ফ্যাসিবাদের মূল্যায়ন

ফ্যাসিবাদের মূল্যায়ন

ফ্যাসিবাদের ইতিবাচক দিক 

ফ্যাসিবাদের প্রবক্তারা এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে কয়েকটি যুক্তির অবতারণা করেন । তাঁদের মতে , জাতীয় ঐক্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় এবং জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদ কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছে । জাতীয় সংকটের সময় জাতির জীবনে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা বিধানে এর কোনো বিকল্প নেই । 

ফ্যাসিবাদ জনগণকে দেশের প্রতি কর্তব্যপালন , জাতীয় সংহতি রক্ষা , দুর্নীতি মুক্ত স্বচ্ছ প্রশাসন প্রতিষ্ঠা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে এক নতুন জনচেতনা গড়ে তুলতে সক্ষম । তা ছাড়া ব্যক্তির উন্নয়নের চেয়ে জাতির উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে ফ্যাসিবাদ দেশের আর্থিক ভিত্তিকে স্বল্প সময়ের মধ্যে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে সক্ষম হয় । 

ফ্যাসিবাদের নেতিবাচক দিক 

ফ্যাসিবাদের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একে মানব সভ্যতার চরম শত্রুরূপে অভিহিত করা হয় । ফ্যাসিবাদের নেতিবাচক দিকগুলি হল— 

রাজনৈতিক সুবিধাবাদ : 

ফ্যাসিবাদ প্রকৃত অর্থে একধরনের রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ছাড়া আর কিছুই নয় । ফ্যাসিবাদকে কোনো সুসংহত মতবাদরূপে আখ্যা দেওয়া যায় না । ক্ষমতাকে আঁকড়ে থাকা ফ্যাসিবাদী একনায়কের প্রধান লক্ষ্য । ফ্যাসিবাদী শাসকরা গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক নীতির কথা মুখে বললেও বাস্তবে স্বৈরাচারী একনায়তন্ত্রের পূজারি । 

গণতন্ত্রের বিরোধিতা : 

ফ্যাসিবাদ হল গণতন্ত্রের শত্রু । ফ্যাসিবাদ নাগরিক স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণরূপে সর্ব করে । ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করা হয় । রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হল এর ভিত্তি । কোনো ধরনের বিরোধী শক্তিকে ফ্যাসিবাদে বরদাস্ত করা হয় না । জনগণের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা , সংবাদপত্রের স্বাধীনতা , বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র ও স্বাধীন অস্তিত্ব ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে স্বীকার করা হয় না । নির্বাচন ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকলেও তা নেহাতই আনুষ্ঠানিক । 

আন্তর্জাতিকতাবাদের বিরোধিতা : 

ফ্যাসিবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদের মহান আদর্শকে নস্যাৎ করতে চায় । উগ্র বা বিকৃত জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ফ্যাসিবাদ জাতীয় শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে তুলে ধরে অন্যান্য জাতির প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষের মনোভাব ছড়ায় । শান্তির পথকে অস্বীকার করে ফ্যাসিবাদ যেভাবে যুদ্ধবাদকে প্রশ্রয় দেয় তাতে আন্তর্জাতিক মৈত্রী সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয় । বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও বিরোধ মীমাংসায় ফ্যাসিবাদ কোনো আন্তর্জাতিক সংগঠনের অস্তিত্বকে মেনে নিতে পারেনি । মুসোলিনির মতে , ‘ বিশ্বশান্তি ’ হল কাপুরুষের স্বপ্ন । 

জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের বিকৃত ধারণার পৃষ্ঠপোষকতা : 

ফ্যাসিবাদ জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের এক বিকৃত ধারণাকে প্রতিষ্ঠা ও প্রচার করে থাকে । এমনকি ফ্যাসিবাদীরা তথাকথিত বর্বর ও মিশ্র রক্তের জাতিগুলির ওপর অত্যাচার ও তাদের অবমাননা ক’রে একধরনের গর্ব অনুভব করে । হিটলার তাঁর নাতসি জার্মানির জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বকে এভাবেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ।

সমাজতন্ত্র ও মানবতার শত্রু : 

ফ্যাসিবাদকে সমাজতন্ত্রের ও মানবতার শত্রুরূপে অভিহিত করা হয় । পুঁজিবাদী শ্রেণির স্বার্থে এখানে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিদাওয়াকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয় । এই কারণে ফ্যাসিবাদকে অনেকে প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শ বলে চিহ্নিত করেন । তা ছাড়া ফ্যাসিবাদ মানবিক অধিকারকেও পদদলিত করে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রনায়ক হিটলার যেভাবে ইহুদি নিধন যজ্ঞ চালান তা চূড়ান্ত অমানবিকতার পরিচয় বহন করে । 

উপসংহার 

পরিশেষে বলা যায় , ফ্যাসিবাদ হল একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার এমন এক রূপ যেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও ক্ষমতালোভী নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয় । ল্যাস্কির মতে , ফ্যাসিবাদ হল পতনোন্মুখ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সংরক্ষণের সর্বশেষ হাতিয়ার । আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে ফ্যাসিবাদ একটি পরিত্যক্ত ধারণা ।

error: Content is protected !!