আধুনিক রাষ্ট্রে শাসন বিভাগের কার্যাবলী 

আধুনিক রাষ্ট্রে শাসন বিভাগের কার্যাবলী 

অতীতে শুধুমাত্র দেশ রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখাই ছিল রাষ্ট্রের প্রধান কাজ । বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিযুক্ত শাসন বিভাগের কর্মকাণ্ডের পরিধি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে । আধুনিক রাষ্ট্রে শাসন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি হল— 

অভ্যন্তরীণ শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা 

শাসন বিভাগের প্রধান কাজ হল সুশৃঙ্খল সমাজ জীবন গড়ে তোলার জন্য অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা । রাষ্ট্রের আইন বিভাগ যে সমস্ত আইনকানুন প্রণয়ন করে , শাসন বিভাগের দায়িত্ব হল সেইসব আইনকানুনকে বাস্তবে কার্যকর করা । আইন লঙ্ঘনকারীকে গ্রেফতার করে বিচারের জন্য আদালতে পেশ করা , আদালতের রায় অনুযায়ী অপরাধীর শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি শাসন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কাজ । 

প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ 

শাসন বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল দেশের সার্বভৌমিকতা , অখণ্ডতা ও স্বাধীনতা রক্ষা করা । এজন্য স্থলবাহিনী , নৌবাহিনী , বিমানবাহিনী গঠন করা ও পরিচালনা করা শাসন বিভাগের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ।

পররাষ্ট্রনীতি রূপায়ণ 

আধুনিক বিশ্বে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলি পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল । সাম্প্রতিককালে পররাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রচনার কর্মকাণ্ড আগের চেয়ে বহুগুণ সম্প্রসারিত হয়েছে । ভিন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রতিনিধি প্রেরণ ; রাজনৈতিক , বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক চুক্তি সম্পাদন ; পররাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিনিধিকে নিজ রাষ্ট্রে গ্রহণ ; সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য পররাষ্ট্র সফরের আয়োজন ; সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির নির্ধারিত দায়দায়িত্ব পালন ইত্যাদি কাজের মূল দায়িত্ব শাসন বিভাগের ।

নীতি নির্ধারণ 

শাসন বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল নীতি নির্ধারণ । ব্রিটেন , ভারত প্রভৃতি সংসদীয় গণতন্ত্রে এই দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রীসভার হাতে । অন্যদিকে , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নীতি নির্ধারণের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির । অবশ্য এ ব্যাপারে ক্যাবিনেট তাঁকে সাহায্য করে থাকে । 

নীতি ও কর্মসূচি রূপায়ণ 

শুধুমাত্র নীতি নির্ধারণই নয় , নীতি ও কর্মসূচি রূপায়ণের প্রধান দায়িত্বও শাসন বিভাগের হাতে রয়েছে । জনগণের কাছে প্রতিশ্রুত কর্মসূচির কোন্‌টি আগে রূপায়ণ করা হবে সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন শাসন বিভাগের প্রধান । কর্মসূচির বাস্তব রূপায়ণ গৃহীত নীতি অনুযায়ী যথাযথ হচ্ছে কি না তা দেখাশোনার দায়িত্বও শাসন বিভাগের । 

আইন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রণয়ন 

যেসব দেশে সংসদীয় বা মন্ত্রীপরিষদ চালিত সরকার রয়েছে সেখানে আইন সভার অধিবেশন আহ্বান করা , স্থগিত রাখা এবং প্রয়োজনে আইন সভা ভাঙার জন্য নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে শাসন বিভাগের প্রধানের হাতে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শাসন বিভাগের প্রধান রাষ্ট্রপতির সম্মতি ছাড়া আইন সভায় পাস হওয়া কোনো বিল আইনে পরিণত হয় না । 

