ভারতীয় সংসদের ক্ষমতা ও কার্যাবলী

ভারতীয় সংসদের ক্ষমতা ও কার্যাবলী

ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভা ‘ সংসদ ‘ ( পার্লামেন্ট ) নামে অভিহিত । ভারতের সংসদ উচ্চকক্ষ রাজ্যসভা ও নিম্নকক্ষ লোকসভা এবং রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে গঠিত । ইংল্যান্ডের রাজা রানির মতো ভারতের রাষ্ট্রপতিও সংসদের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ । ভারতীয় সংসদের উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা ও কাজগুলি হল : 

আইন প্রণয়ন 

কেন্দ্রীয় তালিকা ভুক্ত বিষয়ে : 

সংবিধানের সপ্তম তফশিলে বর্ণিত আইন প্রণয়নের যে তিনটি তালিকা রয়েছে তার মধ্যে কেন্দ্রীয় তালিকা ভুক্ত ৯৯ টি বিষয়ে সংসদ এককভাবে আইন প্রণয়ন করতে পারে । 

যুগ্ম তালিকা ভুক্ত বিষয়ে : 

যুগ্ম তালিকা ভুক্ত ৫২ টি বিষয়ে সংসদ রাজ্য আইনসভাগুলির সঙ্গে যৌথভাবে আইন প্রণয়ন করতে পারে । এই যুগ্ম তালিকা ভুক্ত বিষয়ে সংসদ প্রণীত আইনের সঙ্গে রাজ্য আইনসভার আইনের বিরোধ ঘটলে সংসদ প্রণীত আইনই বলবৎ থাকে , রাজ্য আইন বাতিল বলে গণ্য হয় । 

রাজ্য তালিকা ভুক্ত বিষয়ে : 

পার্লামেন্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে রাজ্য তালিকা ভুক্ত বিষয়েও আইন প্রণয়নের অধিকারী । 

( a ) জরুরি অবস্থা ঘোষিত হলে বা রাজ্যে শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থা জারি হলে , 

( b ) রাজ্যসভায় উপস্থিত এবং ভোটদানকারী দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে , 

( c ) দুই বা ততোধিক রাজ্য আইনসভা প্রস্তাব গ্রহণ করে সংসদকে তাদের রাজ্যের জন্য রাজ্য তালিকা ভুক্ত কোনো বিষয়ে আইন প্রণয়নের অনুরোধ করলে , 

( d ) আন্তর্জাতিক সন্ধি বা চুক্তির শর্তাদি রূপায়ণ করার জন্য পার্লামেন্ট রাজ্য তালিকা ভুক্ত বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে পারে । 

অবশিষ্ট বিষয়ে : 

কেন্দ্রীয় তালিকা , রাজ্য তালিকা বা যুগ্ম তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয় , এমন বিষয়গুলি বা অবশিষ্ট বিষয়গুলির ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নের যাবতীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীয় আইনসভা বা সংসদের হাতে দেওয়া হয়েছে । 

শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ 

সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভার সংখ্যা গরিষ্ঠ দলের সদস্যদের নিয়েই মন্ত্রীসভা গঠিত হয় । ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রীসভা হল দেশের শাসন বিভাগের কর্ণধার । সংবিধান অনুসারে সমগ্র মন্ত্রীসভাকে তার নীতি ও কাজকর্মের জন্য পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হয় । লোকসভার সংখ্যা গরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থনের ওপরে মন্ত্রীসভার স্থায়িত্ব নির্ভর করে । 

পার্লামেন্ট আরও যেসব উপায়ে শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে তার মধ্যে রয়েছে , রাষ্ট্রপতির ভাষণে উল্লিখিত সরকারি নীতি ও কর্মসূচি নিয়ে তর্ক বিতর্ক , সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের সমালোচনা , মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন , দৃষ্টি আকর্ষণী নোটিশ দিয়ে নিন্দাসূচক প্রস্তাব বা সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা , পার্লামেন্টের বিভিন্ন কমিটির পেশ করা রিপোর্টের ওপর বিতর্ক প্রভৃতি ।

আয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ 

ভারতের সংবিধানে কেন্দ্রীয় সরকারের আয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে দেওয়া হয়েছে । এই ক্ষমতা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভার সদস্যদের হাতে অর্পিত হয়েছে । অর্থ সংক্রান্ত বিষয়ে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার কার্যত কোনো ক্ষমতা নেই বললেই চলে । 

সংবিধানের ২৬৫ এবং ২৬৬ নং ধারা অনুযায়ী , কর আরোপ , কর সংগ্রহ বা সরকারের ব্যয় বরাদ্দ পার্লামেন্টের আইন ছাড়া করা যায় না । সরকারি আয়ব্যয় ব্যবস্থা পার্লামেন্ট কর্তৃক নির্ধারিত পথে পরিচালিত হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য লোকসভায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি রয়েছে । সেগুলি হল সরকারি গাণিতিক কমিটি ( Public Accounts Committee ) এবং আনুমানিক ব্যয় পরীক্ষা কমিটি ( Estimates Committee ) । 

