ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদা

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদা

ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় প্রকৃত শাসক হলেন প্রধানমন্ত্রী । কেন্দ্রীয় প্রশাসনে প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । বিষয়টিকে কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত করে আলোচনা করা যেতে পারে—  

শাসন ব্যবস্থায় গুরুত্ব

ভারতের সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও পদমর্যাদা অত্যন্ত ব্যাপক । ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও এ কথা বলা যায় যে , সরকার হল দেশের প্রভু এবং সরকারের প্রভু হলেন প্রধানমন্ত্রী । তবে প্রধানমন্ত্রীর এই ক্ষমতা ও পদমর্যাদা বহুলাংশে নির্ভর করে তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং সুদক্ষ নেতৃত্বের ওপর । বর্তমানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে । এর প্রধান কারণ হল , ভারতের পরিবর্তনশীল দলীয় ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীভূত আমলাতন্ত্র উভয় ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর অবিসংবাদী কর্তৃত্বের স্বীকৃতি । 

অনেকে ভারতের মন্ত্রীসভা শাসিত সংসদীয় শাসন ব্যবস্থাকে প্রধানমন্ত্রী শাসিত শাসন ব্যবস্থা আখ্যা দিয়ে থাকেন । প্রধানমন্ত্রীর এই ক্ষমতা বৃদ্ধিকে প্রধানমন্ত্রী পদের রাষ্ট্রপতিকরণ ( Presidentialisation of the Prime Minister’s Office ) নামে অভিহিত করা হয় । মন্ত্রীসভা শাসিত সরকারে প্রধানমন্ত্রী এমন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতার অধিকারী , যাকে শুধুমাত্র রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতির ভূমিকার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে । 

ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা 

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কিছু কার্যকর সীমাবদ্ধতাও আছে । সংসদীয় গণতন্ত্রে জনমতের গতিপ্রকৃতির দিকে তাকিয়ে শাসনকাজ পরিচালনা করতে প্রধানমন্ত্রী বাধ্য হন । অনুরূপভাবে , চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীগুলির দাবিদাওয়াকেও তাঁকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে চলতে হয় । সর্বোপরি রয়েছে বিরোধী দলের সমালোচনা ও সক্রিয় ভূমিকা । বর্তমানে গণমাধ্যমও প্রভূত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে । আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন এই গণমাধ্যম ব্যবস্থা জনগণকে প্রভাবিত করতে সক্ষম । প্রধানমন্ত্রীকে শক্তিশালী গণমাধ্যমগুলির প্রভাবের দিকেও দৃষ্টি রাখতে হয় । 

পরিবর্তিত ভূমিকা 

সাম্প্রতিককালে লোকসভার সাধারণ নির্বাচনে কোনো দলের পক্ষে এককভাবে সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব না হওয়ায় ত্রিশঙ্কু পার্লামেন্ট ( Hung Parliament ) এর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে । ফলে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার এক মৌলিক রূপান্তর ঘটেছে বলে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন । 

ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন দলের সম্মিলিত জোট সরকারের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে । যে ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচির ভিত্তিতে বিভিন্ন দলের জোট সরকার গঠিত হয় , প্রধানমন্ত্রীকে তার দিকে দৃষ্টি রেখে সরকার পরিচালনা করতে হয় । তা ছাড়া সরকারের সমর্থনকারী জোট সঙ্গী এবং জোট বহির্ভূত সহযোগী দলগুলির দৃষ্টিভঙ্গির কথা মাথায় রেখেও তাঁকে চলতে হয় । বস্তুত , জোট সরকারের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে কখনোই মন্ত্রীসভার ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় । 

দৃষ্টান্ত স্বরূপ , ১৯৯৬ সালে সংযুক্ত গণতান্ত্রিক মোর্চা ( U.D.A ) সরকারের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী এইচ. ডি. দেবেগৌড়া , ১৯৯৮ এবং ১৯৯৯ সালে বি.জে.পি. নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের ( N.D.A ) এর নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং সম্প্রতি ২০০৪ সালে এবং ২০০৯ সালে কংগ্রেস  নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল জোটের ( U.P.A. ) নেতা হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং এর কথা উল্লেখ করা যায় । 

২০০৫ সালের জুন মাসে ‘ ভেল ’ এর বিলগ্নীকরণকে কেন্দ্র করে ইউ.পি.এ. জোটের প্রধান শরিক সি.পি. আই. ( এম. ) এবং সি. পি. আই. এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তথা কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পি. চিদম্বরমের মত বিরোধ ঘটে । ইউ.পি.এ. জোট শরিক বাম দলগুলি ‘ ভেল ’ এর দশ শতাংশ শেয়ার বিক্রির বিষয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার গৃহীত সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানায় । এর ফলে জোটের অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে বাম দলগুলি মনে করে । 

এছাড়া ২০০৫ সালের জুলাই মাসে স্বাক্ষরিত ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও বাম দলগুলি প্রতিবাদ জানায় । জোট সরকারের সমর্থনকারী শরিক দলুগলির কাছ থেকে এধরনের প্রতিবাদের সম্মুখীন হওয়ার ঘটনা নতুন নয় । অতীতে এন. ডি. এ. জোটের নেতা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা গেছে । 

অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি রূপায়ণের ক্ষেত্রে জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে যথেষ্ট দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হয় । ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই পরিবর্তিত ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ । জোট সরকারের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তিত অবস্থান সম্পর্কে অধ্যাপক জোহারির অভিমত হল , এ ধরনের সরকারে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা সমপর্যায়ভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অগ্রগণ্য নয় ( “ The result is that the Prime Minister of such a government is not even a ‘ primus inter pares ‘ ( first among equals ) as his position resembles the pathetic spectacle of tail wagging the body ” ) 

উপসংহার 

বস্তুত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও পদমর্যাদা বহুলাংশে তাঁর নিজের গুণগত যোগ্যতা , বিচক্ষণতা ও ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল বলে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন । সেই সঙ্গে লোকসভায় ক্ষমতাসীন জোট বা দলের শক্তি , দলীয় আনুগত্য প্রভৃতিও এক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় হয়ে ওঠে ।

error: Content is protected !!