ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা

সংবিধানের অভিভাবক ও ব্যাখ্যাকর্তা হিসেবে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে । সুইজারল্যান্ড , ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের তুলনায় ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতা যথেষ্ট ব্যাপক ও শক্তিশালী । ভারতের সুপ্রিমকোর্ট একাধারে যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত , সর্বোচ্চ আপিল আদালত , সংবিধানের অভিভাবক ও চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কর্তা , অন্যদিকে মৌলিক অধিকারের সংরক্ষক । তা ছাড়া রাষ্ট্রপতির পরামর্শদাতা হিসেবেও সুপ্রিমকোর্টের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে ।

সংবিধানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কর্তা 

সংবিধানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কর্তা হিসেবে সুপ্রিমকোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । ভারতীয় সংবিধানের যে কোনো অংশের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা সুপ্রিমকোর্টের হাতে দেওয়া হয়েছে । সুপ্রিমকোর্টের এই ব্যাখ্যা অস্বীকার করার ক্ষমতা পার্লামেন্টের নেই । পার্লামেন্টের আইনকানুন এবং সংবিধানের যে কোনো অংশের ব্যাখ্যা সুপ্রিমকোর্ট করতে পারে । 

মৌলিক অধিকারের রক্ষা কর্তা 

ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অংশে বর্ণিত নাগরিকদের মৌলিক অধিকার যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার দায়িত্ব সুপ্রিমকোর্টের । ভারতীয় সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে সুপ্রিমকোর্টের এই ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ । 

সংবিধান রচয়িতারা মৌলিক অধিকারগুলির গণতান্ত্রিক কাঠামো সংরক্ষণে সুপ্রিমকোর্টকে দায়িত্ব দিয়ে ১৩ ( ২ ) নং ধারায় বলেছেন , মৌলিক অধিকারগুলিকে ক্ষুণ্ন করে , এমন কোনো আইন রাষ্ট্র প্রণয়ন করতে পারবে না । এ ধরনের কোনো আইন তৈরি হলে তা বাতিল হবে । সুপ্রিমকোর্ট নাগরিক অধিকার সংরক্ষণে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে এভাবে বিভিন্ন সময়ে পার্লামেন্ট প্রণীত আইন এবং রাষ্ট্রপতির নির্দেশ বাতিল করেছে । 

সর্বোচ্চ আপিল আদালত 

দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিষয় সম্পর্কিত মামলা ও সংবিধানের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিমকোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আপিল আদালত হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করে থাকে । সামরিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল ছাড়া অন্য যে কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা যায় ।

রাষ্ট্রপতির পরামর্শদাতা 

ভারতীয় সংবিধানের ১৪৩ ( ১ ) ও ১৪৩ ( ২ ) নং ধারা অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্ট রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারে । 

বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতা 

পার্লামেন্টের আইন , রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপালের আদেশ সংবিধান বিরোধী কি না তা বিচার করে দেখার ক্ষমতা সুপ্রিমকোর্টের রয়েছে । পার্লামেন্টের আইন বা রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপালদের আদেশ বা নির্দেশ সংবিধান সম্মত না হলে সুপ্রিমকোর্ট তা অবৈধ ঘোষণা করতে পারে । 

সুপ্রিমকোর্টের অবৈধ ঘোষণার ফলে সংশ্লিষ্ট আইন , আদেশ বা নির্দেশটি বাতিল হয়ে যায় । সুপ্রিমকোর্টের এই বিশেষ ক্ষমতাকে ‘ বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতা ‘ ( Power of judicial review ) বলা হয় । এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে সুপ্রিমকোর্ট ১৯৭০ সালে রাজন্য ভাতা বিলোপ সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ বাতিল করে দেয় । 

মূল্যায়ন 

মার্কিন সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে তুলনা : 

ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের ‘ বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতা’র প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তা কোনো মতেই মার্কিন সুপ্রিমকোর্টের সমগোত্রীয় নয় । এক্ষেত্রে ভারতের সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতা যথেষ্ট কম । ‘ আইনের যথা বিহিত পদ্ধতি অনুসারে ‘ ( Due Process of Law ) মার্কিন সুপ্রিমকোর্ট আইনটি যথাযথ সাংবিধানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে তৈরি হয়েছে কি না তা দেখে , সেই সঙ্গে এটাও দেখে যে আইনটি ‘ স্বাভাবিক ন্যায়নীতি বোধের ’ বিরোধী কি না । 

অর্থাৎ কোনো আইন ন্যায় সংগত বা যুক্তি সংগত কি না তা বিচার করার ক্ষমতা মার্কিন সুপ্রিমকোর্টের রয়েছে । ভারতের সুপ্রিমকোর্টের হাতে ‘ আইনের যথাবিহিত পদ্ধতি অনুসারে ’ বিচার কার্যের কোনো ক্ষমতা নেই । ভারতের সুপ্রিমকোর্ট শুধু এটুকু দেখে যে ‘ আইন নির্দিষ্ট পদ্ধতি ‘ ( Procedure Established by Law ) অনুসৃত হয়েছে কি না । 

পার্লামেন্ট কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ : 

ভারতীয় সংবিধানের নমনীয় চরিত্রের জন্য সুপ্রিমকোর্ট প্রদত্ত রায়কে অতিক্রম করার উদ্দেশ্যে পার্লামেন্ট সংবিধান সংশোধনের পথ গ্রহণ করে থাকে । ২৪ তম সংবিধান সংশোধনের সাহায্যে সুপ্রিমকোর্টের গোলকনাথ মামলার ( ১৯৬৭ ) রায়কে অতিক্রম করা হয় । এইভাবে পার্লামেন্টের কর্তৃত্বের ফলে সংবিধানের অভিভাবক ও ব্যাখ্যা কর্তা হিসেবে সুপ্রিমকোর্টের যথাযথ ভূমিকা পালন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় । 

উপসংহার 

ভারতীয় সুপ্রিমকোর্ট সংবিধানের অভিভাবক ও ব্যাখ্যা কর্তা হিসেবে আজও স্বীয় ক্ষমতায় আসীন । ৪৪ তম সংবিধান সংশোধনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে । মার্কিন সুপ্রিমকোর্টের মতো শক্তিশালী না হলেও ভারতের সুপ্রিমকোর্ট ব্রিটেনের বিচার বিভাগের মতো দুর্বলও নয় । সুপ্রিমকোর্ট স্বয়ং একটি মামলার রায়ে জানিয়েছিল যে , এক্ষেত্রে তাদের অবস্থান মধ্যবর্তী পর্যায়ে । 

ভারতের সাম্প্রতিক কালের সাংবিধানিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় , সুপ্রিমকোর্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্ভীক ও নিরপেক্ষভাবে তার দায়িত্ব পালন করে চলেছে । সাম্প্রতিককালে সুপ্রিমকোর্ট প্রচলিত এক্তিয়ারের বাইরে জনস্বার্থের সঙ্গে জড়িত যাবতীয় বিষয়ে ( বিচারপতিদের বদলি , নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা , ধর্মীয় অনুষ্ঠান , পরিবেশ সংরক্ষণ , রাজনৈতিক দুর্নীতি প্রভৃতি ) ঐতিহাসিক রায়দানের পরিপ্রেক্ষিতে তার ভূমিকাকে আরও সম্প্রসারিত করেছে । অনেকে একে বিচার বিভাগীয় সক্রিয়তা বা ‘ Judicial activism ‘ বলে অভিহিত করেছেন ।

error: Content is protected !!