রাষ্ট্র সম্পর্কে গান্ধীজীর দৃষ্টিভঙ্গি ও মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য

রাষ্ট্র সম্পর্কে গান্ধীজীর দৃষ্টিভঙ্গি ও মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য

১৯০৮ সালে প্রকাশিত ‘ হিন্দ স্বরাজ ’ নামক গ্রন্থে সর্বপ্রথম গান্ধীজির রাষ্ট্র চিন্তার প্রকাশ ঘটে । অবশ্য পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে তাঁর আত্মজীবনী ও চিন্তা ভাবনার মধ্যে রাষ্ট্র সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে । গান্ধীজির সমগ্র মতাদর্শকে নিয়ন্ত্রণ করেছে দুটি আদর্শ — একটি সত্য এবং অন্যটি অহিংসা । 

অর্থাৎ তিনি ছিলেন সত্য ও অহিংসার পূজারি । গান্ধীজি রাষ্ট্রকে কেন্দ্রীভূত ও সুসংবদ্ধ হিংসার মূর্ত প্রকাশ বলে মনে করতেন । তিনি বিশ্বাস করতেন , রাষ্ট্র মানুষের সার্বিক বিকাশের পরিপন্থী । সেজন্য গান্ধীজি রাষ্ট্রকে ভয়ের চোখে দেখতেন ।

অন্যদিকে , সমাজের বিকাশের একটি বিশেষ স্তরে যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির আবির্ভাব ঘটে তখন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে বলে মার্কস মনে করতেন । মার্কসের মতে , সংখ্যা লঘিষ্ঠ সম্পত্তিশালী শ্রেণির স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয় । সুতরাং , রাষ্ট্র সমাজের সমস্ত জনসাধারণের মঙ্গল কামনায় নিয়োজিত কোনো সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান নয় । মার্কসের মতে , রাষ্ট্র হল শ্রেণিশোষণের যন্ত্র । মার্কসীয় রাষ্ট্রতত্ত্বে এ কথা বলা হয়েছে যে , সমাজ বিকাশের চূড়ান্ত পর্যায়ে রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না । 

রাষ্ট্র সম্পর্কে গান্ধীজির ও মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির তুলনা করলে কিছু সাদৃশ্য ও কিছু বৈসাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় । সেগুলি হল— 

মার্কসবাদ ও গান্ধীবাদের মধ্যে সাদৃশ্য 

1. গান্ধীজি রাষ্ট্রকে দমনের যন্ত্র বলে অভিহিত করেন । তাঁর মতে , রাষ্ট্রের ভিত্তি হল হিংসা । মার্কসবাদীরাও রাষ্ট্রকে শ্রেণিশোষণের হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেন । মার্কসবাদ অনুযায়ী , রাষ্ট্র হল একটি শ্রেণির ওপর অন্য একটি শ্রেণির শাসন ও শোষণকে অব্যাহত রাখার যন্ত্র । 

2. গান্ধীজি তাঁর মতবাদে আদর্শ গণতন্ত্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে রাষ্ট্রহীন গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন । গান্ধীজির কল্পিত রামরাজ্যে বলপ্রয়োগের এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা থাকবে না । অন্যদিকে , মার্কস বর্ণিত সাম্যবাদী সমাজ হবে রাষ্ট্রহীন , যেখানে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সম্পূর্ণতা লাভ করবে । 

3. উভয় মতবাদই ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের চরম বিরোধী । গান্ধীজি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের তীব্র বিরোধিতা করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন । অনুরূপভাবে মার্কস মনে করতেন , শাসন ও শোষণকে তীব্রতর করার জন্য সম্পত্তিশালী শ্রেণি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ঘটায় । 

মার্কসবাদ ও গান্ধীবাদের মধ্যে মূল পার্থক্য

1. গান্ধীজি রাষ্ট্রকে শ্রেণিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেননি । তিনি রাষ্ট্রকে ঘনীভূত ও সুসংগঠিত হিংসার প্রতিনিধি হিসেবে দেখেছেন । অন্যদিকে মার্কস রাষ্ট্রকে শ্রেণিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন । মার্কসের মতে , সংখ্যা লঘিষ্ঠ পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ সংরক্ষণ করার জন্যই রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছে । 

2. গান্ধীজি হিংসাত্মক উপায়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সম্পূর্ণ বিরোধী । কিন্তু মার্কসীয় রাষ্ট্রতত্ত্বে ঘোষণা করা হয়েছে যে , শোষক শ্রেণি কখনও স্বেচ্ছায় শান্তিপূর্ণভাবে অন্য শ্রেণির হাতে ক্ষমতা অর্পণ করবে না । সেই কারণে সর্বহারা শ্রেণিকে হিংসাত্মক বা অহিংসাত্মক বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে হয় । 

3. গান্ধীজির রাষ্ট্রতত্ত্বে শ্রমজীবী জনসাধারণ কর্তৃক রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কোনো ইঙ্গিত নেই । কিন্তু মার্কসীয় রাষ্ট্রতত্ত্বে সর্বহারা শ্রমজীবী মানুষের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে । মার্কসবাদে বলা হয়েছে , সর্বহারা শ্রেণি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করার পর সমাজের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থেই তা পরিচালিত হবে । 

4. গান্ধীজির রাষ্ট্র চিন্তার সঙ্গে ধর্ম ও নৈতিকতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে । অন্যদিকে , সামাজিক ও রাষ্ট্রনৈতিক সমস্যার বিচার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিজ্ঞানসম্মত , ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এর মূল ভিত্তি । 

5. মার্কসবাদে উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশের ক্রমপর্যায়েই রাষ্ট্রের উৎপত্তি , বিবর্তন ও বিলোপের কথা বলা হয় । অন্যদিকে , গান্ধিজি মানুষের পরপীড়নের প্রবৃত্তিকে রাষ্ট্রের উৎপত্তির কারণ এবং মানুষের অন্তঃকরণে সবুদ্ধির উদয়কে রাষ্ট্রের বিলোপের উপায় বলে নির্দেশ করেছেন । 

উপসংহার 

উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে যে , রাষ্ট্র সম্পর্কে গান্ধীজির দৃষ্টিভঙ্গি ও মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে । রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও পরিণতি মার্কস যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন , তার সঙ্গে গান্ধীজির বক্তব্যের কোনো মিল নেই ।

error: Content is protected !!