বিচার বিভাগের স্বাধীনতার শর্ত 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার শর্ত 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা , নিরপেক্ষতা এবং কর্মকুশলতার ওপর আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে । বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আবার কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে । সেগুলি হল— 

বিচারপতিদের যোগ্যতা 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অন্যতম শর্ত হল সৎ , সাহসী ও নিরপেক্ষ , আইনজ্ঞ বিচারপতি । দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে প্রার্থীদের গুণগত যোগ্যতা সঠিকভাবে পরীক্ষা করে বিচারপতি নিয়োগ করা প্রয়োজন । অযোগ্য ব্যক্তি রাজনৈতিক কারণে বিচারক পদে নিযুক্ত হলে ন্যায়বিচার ক্ষুণ্ন হতে পারে । 

বিচারপতিদের নিয়োগ পদ্ধতি 

আধুনিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিচারপতি নিয়োগ পদ্ধতির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল । সাধারণত তিনটি পদ্ধতিতে বিচারপতিদের নিয়োগ করা হয়ে থাকে— 

( i ) জনগণের দ্বারা প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে , 

( ii ) আইনসভা কর্তৃক মনোনয়নের মাধ্যমে , 

( iii ) শাসন বিভাগের মাধ্যমে । 

( i ) জনগণের দ্বারা প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিচারপতি নিয়োগের পদ্ধতি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য এবং সুইজারল্যান্ডের কয়েকটি ক্যান্টনে চালু রয়েছে । তবে এই পদ্ধতি ত্রুটি মুক্ত নয় । অধ্যাপক হ্যারল্ড ল্যাস্কি একে একটি নিকৃষ্ট পদ্ধতি হিসেবে অভিহিত করেছেন । এতে অযোগ্য ব্যক্তির বিচারক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে । 

( ii ) আইনসভা কর্তৃক মনোনয়নের মাধ্যমেও বিচারপতি নিয়োগের পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে ও সুইজারল্যান্ডের যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালতে এ পদ্ধতি দেখা যায় । এই পদ্ধতিকেও ত্রুটি মুক্ত বলা যায় না । এই পদ্ধতিতে আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত ব্যক্তিরা সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে বিচারপতি পদে নির্বাচিত হন । ফলে ন্যায়বিচার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে । 

( iii ) বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে শাসন বিভাগের মাধ্যমে বিচারপতি নিয়োগের ব্যবস্থা চালু রয়েছে । অনেকে একেই কাম্য ব্যবস্থা বলে মনে করেন । কারণ এর ফলে বিচারপতিরা দলীয় স্বার্থের প্রভাব মুক্ত থেকে নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার সম্পাদনের সুযোগ পান । অধস্তন বিচারপতিরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দ্বারা এবং ঊর্ধ্বতন বিচারপতিরা সাধারণত অন্যান্য বিচারপতিদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক নিযুক্ত হন । ভারত , ব্রিটেন ও কানাডায় এই ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে । 

বিচারপতিদের কার্যকাল 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার জন্য বিচারপতিদের একটি নির্দিষ্ট বয়ঃক্রম পর্যন্ত স্থায়ীভাবে নিয়োগ করা প্রয়োজন । স্বল্পকালের জন্য নির্বাচিত বা মনোনীত হলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সন্তুষ্টি বিধানে বিচারপতিরা সর্বদাই ব্যস্ত থাকবেন কিংবা তাঁরা দুর্নীতিপরায়ণও হয়ে উঠতে পারেন । সেক্ষেত্রে ন্যায়বিচার উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল । 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিচারপতিরা অক্ষম না হলে ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকতে পারেন । ভারতে এই মেয়াদ সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের ক্ষেত্রে ৬৫ এবং হাইকোর্টের বিচারপতিদের ক্ষেত্রে ৬২ বছরে সীমিত রাখা হয়েছে । 

বিচারপতিদের অপসারণ 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার শর্তাবলির ক্ষেত্রে বিচারপতিদের অপসারণ প্রক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । অকারণে অপসারিত হওয়ার ভয় থাকলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার সম্পাদন সম্ভব হয় না । কেবলমাত্র দুর্নীতি ও গুরুতর অপরাধের প্রমাণিত তথ্য ছাড়া বিচারপতিদের অপসারণের ব্যবস্থা থাকা উচিত নয় । 

বিচারপতিদের বেতন ও ভাতা 

অনেকে বিচারপতিদের বেতন ও ভাতার বিষয়টিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন । স্বল্প বেতনভোগী বিচারপতিদের দুর্নীতিপরায়ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে । তা ছাড়া , বেতন পর্যাপ্ত না হলে শ্রেষ্ঠ যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিকে এ পদের প্রতি আকৃষ্ট করা যায় না । বিচারপতিদের বেতন ও ভাতার বিষয়টি শাসন বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষ হওয়া উচিত নয় বলে অনেকে মনে করেন । 

বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র্য 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার একটি অপরিহার্য শর্ত হল এর স্বাতন্ত্র্য । বস্তুত , শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ স্বতন্ত্র না হলে ন্যায়বিচারের সুযোগ থাকে না । এমনকি এর ফলে স্বৈরাচারের আশঙ্কাও দেখা দিতে পারে । অধ্যাপক ল্যাস্কি বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র্যকে স্বাধীনতা সংরক্ষণের জন্য অত্যাবশ্যক বলে রায় দিয়েছেন । বিচারপতিদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে আইনবিভাগ ও শাসনবিভাগের প্রভাব থেকে বিচার বিভাগকে মুক্ত রাখা প্রয়োজন । 

বিচারপতিদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি 

বিচারপতিদের দৃষ্টিভঙ্গিকেও অনেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অন্যতম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন । বিচারপতিদের সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান , শ্রেণিচেতনা , অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত প্রেক্ষাপট , রাজনৈতিক চেতনা প্রভৃতির সম্মিলিত প্রভাবে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে । এই দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক না হলে তা ন্যায়বিচারের পক্ষে অন্তরায় হতে পারে । 

উপসংহার 

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার উপরি উক্ত শর্তাবলিকে অবশ্য পর্যাপ্ত বলে মনে করেন না । তাঁদের মতে , বিচার বিভাগ রাষ্ট্র ও সমাজ নিরপেক্ষ নয় । সাধারণত বিচারপতিরা রাষ্ট্র প্রকৃতি অনুসারে পরিচালিত হন । বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপরে বহুলাংশে নির্ভরশীল ।

error: Content is protected !!