মার্কসবাদের মৌলিক নীতির মূল্যায়ন 

মার্কসবাদের মৌলিক নীতির মূল্যায়ন 

সমালোচকরা মার্কসবাদের মৌলিক নীতির মূল্যায়ন প্রসঙ্গে নিম্নলিখিত যুক্তিগুলির অবতারণা করেন—  

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদে বস্তুময়তার প্রাধান্য

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে সমালোচকরা এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে , মার্কস ও এঙ্গেলসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদে জগৎ ও জীবনের বস্তুময়তাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে । এই মতবাদে চিন্তা বা চৈতন্যের কোনো স্বতন্ত্র অবদান স্বীকৃত হয়নি । 

একপেশে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ 

মানব সমাজের ইতিবৃত্ত বিশ্লেষণে মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উপাদানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বলে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন । তাঁদের মতে সমাজ বিকাশে ধর্মীয় অনুভূতি , ভাবাবেগ , আদর্শ , প্রেম , প্রীতি ইত্যাদির গুরুত্ব কিছু কম নয় । 

উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্বের অসম্পূর্ণতা 

মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্বটির মূল্যায়ন করতে গিয়ে সমালোচকরা বলেছেন , এক্ষেত্রে উৎপাদনের একমাত্র উপাদান হিসেবে শুধুমাত্র শ্রমকেই উল্লেখ করা হয়েছে । উৎপাদনের অন্য স্বীকৃত উপাদানগুলি তাঁর তত্ত্বে কোনো গুরুত্ব পায়নি ।

শ্রেণিসংগ্রামের অনস্তিত্ব

মার্কসের শ্রেণি ও শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলা হয় যে , মার্কস ও এঙ্গেলসের জীবদ্দশায় পুঁজিবাদ অত্যন্ত প্রাথমিক অবস্থায় ছিল । বর্তমানে পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের যুগে পৃথিবীর ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতে আদৌ কোনো শ্রেণিসংগ্রাম আছে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ জাগে । 

তা ছাড়া সমালোচকদের মতে , মানব সমাজের ইতিহাস শুধুমাত্র শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস নয় , মানব সমাজে প্রেম প্রীতির সহযোগিতামূলক মনোভাবের মাধ্যমেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে । তা ছাড়া সমাজের সমস্ত ইতিহাসকে শুধুমাত্র দুটি শ্রেণির সংঘর্ষের ইতিহাস হিসেবে ব্যাখ্যা করাও ঠিক নয় । সমাজে বহু মধ্যবিত্ত শ্রেণি রয়েছে যাদের সর্বহারা ও ধনিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা যায় না । 

রাষ্ট্রতত্ত্বের ভ্রান্ত ধারণা 

সমালোচকদের মতে , রাষ্ট্রের উৎপত্তি , প্রকৃতি এবং পরিবর্তনের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মার্কস শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উপাদানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন । কিন্তু সমাজ বিবর্তনে অর্থনীতি ছাড়াও ধৰ্ম , আদর্শ , সংস্কৃতি , ন্যায়নীতি প্রভৃতি উপাদানের অপরিহার্য ভূমিকাকে উপেক্ষা করা যায় না । 

একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আর একটি নতুন রাষ্ট্র ও সমাজের উদ্ভব ঘটবে বলে মার্কস যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন , তা নিয়তিবাদের মতো একটি ভ্রান্ত ধারণা বলে সমালোচকরা মনে করেন । মার্কস রাষ্ট্রকে শুধুমাত্র শ্রেণিশোষণের হাতিয়াররূপে ব্যাখ্যা করেছেন , তিনি আধুনিক সমাজকল্যাণকর রাষ্ট্রের কথা ভাবতে পারেননি । 

বিপ্লর তত্ত্ব নিছক কল্পনা 

মার্কসের বিপ্লব সংক্রান্ত তত্ত্বটির মূল্যায়ন করতে গিয়ে সমালোচকরা বলেন , মার্কসীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী উন্নত পুঁজিবাদী দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রথম আবির্ভাব ঘটেনি । ১৯১৭ সালের রাশিয়া এবং ১৯৪৯ সালের চিন উন্নত পুঁজিবাদী দেশ ছিল না । 

বিপ্লব সংক্রান্ত মার্কসীয় ব্যাখ্যায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব কায়েম হওয়ার পরে সাম্যবাদে উন্নীত হওয়ার কথা বলা হয়েছে , কিন্তু এইরকম কোনো দৃষ্টান্ত অতীতে বা বর্তমানে দেখা যায় না । গণসাধারণতন্ত্রী চিন আজও সাম্যবাদে উন্নীত হতে পারেনি । ১৯৯১ সালে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায় । রাষ্ট্রের বিলুপ্তি সংক্রান্ত বিষয়ে এবং শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রসঙ্গে মার্কসীয় ভবিষ্যদ্বাণী নিছক কল্পনামাত্র । 

উপসংহার 

মার্কসবাদের মৌল নীতিগুলির সমালোচনা সত্ত্বেও এ কথা বলা যায় যে , রাষ্ট্র চিন্তার ইতিহাসে কার্ল মার্কসের তত্ত্ব এক অমূল্য সংযোজন । মানব সমাজের বিবর্তনের ধারায় অর্থনৈতিক শক্তির ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ । মার্কস তাঁর তত্ত্বে কোনো বিমূর্ত ধারণার অবতারণা করেননি । মানব সমাজের বিকাশের ধারাকে তিনি ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সাহায্যে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন । 

এজন্য মার্কসের সমাজতান্ত্রিক মতবাদকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র আখ্যা দেওয়া হয় । শোষিত মানুষের সার্বিক মুক্তিকামনায় মার্কস যে উন্নততর সমাজের দিক নির্দেশ করেছেন তার গুরুত্ব অনস্বীকার্য ।

error: Content is protected !!