ফ্যাসিবাদের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য

ফ্যাসিবাদের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইবেনস্টাইনের মতে , ফ্যাসিবাদ হল এমন এক সর্বনিয়ন্ত্রণবাদী মতবাদ যা উগ্র জাতীয়তাবাদ , আগ্রাসী জাতিবিদ্বেষ এবং সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত একদলীয় একনায়কতন্ত্রী শাসনব্যবস্থা কায়েম করার পক্ষপাতী । ফ্যাসিবাদের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল— 

সর্বাত্মক রাষ্ট্রের ধারণা 

হেগেলের সর্বাত্মক রাষ্ট্রের ধারণাকে ( Totalitarian State ) ভিত্তি করেই ফ্যাসিবাদ গড়ে উঠেছিল । ফ্যাসিবাদে রাষ্ট্রের যূপকাষ্ঠে ব্যক্তিকে বলিপ্রদত্ত বলে মনে করা হয় । এই রাষ্ট্রীয় তত্ত্ব অনুসারে , রাষ্ট্রের শুধু যে স্বাধীন সত্তা রয়েছে তাই নয় , রাষ্ট্রের একটি ‘ প্রকৃত ইচ্ছা’ও আছে , যা জনগণের ইচ্ছা থেকে একেবারে আলাদা । 

মুসোলিনির মতে , রাষ্ট্র জনগণের ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষুদ্র গণ্ডিকে অতিক্রম ক’রে জাতির বিবেকের মূর্ত প্রতীকরূপে রাষ্ট্র কাজ করে । তাই জনগণের বিবেক হল রাষ্ট্র । রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সবকিছুর ঊর্ধ্বে । 

একদলীয় রাষ্ট্রের অস্তিত্ব 

একদলীয় রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ফ্যাসিবাদের একটি প্রধান উপাদান । ফ্যাসিবাদী একনায়ক হিটলার , মুসোলিনি , ফ্রাঙ্কো প্রমুখ জাতির ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে একটিমাত্র দল গড়ে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন । বিরোধী দল বা সংগঠনের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলার জন্যে ফ্যাসিবাদী একনায়করা গুপ্তহত্যা , সন্ত্রাস , নির্বিচারে গ্রেফতার প্রভৃতির আশ্রয় নিতে দ্বিধা বোধ করেন না । 

জাতি ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন 

ফ্যাসিবাদে জাতি ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয় । জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাটি ফ্যাসিবাদী একনায়করা জনগণের কাছে বারবার প্রচার করে একধরনের উন্মাদনার জন্ম দেন । হিটলার যেমন শুধুমাত্র জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্বের কথা প্রচার করেছিলেন । 

রাষ্ট্রের সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ 

ফ্যাসিবাদ অনুসারে , শুধুমাত্র ফ্যাসিস্ট দলই জনগণের সমস্যা অনুধাবনে সক্ষম । সাধারণ মানুষের পক্ষে দেশের সমস্যাগুলি বোঝা মুশকিল , তাই এক্ষেত্রে জনগণের নিষ্ক্রিয় থাকাই বাঞ্ছনীয় । ফ্যাসিবাদী যৌথ রাষ্ট্রের ধারণা অনুসারে , রাষ্ট্রের কাজকর্ম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন পেশাগত গোষ্ঠী এবং কর্পোরেশন দ্বারা পরিচালিত হবে । এভাবে ব্যক্তির ওপর গোষ্ঠী বা কর্পোরেশনের এবং কর্পোরেশন বা গোষ্ঠীর ওপরে রাষ্ট্রের সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হয় ।

উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রতিষ্ঠা 

ফ্যাসিবাদের মূল ভিত্তি হল উগ্র জাতীয়তাবাদ ও আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ । বিশুদ্ধ আর্য জাতির প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর অনার্য জাতিগুলির ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকে জার্মান জাতির পবিত্র কর্তব্য বলে হিটলার ঘোষণা করেছিলেন । মুসোলিনি বিশ্ব শান্তিকে ‘ কাপুরুষের স্বপ্ন ‘ আখ্যা দিয়েছিলেন । তিনি মনে করতেন , স্ত্রীলোকের কাছে মাতৃত্ব যেমন কাম্য , পুরুষের কাছে যুদ্ধও ঠিক তাই । 

