়েকটি নির্দিষ্ট মামলার ক্ষেত্রে সহকারী দায়রা জজ বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটদের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা যেতে পারে । 

লেখ জারির ক্ষমতা 

সুপ্রিমকোর্টের মতো হাইকোর্টগুলি নিজ নিজ এলাকায় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ , পরমাদেশ , প্রতিষেধ , অধিকার পৃচ্ছা , উৎশ্লেষণ প্রভৃতি লেখ , নির্দেশ ও আদেশ জারি করতে পারে [ ২২৬ ( ১ ) নং ধারা ] । 

প্রসঙ্গত বলা যায় , নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি সংরক্ষণ করা ছাড়াও হাইকোর্ট অন্য যে কোনো উদ্দেশ্যে লেখ , নির্দেশ বা আদেশ জারি করতে পারে । এমনকি জরুরি অবস্থার সময়েও হাইকোর্টের ‘ বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ ” সংক্রান্ত লেখ , নির্দেশ বা আদেশ জারি করার ক্ষমতা ক্ষুণ্ন করা যায় না । 

সাংবিধানিক বৈধতা বিচারের ক্ষমতা 

কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য আইনসভা কর্তৃক প্রণীত আইনের সাংবিধানিক বৈধতা বিচার করার ক্ষমতাও হাইকোর্টের হাতে রয়েছে । এক্ষেত্রে অসাংবিধানিক পদ্ধতিতে প্রণীত যে কোনো আইনকে হাইকোর্ট অবৈধ বলে ঘোষণা করতে পারে । 

তত্ত্বাবধান সম্পর্কিত ক্ষমতা 

সংবিধানের ২৭৭ নং ধারা অনুযায়ী সামরিক আদালত ও সামরিক ট্রাইব্যুনাল ছাড়া নিজ এলাকা ভুক্ত অন্য সব আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব হাইকোর্টকে দেওয়া হয়েছে । এক্ষেত্রে অধস্তন আদালতগুলিকে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র দাখিল করার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও হাইকোর্টের রয়েছে । 

পরামর্শদান সংক্রান্ত ক্ষমতা 

জেলা জজদের নিয়োগ , বদলি , পদোন্নতি ইত্যাদি বিষয়ে রাজ্যপালকে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা হাইকোর্টের রয়েছে । অধস্তন আদালতগুলির অন্যান্য বিচার বিভাগীয় পদে নিয়োগের সময় রাজ্যপাল হাইকোর্টের পরামর্শ নিতে পারেন । 

মামলা অধিগ্রহণের ক্ষমতা 

সংবিধানের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত আছে এমন কোনো মামলা নিম্ন আদালত থেকে নিজের হাতে নেওয়ার ক্ষমতা হাইকোর্টকে দেওয়া হয়েছে ( ২২৮ নং ধারা ) ।

নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা 

অধস্তন আদালতগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হাইকোর্টের রয়েছে । জেলা আদালত ও অন্যান্য অধস্তন আদালতের বিচারপতি , কর্মচারীদের নিয়োগ , বদলি , পদোন্নতি ইত্যাদি বিষয়ে হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । 

অন্যান্য ক্ষমতা 

1. হাইকোর্ট নিজের অবমাননার জন্য অবমাননাকারীকে শাস্তি দিতে পারে । 

2. হাইকোর্ট বিচারকাজের প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন নিজে তৈরি করতে পারে । 

3. হাইকোর্ট অভিলেখ আদালত হিসেবে ( Court of Records ) কাজ করে থাকে । 

উপসংহার 

অঙ্গরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত হিসেবে হাইকোর্টের ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ । তবে হাইকোর্টের গঠন ও ক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে , এই আদালত প্রকৃত অর্থেই সর্বভারতীয় বিচার ব্যবস্থার একটি অঙ্গ । হাইকোর্টের গঠন ও কাজকর্মে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে । বিচারপতিদের নিয়োগ , বদলি , অপসারণ , নতুন হাইকোর্ট গঠন , এক্তিয়ার সীমিতকরণ , বিচারপতিদের বেতন ও ভাতার বৃদ্ধি কিংবা হ্রাস ইত্যাদি বিষয় সুনির্দিষ্টভাবেই কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন । 

তাছাড়া হাইকোর্টের যে কোনো সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিতে পারে এবং সুপ্রিমকোর্ট নির্দেশিত বিধি বিধান অনুসরণ করা হাইকোর্টের পক্ষে বাধ্যতামূলক । সুতরাং যথার্থ বিশ্লেষণে হাইকোর্টকে অঙ্গরাজ্যের অধীন বলা যায় না । এই আদালত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলির সর্বোচ্চ আদালতের সমপর্যায়ের নয় ।

error: Content is protected !!