বিশ্বায়নের প্রভাব ও ফলাফল

বিশ্বায়নের প্রভাব ও ফলাফল

বিশ্বায়ন ( Globalization ) একটি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া । জোসেফ স্টিগলিৎজ এর মতে , বিশ্বায়ন বলতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দেশ ও জনগণের মধ্যে এক নিবিড় সংযোগ সাধনের প্রক্রিয়াকে বোঝায় । আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । বিশ্বায়নের প্রভাব বা ফলাফল পর্যালোচনায় উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলি হল : 

উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের বৈষম্য বৃদ্ধি 

বিশ্বায়নের ফলে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠেছে । আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার , বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা কর্তৃক গৃহীত বৈষম্যমূলক নীতির ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি উন্নত দেশগুলির ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে । 

এডওয়ার্ড এস. হারমানের মতে বিশ্বে সবচেয়ে ধনী ও দরিদ্র দেশে বসবাসকারী মানুষের আয়ের ফারাক ১৯৬০ সালে ৩০ : ১ থেকে বেড়ে ১৯৯৫ সালে ৮২ : ১ এ দাঁড়িয়েছে । 

বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধা সম্পদ অধিকারের ( TRIP ) প্রয়োগ 

বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা বাণিজ্যিক বিশ্বায়নের নীতিকে কার্যকরী করার জন্য বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধা সম্পদ অধিকারের যে চুক্তি বলবৎ করেছে তার ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলি এই অধিকার অনুযায়ী পেটেন্ট , কপিরাইট , ট্রেডমার্ক , ব্যাবসায়িক গোপনীয়তার সুরক্ষা প্রভৃতি বিষয় কতটা নিজেদের এক্তিয়ারে সংরক্ষিত রাখতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে । তা ছাড়া এসব ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতাতেও তারা টিকে থাকতে পারছে না । 

বহুজাতিক সংস্থার আধিপত্য বিস্তার 

বিশ্বায়নের ফলে বাণিজ্য সম্পর্কিত বিনিয়োগ ব্যবস্থা ( Trade Related Investment Measures or TRIMS ) গৃহীত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বহুজাতিক সংস্থা বা কর্পোরেট বিশ্বের আধিপত্য বিস্তৃত হয়েছে । সারা বিশ্ব জুড়ে বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থাগুলি উন্নয়নশীল দেশগুলির ক্ষুদ্র সংস্থাগুলিকে অধিগ্রহণ বা সংযুক্তির মাধ্যমে দখল করে নিয়ে তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়েছে । কোনো কোনো বহুজাতিক সংস্থার বার্ষিক আয় একটি রাষ্ট্রের জাতীয় আয়কেও ছাড়িয়ে গেছে । 

যেমন , মার্কিনি বহুজাতিক সংস্থা জেনারেল মোটরসের বার্ষিক আয় নরওয়ের জাতীয় আয়কে অতিক্রম করেছে । আবার মার্কিনি তেল সংস্থা এখানের বার্ষিক আয় ভেনেজুয়েলার জাতীয় আয়ের চেয়ে অনেক বেশি ।

নয়া ঔপনিবেশিক অর্থনীতির উদ্ভব 

বিশ্বায়নের ফলে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা উন্নত ও ধনী দেশগুলির কুক্ষিগত হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নয়া ঔপনিবেশিক অর্থনীতি এবং ‘ উত্তর-দক্ষিণ ’ সংঘাতের উদ্ভব ঘটেছে । উন্নত দেশগুলি উন্নয়নশীল বিশ্বের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে সম্পূর্ণ নেতিবাচক অবস্থান গ্রহণ করেছে । 

উন্নত দেশগুলির কর্তৃত্বাধীন বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা যেভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলির ওপরে শ্রম খরচ ( Labour Cost ) সংক্রান্ত বিধান , অভিন্ন শ্রমিক স্বার্থ সম্পর্কিত নীতি গ্রহণ , কৃষিক্ষেত্রে ভরতুকি কমানো প্রভৃতি বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করে চলেছে , তার ফলে উত্তর ( উন্নত ) বনাম দক্ষিণ ( উন্নয়নশীল ) সংঘাত তীব্রতর হয়ে দেখা দিয়েছে । 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ মোগেনস বুখ হানসেনের মতে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নির্দেশিত উদার অর্থনৈতিক পথে চলতে গিয়ে ধনী বিশ্ব আরও ধনী হচ্ছে , অন্যদিকে দরিদ্র বিশ্ব দরিদ্রতর হচ্ছে ।

সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি 

আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার , বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নির্দেশে উন্নয়নশীল দেশগুলি যে কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস ( Structural Adjustment ) এ হাত দিয়েছে তার ফলে ব্যাপকভাবে কর্মী সংকোচন , ছাঁটাই , লে অফ , লক আউট , রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বিলগ্নিকরণ , জাতীয় ব্যয়ের সংকোচন ইত্যাদি পন্থা অনুসৃত হচ্ছে । কাঠামোগত এই পুনর্বিন্যাসের ফলে বেকারত্ব , দারিদ্র্য প্রভৃতি বৃদ্ধি পেয়েছে । আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সংকট দেখা দিয়েছে । 

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংকট 

বিশ্বায়নের ফলে সারা বিশ্বজুড়ে সাংস্কৃতিক সমতা তৈরির চেষ্টা চলেছে । ইন্টারনেট সহ অত্যাধুনিক গণমাধ্যমের সহায়তায় এক পণ্যমুগ্ধ ভোগবাদী সংস্কৃতির নিরন্তর প্রচারের ফলে আঞ্চলিক ও জাতীয় সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য ক্ষুণ্ণ হতে বসেছে । বিশ্বায়ন বৈচিত্র্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে এক ছাঁচে ঢেলে এক ধরনের সাংস্কৃতিক সমতা চাপিয়ে দিতে চায় । অনেকে একে মার্কিনি ম্যাকডোনাল্ড সংস্কৃতি আখ্যা দিয়েছেন । এর ফলে তৃতীয় বিশ্বের বহুমুখী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এক সংকটের সম্মুখীন হয়েছে । 

জাতি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সংকট 

বিশ্বায়নের প্রভাবে জাতি রাষ্ট্রের ( Nation State ) সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন । রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব তার নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সমূহ ও নাগরিকবৃন্দের ওপর চূড়ান্তভাবে প্রযোজ্য হয় । বিশ্বায়ন জাতি রাষ্ট্রের এই ভূখণ্ডকেন্দ্রিক সর্বব্যাপী ক্ষমতাকে খর্ব করে রাষ্ট্রকে একটি ‘ বাজার কেন্দ্রিক সংগঠনে ‘ পরিণত করেছে । এর ফলে সার্বভৌমত্বের ধারণার বদল ঘটেছে । 

পরিবেশ দূষণ 

বিশ্বায়নের ফলে এশিয়া , আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে । বহুজাতিক সংস্থাগুলি এই সমস্ত এলাকায় যেসব শিল্প গড়ে তুলছে সেগুলির কারণে যথেচ্ছভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে । 

বস্তুত , তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে পরিবেশের ব্যাপারে উন্নত বিশ্বের মতো কোনো কঠোর আইন না থাকায় বহুজাতিক সংস্থাগুলি খুব সহজেই এখানে পরিবেশ দূষণকারী শিল্প গড়ে তুলতে পারছে । তা ছাড়া বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার অবাধ বাণিজ্যনীতির সুযোগে উন্নত দেশগুলির উৎপাদন কেন্দ্রের বর্জ্য পদার্থ উন্নয়নশীল দেশে পরিত্যক্ত হওয়ার ফলে সেখানকার পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে । 

উপসংহার 

একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বায়ন এক অবশ্যম্ভাবী আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া । সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিশ্বায়ন সমগ্র বিশ্বকে এক ‘ ভুবন গ্রাম ‘ এ ( Global Village ) রূপান্তরিত করেছে । এর ফলে রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক আরও নিবিড়ভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে । 

বিশেষত , বহির্বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের মুক্ত বাণিজ্য নীতি ( Free Trade Policy ) উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে । বিদেশি পুঁজি লগ্নি , বিদেশি বিনিয়োগ , তথ্য প্রযুক্তির অবাধ আদান প্রদান , রপ্তানি বাণিজ্যের উদারীকরণ ইত্যাদি বিষয়কে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে বিশ্ববাণিজ্যকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ এনে দিয়েছে বিশ্বায়ন । 

অবশ্য এই পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির নিজেদের স্বার্থরক্ষায় বিশ্বায়নকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে আরও ঐক্যবদ্ধ তৎপরতার পরিচয় দেওয়া দরকার ।

error: Content is protected !!