রাষ্ট্রপতি কে প্রকৃত শাসক বলা হয় কেন

রাষ্ট্রপতি কে প্রকৃত শাসক বলা হয় কেন

ভারতের রাষ্ট্রপতির শাসনতান্ত্রিক পদমর্যাদার প্রশ্নটি নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যথেষ্ট মতানৈক্য লক্ষ করা যায় । অনেকে তাঁকে জাঁকজমকপূর্ণ সাক্ষী গোপাল ( magnificent cipher ) বা নামসর্বস্ব শাসক বলতে চান । আবার অনেকে তাঁকে প্রকৃত শাসক ( real executive ) হিসেবে অভিহিত করার পক্ষপাতী । 

প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীদের নিয়োগ কর্তা 

সংবিধানের ৭৫ ( ১ ) নং ধারা অনুযায়ী , প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীপরিষদের নিয়োগকর্তা হলেন রাষ্ট্রপতি । ৭৫ ( ২ ) নং ধারা অনুযায়ী , মন্ত্রীদের স্বপদে অধিষ্ঠিত থাকা রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল । সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী , রাষ্ট্রপতি লোকসভার সংখ্যা গরিষ্ঠ দলের বা সংখ্যা গরিষ্ঠ জোটের নেতা বা নেত্রীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন । কিন্তু সংবিধানে এ সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়নি । তা ছাড়া লোকসভায় কোনো দল বা জোট সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রপতি স্ববিবেচনা অনুসারে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন । 

সাংবিধানিক স্বীকৃতি 

সংবিধানের ৫৩ ( ১ ) নং ধারায় কেন্দ্রীয় সরকারের সমগ্র শাসন ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়া হয়েছে । সংবিধানে বলা হয়েছে , তিনি নিজে বা তাঁর অধস্তন কর্মচারীদের মাধ্যমে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন । সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে , এর অর্থ হল সংবিধান প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রপতির হাতে দেশের সমগ্র শাসনভার অর্পণ করেছে , মন্ত্রীসভার হাতে নয় । 

অর্ডিন্যান্স জারির ক্ষমতা 

সংসদের অধিবেশন বন্ধ থাকাকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ বা ‘ অর্ডিন্যান্স ‘ জারি করতে পারেন । এই অর্ডিন্যান্স আইনের মতো সমানভাবে কার্যকরী হয় । তবে অর্ডিন্যান্স জারির দিন থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সেটিকে অনুমোদনের জন্য সংসদে পেশ করতে হয় । সংসদ অনুমোদন না দিলে সংশ্লিষ্ট অর্ডিন্যান্সটি বাতিল বলে গণ্য হয় । কাজেই রাষ্ট্রপতি অন্তত ছয় সপ্তাহের জন্য স্বেচ্ছায় প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা করতে সক্ষম । এ ছাড়া সংবিধানে কোথাও বলা হয়নি যে , রাষ্ট্রপতি মন্ত্রীসভার পরামর্শ অনুসারে অর্ডিন্যান্স জারি করবেন বা করতে বাধ্য থাকবেন । 

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি 

ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের শাসনতান্ত্রিক প্রধান রাজা বা রানির সঙ্গে যাঁরা ভারতের রাষ্ট্রপতির তুলনা করেন তাদের অভিমত যথার্থ নয় বলে অনেকে মনে করেন । যুক্তরাজ্যের রাজা বা রানির পদ বংশানুক্রমিক , অন্যদিকে ভারতের রাষ্ট্রপতি পাঁচ বছরের জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য আইনসভার প্রতিনিধিদের দ্বারা সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত হন । কাজেই ব্রিটেনের রাজা বা রানির মতো ভারতের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে নিছক নিয়মতান্ত্রিক শাসক বলে অভিহিত করা ঠিক নয় ।

সাংবিধানিক সংকট নিরসনের ক্ষমতা 

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ত্রিশঙ্কু লোকসভার ক্রমবর্ধমান প্রবণতায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও অনিবার্য হয়ে উঠেছে । এই প্রসঙ্গে ১৯৯৯ সালের এপ্রিল মাসে রাষ্ট্রপতি কোচিরিল রামন নারায়ণনের বাজপেয়ী সরকারকে লোকসভায় আস্থা ভোট নেওয়ার নির্দেশ এবং পরবর্তী সময়ে বাজপেয়ী সরকারের পতন ঘটলে বিকল্প সরকার গঠনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে দ্বাদশ লোকসভা ভেঙে দেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা যায় । 

সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব 

সংবিধানকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রপতিকে শপথ নিতে হয় ( ৬০ ধারা ) । এই ধারা অনুসারে , মন্ত্রীসভার কোনো পরামর্শকে অসাংবিধানিক মনে করলে রাষ্ট্রপতি তা গ্রহণ করতে নাও পারেন । দৃষ্টান্ত স্বরূপ , ১৯৯৭ এবং ১৯৯৮ সালে যথাক্রমে উত্তরপ্রদেশে ও বিহারে ৩৫৬ ধারা জারির জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সুপারিশ উল্লেখ করা যায় । 

তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি কে. আর নারায়ণন এই দুটি ঘটনায় এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়ে মন্ত্রীসভার সুপারিশ অনুমোদন না করে তা পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠিয়ে দেন । অনুরূপ দৃষ্টান্ত হিসেবে , ২০০৬ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতি এ. পি. জে. আবদুল কালাম কর্তৃক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার ‘ লাভজনক পদ ’  সম্পর্কিত বিল পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার কথা উল্লেখ করা যায় । 

উপসংহার 

উপরি উক্ত আলোচনার শেষে বলা যায় , ভারতের রাষ্ট্রপতিকে নিছক নামসর্বস্ব শাসক বা জাঁকজমকপূর্ণ সাক্ষী গোপাল বলে অভিহিত করা যায় না । ভারতের রাষ্ট্রপতি সংবিধানের রক্ষাকর্তা ও জাতির প্রতীক । সাধারণ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও লোকসভা নির্বাচনে কোনো দল বা জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে বা প্রধানমন্ত্রী লোকসভায় সংখ্যা গরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারালে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ।

error: Content is protected !!