অন্য দিকে , আইন সভার অধিবেশন বন্ধ থাকাকালীন দেশের জরুরি প্রয়োজনে আইন বা অর্ডিন্যান্স জারি করার ক্ষমতা শাসন বিভাগের প্রধানের রয়েছে । অবশ্য এ ধরনের আইনকে পরবর্তী সময়ে আইন সভায় অনুমোদন করাতে হয় । অনেক সময় আইন সভা কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নের দায়ভার শাসন বিভাগকে দিয়ে থাকে । এই আইনকে অর্পিত ক্ষমতা প্রসূত আইন ( ‘ Delegated Legislation ) বলা হয় । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের আইনের অস্তিত্ব রয়েছে । 

বিচার সংক্রান্ত কার্য সম্পাদন 

আধুনিক রাষ্ট্রে শাসন বিভাগের কিছু বিচার সংক্রান্ত কাজও রয়েছে । বিচারপতিদের নিয়োগ , দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তির শাস্তি হ্রাস , ক্ষমা প্রদর্শন ইত্যাদি বিচার বিভাগীয় কাজ রাষ্ট্র প্রধান করে থাকেন । এ ছাড়া প্রশাসনের কোনো কর্মীর দুর্নীতি , অন্যায় আচরণ প্রভৃতির বিচার ও শাস্তি বিধান শাসন বিভাগ করে থাকে । প্রসঙ্গত , ব্রিটেনের শাসন বিভাগীয় আইন ও ফ্রান্সের প্রশাসনিক আইনের কথা বলা যায় । 

অর্থ সংক্রান্ত কার্য সম্পাদন 

কর ধার্য করা , অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহ , বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণ ইত্যাদি অর্থ সংক্রান্ত কাজ শাসন বিভাগকে করতে হয় । শাসন বিভাগ এজন্য প্রয়োজনীয় নীতি নির্দেশিকা স্থির করে । এ ছাড়া সরকারি অর্থের হিসাব পরীক্ষার ব্যবস্থা করা , আইন সভায় আর্থিক বছরের জন্য আনুমানিক আয়-ব্যয়ের হিসাব ( Budget ) পেশ করা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজও শাসন বিভাগ করে থাকে । 

জরুরি অবস্থা সম্পর্কিত ক্ষমতা প্রয়োগ 

আধুনিক রাষ্ট্রে শাসন বিভাগের হাতে জরুরি অবস্থা সম্পর্কিত কিছু ক্ষমতা রয়েছে । এই ক্ষমতা দেশের শাসন বিভাগের প্রধানের হাতে ন্যস্ত থাকে । ব্রিটেন , ফ্রান্স , কানাডা , ভারত প্রভৃতি দেশের সংবিধানে এজন্য উপযুক্ত বিধি ব্যবস্থা রয়েছে । 

জনকল্যাণ মূলক কার্য সম্পাদন 

আধুনিক রাষ্ট্রকে জনকল্যাণকর রাষ্ট্র বলা হয় । এই জাতীয় রাষ্ট্রে স্বাস্থ্য , শিক্ষা , কৃষি , শিল্প , বাণিজ্য , যোগাযোগ ইত্যাদি নানান ক্ষেত্রে জনকল্যাণকর কাজকর্ম শাসন বিভাগকে সম্পাদন করতে হয় । 

নিয়োগ সম্পর্কিত কার্য সম্পাদন 

শাসন বিভাগের হাতে দেশের প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সরকারি কর্মীদের নিয়োগ , বদলি , পদোন্নতি এবং পদচ্যুতি বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার ক্ষমতা রয়েছে । উচ্চপদস্থ সরকারি পদাধিকারীদের নিয়োগের ব্যাপারেও শাসন বিভাগ সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করে থাকে । 

উপসংহার 

বর্তমানে রাষ্ট্রের কার্যাবলী বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে শাসন বিভাগও আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে । মন্ত্রীপরিষদ চালিত বা সংসদীয় সরকার এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার , উভয় ক্ষেত্রেই শাসন বিভাগের কর্তৃত্ব ও প্রাধান্য উত্তরোত্তর সম্প্রসারিত হচ্ছে ।

error: Content is protected !!