ভারতের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের গঠন ও কার্যাবলী 

ভারতের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের গঠন ও কার্যাবলী 

কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের গঠন 

কোনো রাষ্ট্রের সরকার পরিচালনার জন্য প্রয়োজন বিপুল সংখ্যক সৎ , দক্ষ ও যোগ্য সরকারি কর্মচারী । তাই স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে যোগ্য কর্মী বাছাইয়ের আদর্শ সামনে রেখে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশন গঠন করা হয়েছে । 

সদস্য সংখ্যা , নিয়োগ ও কার্যকাল :

সংবিধানের ৩১৫ নং ধারায় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশন ( UPSC ) গঠন কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে । সংবিধানের ৩১৬ নং ধারা অনুযায়ী , কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশন একজন সভাপতি এবং অন্য কয়েকজন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় । রাষ্ট্রপতি কমিশনের মোট সদস্য সংখ্যা স্থির করেন । বর্তমানে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের সদস্য সংখ্যা হল আট । কমিশনের সভাপতি ও অবশিষ্ট সদস্যদের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন । সভাপতি এবং সদস্যদের কার্যকাল ছয় বছর । তবে বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ৬৫ বছর । 

পদচ্যূতি বা অপসারণ :

সংবিধানের ৩১৭ নং ধারা অনুসারে , রাষ্ট্রপতি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের সদস্যদের পদচ্যুত করতে পারেন । এ ছাড়া কমিশনের সভাপতি বা সদস্যদের মধ্যে কেউ দেউলিয়া ঘোষিত হলে , অন্য কোনো সবেতন পদ গ্রহণ করলে , কোনো সরকারি চুক্তির সঙ্গে জড়িত থাকলে বা মানসিক ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে সদস্য থাকার অনুপযুক্ত বিবেচিত হলে রাষ্ট্রপতি তাঁকে অপসারণ করতে পারেন । অসদাচরণের প্রমাণিত অভিযোগেও রাষ্ট্রপতি যে কোনো সদস্যকে পদচ্যুত করতে পারেন ।

স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতামূলক ব্যবস্থা :

কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে সংবিধানে আরও কিছু ব্যবস্থার উল্লেখ করা হয়েছে । এগুলি হল— 

1. কার্যকালের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনো সদস্যকে পুনরায় ওই পদে নিয়োগ করা যায় না ; 

2. অবসর নেওয়ার পর কমিশনের সভাপতি অথবা কোনো সদস্য কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের অধীনে কোনো সরকারি চাকরি নিতে পারেন না ; 

3. কমিশনের সদস্যদের নিয়োগের পর চাকরির শর্তাদি বদল করা যায় না । 

4. সদস্যদের বেতন ও ভাতা ইত্যাদির ব্যয় সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষ নয় । 

5.  রাষ্ট্রপতি নিজের পছন্দ মাফিক ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠন করতে পারেন না । 

কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের ক্ষমতা ও কার্যাবলী 

সংবিধানের ৩২০ নং ধারায় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের কার্যাবলি উল্লেখ করা হয়েছে । এগুলি হল :

চাকরির পরীক্ষা নেওয়া : 

কেন্দ্রীয় ও সর্বভারতীয় পদগুলির জন্য কর্মচারী নিয়োগের উদ্দেশ্যে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা কমিশনের প্রধান কাজ । এজন্য কমিশন লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে থাকে । 

প্রার্থী বাছাই ও নিয়ম কানুন প্রণয়ন : 

দুই বা ততোধিক অঙ্গরাজ্য অনুরোধ করলে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির জন্য কমিশন প্রার্থী বাছাই করার ব্যবস্থা করতে পারে । অনুরোধকারী রাজ্যগুলির জন্য সরকারি কর্মচারীদের নিয়মকানুনও কমিশন তৈরি করে দিতে পারে এবং নিয়মকানুনগুলি কার্যকর করার জন্য কমিশন সাহায্য করতে পারে । 

রিপোর্ট পেশ : 

রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতি বছর কমিশনকে তার কাজকর্ম সম্বন্ধে রিপোর্ট পেশ করতে হয় । রাষ্ট্রপতি ওই প্রতিবেদন পার্লামেন্টে পেশ করেন । 

অসামরিক চাকরি ও তার শর্তাদি নির্ধারণ : 

অসামরিক চাকরি ও পদগুলিতে নিয়োগ , অসামরিক চাকরির নিয়োগ সম্পর্কিত এবং পদোন্নতি বা বদলিকরণের নীতি ও এজন্য প্রার্থীদের যোগ্যতা নির্ধারণ , কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারি কর্মীদের শৃঙ্খলা সম্পর্কিত বিষয় , কর্মরত অবস্থায় আঘাত প্রাপ্তির জন্য অসামরিক কর্মচারীদের পেনসনের দাবি , কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত মামলা মোকদ্দমার ব্যয় নির্বাহের দাবি বিবেচনা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকতাক কমিশনের ওপর ন্যস্ত । 

পরামর্শ দান : 

কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের একটি প্রধান কাজ হল রাষ্ট্রপতির পাঠানো কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁকে পরামর্শ দেওয়া । অবশ্য সরকারি চাকরিতে তফশিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য আসন সংরক্ষণের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করেন না । 

অন্যান্য দায়িত্ব পালন : 

উপরি উক্ত কার্যাবলী ছাড়াও পার্লামেন্ট আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনকে কোনো অতিরিক্ত কাজের দায়িত্ব দিলে কমিশন তা পালন করে থাকে ( ৩২১ নং ধারা ) । 

উপসংহার 

কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনের সাংবিধানিক মর্যাদা থাকলেও তার দেওয়া পরামর্শ গ্রহণে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারগুলি বাধ্য নয় । কমিশনের সুপারিশ সরকার উপেক্ষা করতে পারে ( ডি. সিলভা বনাম ভারত সরকার , ১৯৬২ ) । তবে কী কারণে সরকার কর্তৃক কমিশনের পরামর্শ বাতিল হল তা সংসদকে জানাতে হয় । এ ছাড়া অস্থায়ী চাকরির ক্ষেত্রে কমিশনের পরামর্শ ছাড়াই সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে । সরকার অনেক সময় কমিশনের পরামর্শ বাস্তবায়িত করতে দেরি করে । 

কখনও আবার দীর্ঘকাল পরে এমন এক সময়ে কমিশনের রিপোর্ট সংসদে পেশ করা হয় যখন তার গুরুত্ব অনেক কমে যায় । এ ছাড়া সংসদের হাতে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে কমিশন ও রাষ্ট্রকৃত্যক সম্পর্কিত বিধি ব্যবস্থা পরিবর্তন করার ক্ষমতা রয়েছে , পার্লামেন্ট এই ক্ষমতাবলে কমিশনের এক্তিয়ারকে আরও সীমিত করতে পারে । 

ড. মাহেশ্বরী তাঁর Indian Administration শীর্ষক গ্রন্থে এ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন , সংবিধান কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকৃত্যক কমিশনকে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করেনি , কমিশন একটি নিয়োগকারী সংস্থা মাত্র যার হাতে শুধুমাত্র পরামর্শ দানের ক্ষমতা রয়েছে ।

error: Content is protected !!