জাতিপুঞ্জের মহাসচিবের ক্ষমতা ও কার্যাবলী

জাতিপুঞ্জের মহাসচিবের ক্ষমতা ও কার্যাবলী

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের কাজকর্ম পরিচালনার ব্যাপারে সচিবালয় ও মহাসচিবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে । বিশ্বশান্তি এবং নিরাপত্তা রক্ষায় নিরাপত্তা পরিষদের পরই মহাসচিব এবং তাঁর সচিবালয় কার্যকরী ভূমিকা পালন করে । একজন মহাসচিব এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মচারীদের নিয়ে সচিবালয় গঠিত হয় । নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ অনুসারে সাধারণ সভা মহাসচিবকে নির্বাচন করে থাকে । সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদের ৯৮ এবং ৯৯ নং ধারায় মহাসচিবের ক্ষমতা ও কার্যাবলী উল্লিখিত হয়েছে । এই ক্ষমতা ও কার্যাবলীর ক্ষেত্রগুলি হল— 

জাতিপুঞ্জের প্রশাসন 

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মুখ্য প্রশাসক হলেন মহাসচিব । নিরাপত্তা পরিষদ , সাধারণ সভা , অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ প্রভৃতির বৈঠক যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় তার জন্য মহাসচিবের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে । সচিবালয়ের কাজকর্মের বার্ষিক রিপোর্ট প্রতি বছর মহাসচিব সাধারণ সভায় পেশ করে থাকেন । এ ছাড়া জাতিপুঞ্জের অধীনস্থ বিভিন্ন কমিশন ও কমিটি গঠন করা , সাধারণ সভার অধিবেশন আহ্বান ইত্যাদি কাজ তিনি নিজে করে থাকেন । 

বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় 

জাতিপুঞ্জের বিভিন্ন শাখা সংগঠন এবং বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলির কাজকর্মের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা মহাসচিবের প্রধান কাজ । জাতিপুঞ্জের বিভিন্ন সংস্থা , কমিশন ও কমিটিগুলির কাজের সুবিধার জন্য দরকারি দলিল পত্র , পরিসংখ্যান এবং তথ্যাদি সরবরাহ করা , সংস্থাগুলির আলোচনা নথিভুক্ত ও সংরক্ষণ করা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজ মহাসচিবকে করতে হয় । 

অর্থ 

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের বাজেট তৈরি করার প্রধান দায়িত্ব মহাসচিবের । মহাসচিব জাতিপুঞ্জের কোশাধ্যক্ষের ভূমিকাও পালন করে থাকেন । তিনি জাতিপুঞ্জের সদস্য রাষ্ট্রগুলির বার্ষিক চাঁদা আদায় করেন । কোনো সদস্য রাষ্ট্র চাঁদা না দিলে সে সম্পর্কে তিনি সাধারণ সভার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন । 

সচিবালয়ের প্রশাসন 

সচিবালয়ের কর্মচারীদের নিয়োগ করার ক্ষমতা মহাসচিবের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে । অবশ্য এক্ষেত্রে তাঁকে সাধারণ সভার নিয়মাবলি মেনে চলতে হয় । সচিবালয়ের কর্মীরা মহাসচিবের নির্দেশ অনুসারে কাজ করেন । কোনো কর্মী নিয়ম শৃঙ্খলা অমান্য করলে মহাসচিব তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে পারেন । 

শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা 

সনদের ৯৯ নং ধারা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা দেখা দিলে মহাসচিব নিরাপত্তা পরিষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন । কোনো সদস্য রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের ভূখণ্ড আক্রমণ করলে অথবা কোনো এলাকায় শান্তি ভঙ্গের কোনো গুরুতর ঘটনা ঘটলে মহাসচিব শান্তি রক্ষায় প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকেন । নিরাপত্তা পরিষদ এবং সাধারণ সভার মতো মহাসচিবও এসব ক্ষেত্রে সালিশি , আপস মীমাংসা , মধ্যস্থতা , আলাপ আলোচনা প্রভৃতি শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করেন ।  

জাতিপুঞ্জের প্রতিনিধিত্ব 

জাতিপুঞ্জের প্রতিনিধি হিসেবে মহাসচিবের ক্ষমতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ । কোনো সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটলে মহাসচিব তাঁর মতামত প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন , অথবা জাতিপুঞ্জের তরফ থেকে তিনি গ্রহণযোগ্য যে কোনো চুক্তি সম্পাদনও করতে পারেন । 

মূল্যায়ন 

সাফল্য : 

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের কার্যাবলী বিশ্লেষণ করলে বিশ্ব রাজনীতিতে জাতিপুঞ্জের মহাসচিবের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা লক্ষ করা যায় । এ প্রসঙ্গে উদাহরণ স্বরূপ সুয়েজ সমস্যার ( ১৯৫৬ খ্রি. ) শান্তিপূর্ণ সমাধানে হ্যামারশিল্ড এর ভূমিকা , কিউবা সমস্যা ( ১৯৬১-৬২ খ্রি. ) ও কঙ্গো সমস্যা ( ১৯৬০-৬৪ খ্রি. ) সমাধানে উ থান্ট এর ভূমিকা এবং ভিয়েতনাম সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ভাল্ডহাইম এর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা যায় ।

ব্যর্থতা : 

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এযাবৎ আধুনিক একমেরু বিশ্বে মহাসচিবের ভূমিকা অবশ্য ততখানি উজ্জ্বল নয় । সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় মহাসচিব কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারেননি । 

২০০১ সালের ১১ ই সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে একক ক্ষমতায় আফগানিস্তানে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান চালায় তাতে মহাসচিবের ভূমিকা নীরব দর্শকের বেশি আর কিছুই ছিল না । 

২০০৩ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি বুশের নেতৃত্বে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনী যেভাবে ইরাকে সামরিক আক্রমণ চালিয়ে সাদ্দাম হোসেন সরকারকে উৎখাত ক’রে নয়া ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করে এবং সম্প্রতি ২০০৬ সালে ইজরায়েল যেভাবে লেবাননের ওপরে সামরিক আক্রমণ চালায় , মহাসচিব সেসব ক্ষেত্রে কোনো কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারেননি । 

সুতরাং , সার্বিক বিচারে মহাসচিবের ভূমিকাকে খুব বেশি উজ্জ্বল বলা যায় না । বরং বলা যায় , মহাসচিব হলেন বিশ্বের বৃহত্তম শক্তির হাতের ক্রীড়নক মাত্র ।

error: Content is protected !!