উদারনীতিবাদ , ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা 

জনগণের সার্বভৌমত্ব , সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার , আইনের অনুশাসন , নাগরিকদের মৌলিক অধিকার , ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ , গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রভৃতি উদারনীতিবাদের মৌলিক উপাদানগুলিকে ফ্যাসিবাদে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে । ফ্যাসিবাদ আবার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদেরও সম্পূর্ণ বিরোধী । ফ্যাসিবাদ মনে করে , ব্যক্তির স্বার্থ রাষ্ট্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে । ব্যক্তিস্বাধীনতার কোনো অস্তিত্ব ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে স্বীকার করা হয় না । 

ফ্যাসিবাদ অনুসারে , রাষ্ট্রের ইচ্ছার সঙ্গে একাত্মতা স্থাপনের মাধ্যমে নাগরিকরা ব্যক্তি স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে । রাষ্ট্রের ইচ্ছার বাইরে ব্যক্তির কোনো স্বতন্ত্র ইচ্ছা থাকতে পারে না বলে ফ্যাসিবাদ বিশ্বাস করে । ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্রেরও কট্টর বিরোধী । 

অভিজাত বা এলিটদের প্রাধান্য 

ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রকৃতিগতভাবে অভিজাততন্ত্রে বিশ্বাসী । মুষ্টিমেয় এলিট বা অভিজাতবর্গের রাষ্ট্র শাসনের যোগ্যতা আছে বলে ফ্যাসিবাদে মনে করা হয় । এই অভিজাতবর্গের ওপরে থাকেন সমগ্র জাতির ভাগ্যনিয়ন্তা দল ও রাষ্ট্রের নায়ক । এই দলনায়ক বা রাষ্ট্রনায়ক হলেন ‘ অতিমানব ’ ; নিৎসের তত্ত্ব অনুসারে , এই অতিমানব সমস্ত ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে । ইতালিতে মুসোলিনি এবং জার্মানিতে হিটলার ছিলেন এ ধরনের অতিমানব । 

নারী স্বাধীনতার চরম বিরোধিতা 

ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে নারীস্বাধীনতাকে স্বীকার করা হয়নি । স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সমানাধিকারের বিষয়টি ফ্যাসিবাদে উপেক্ষা করা হয় । হিটলার এবং মুসোলিনি — এই দুই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রনায়কের অভিমত ছিল , গৃহকোণই নারীদের আদর্শ স্থান । তাঁরা মনে করতেন , নতুন প্রজন্মের বীর যোদ্ধাদের জন্ম দেওয়া ও লালন পালন করাই নারীদের একমাত্র কাজ । 

নাগরিক স্বাধীনতার বিরোধিতা 

ফ্যাসিবাদ নাগরিক স্বাধীনতার বিষয়ে সম্পূর্ণ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে । ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে সমাজের মুষ্টিমেয় অভিজাত শ্রেণির ভোটাধিকার স্বীকৃত হয় । বলা হয় রাষ্ট্রকে যারা অর্থ দেবে তারাই ভোটাধিকার পাবে । গণতন্ত্রের সাম্য , মৈত্রী ও স্বাধীনতার পরিবর্তে ফ্যাসিবাদ এক কঠোর শৃঙ্খলা , দায়িত্ব আর স্তর বিন্যাসের কথা প্রচার করে । এখানে রাষ্ট্রের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যই হল স্বাধীনতা । 

পুঁজিবাদী অর্থনীতির পৃষ্ঠপোষকতা 

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে প্রাধান্য দেয় । ফ্যাসিবাদ এমন এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার কথা বলে যেখানে কোনো ধরনের বিরোধিতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় না । শ্রমিকদের কোনো ধরনের বিক্ষোভ বা ধর্মঘটের অধিকার এখানে স্বীকৃত নয় । ফ্যাসিবাদ যে আর্থিক নীতি গ্রহণ করে তার ফলে শুধুমাত্র পুঁজিপতি শ্রেণি লাভবান হয়ে থাকেন । 

ল্যাস্কির মতে , ফ্যাসিবাদ হল পতন প্রায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সংরক্ষণের অন্তিম প্রতিকার ( ” Fascism is the last remedy to save a tottering capitalist system . ” ) ।

error: Content is protected !!