নির্বাচন ও অপসারণ 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের নির্বাচিত সদস্যরা অংশ নিয়ে থাকেন । উপরাষ্ট্রপতি লোকসভা ও রাজ্যসভার সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন । রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতিকে পার্লামেন্ট সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে ‘ ইমপিচমেন্ট পদ্ধতি’তে পদচ্যুত করতে পারে । তা ছাড়া সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতি , মুখ্য নির্বাচন কমিশনার , ভারতের ব্যয় নিয়ন্ত্রক ও মহাগণনা পরীক্ষক প্রমুখকে অযোগ্যতা বা অসদাচরণের অভিযোগে পদচ্যুত করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করার ক্ষমতাও পার্লামেন্টের রয়েছে । 

সংবিধান সংশোধন 

সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে পার্লামেন্টের দুটি কক্ষের সমান ক্ষমতা রয়েছে । সংবিধানের ৩৬৮ নং ধারা অনুযায়ী , কয়েকটি ক্ষেত্রে সাধারণ পদ্ধতিতে এবং কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ সংখ্যা গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পার্লামেন্ট সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে একক ক্ষমতা ভোগ করে । কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য অঙ্গরাজ্যগুলির আইনসভার অনুমোদন দরকার হয় । 

জরুরি অবস্থার ঘোষণা অনুমোদন 

ভারতের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ঘোষিত তিন ধরনের জরুরি অবস্থা , যথা— জাতীয় জরুরি অবস্থা , অঙ্গরাজ্যে সাংবিধানিক অচলাবস্থা জনিত জরুরি অবস্থা এবং আর্থিক জরুরি অবস্থার ঘোষণা পার্লামেন্টের দুটি কক্ষে অনুমোদিত হতে হয় ; তা না হলে জরুরি অবস্থার ঘোষণা বাতিল বলে গণ্য হয় । 

তথ্য সরবরাহ ও জনমত গঠন 

সরকারি নীতি ও কাজকর্ম সম্পর্কে পার্লামেন্টে যেসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করা হয় তার ফলে জনগণ বিভিন্ন বিষয়ে অবহিত হওয়ার সুযোগ পান । পার্লামেন্টের সদস্যরা সভায় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও বিতর্কে অংশগ্রহণ করে সুষ্ঠু জনমত গঠনে সচেষ্ট হন । বর্তমানে দূরদর্শন পার্লামেন্টের অধিবেশন সরাসরি সম্প্রচার করে থাকে । এ ছাড়া সংবাদপত্রে ও অন্যান্য গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় , এর ফলে শক্তিশালী জনমত গঠিত হয় । 

বিচার সংক্রান্ত ক্ষমতা 

পার্লামেন্টের কিছু ক্ষেত্রে বিচার বিষয়ক ক্ষমতাও রয়েছে । পার্লামেন্ট কোনো আদালতকে হাইকোর্টের পর্যায়ে উন্নীত করতে পারে । কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে হাইকোর্ট স্থাপন করা অথবা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে অবস্থিত হাইকোর্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি করার ব্যাপারেও পার্লামেন্ট কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারে । পার্লামেন্টের অবমাননা বা অধিকার ভঙ্গের অভিযোগে পার্লামেন্টের সদস্য অথবা সদস্য নন এমন যে কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা পার্লামেন্টের রয়েছে । 

অন্যান্য ক্ষমতা 

( i ) সংবিধানের এবং ৩ নং ধারা অনুসারে পার্লামেন্ট আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নতুন রাজ্য গঠন করতে পারে বা প্রয়োজন হলে কোনো রাজ্যের পুনর্গঠন করতে পারে । 

( ii ) রাজ্যের সীমানার হ্রাস বৃদ্ধি বা নাম পরিবর্তনের ক্ষমতাও পার্লামেন্টের রয়েছে । 

( iii ) পার্লামেন্ট কোনো রাজ্য আইনসভার দ্বিতীয় কক্ষের প্রবর্তন বা বিলোপ সাধন করতে পারে । 

( iv ) পার্লামেন্ট সর্বভারতীয় চাকরির ক্ষেত্রে বসবাসগত যোগ্যতার শর্ত নির্ধারণ করার অধিকারী । 

উপসংহার 

উপরিউক্ত আলোচনার শেষে এটা স্পষ্ট যে , ভারতের পার্লামেন্ট এক প্রভূত ক্ষমতা সম্পন্ন আইনসভা । তবে পার্লামেন্টের এসব ক্ষমতা ও কাজকর্মকে বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা তথা কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট ।

error: Content is protected !!