বিশ্বায়ন কাকে বলে

বিশ্বায়ন কাকে বলে

বিশ্বায়ন বা ‘ Globalization ‘ বিষয়টিকে কোনো একটি নির্দিষ্ট বাক্যে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন । বিশ্বায়ন একটি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া । তবে বিশ্বায়ন কোনো আকস্মিক প্রক্রিয়া নয় ; তা বহু পূর্ব থেকেই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল । সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ঠান্ডা লড়াইয়ের পরিসমাপ্তির যুগে ‘ বিশ্বায়ন ‘ শব্দের প্রয়োগ নতুন মাত্রা পায় । বর্তমানে বিশ্বায়নের ধারণার সঙ্গে ‘ ভুবন গ্রাম ‘ ( Global Village ) এর ধারণাকেও যুক্ত করা হয় । 

জোসেফ স্টিগলিৎজ এর মতে , বিশ্বায়ন হল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জনগণের মধ্যে এক নিবিড় সংযোগ সাধনের প্রক্রিয়া । বিশ্বায়নের ফলে পরিবহণ ও যোগাযোগের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পাওয়ায় দ্রব্য সামগ্রী , পরিসেবা , পুঁজি , জ্ঞান , এমনকি পৃথিবী জুড়ে মানুষের অবাধ যাতায়াতের অধিকারের ওপর আরোপিত কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতাগুলি দূর হয়েছে । 

মূলত মুক্ত বাজার অর্থনীতি ( Free Market Economy ) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নতুন করে এক নয়া বিশ্বব্যবস্থার ( New World Order ) পত্তন করে । এর ফলে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া নতুন মাত্রা পায় । অনেকে এই বিশ্বায়নকে ‘ নয়া উদারনৈতিক বিশ্বায়ন ’ ( Neo-liberal Globalization ) বলে অভিহিত করেছেন । 

আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার ( IMF ) , বিশ্বব্যাংক ( World Bank ) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ( WTO ) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশ্বায়নকে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে । রোলান্ড রবার্টসনের মতে বিশ্বায়ন এক নয়া বিশ্ব ব্যবস্থা সম্প্রসারণের ধারণার সঙ্গে জড়িত । 

বিশ্বায়নের বৈশিষ্ট্য 

বিশ্বায়নের কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে । তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল 

1. তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি ; 

2. সাংস্কৃতিক সমতা ; 

3. ভূখন্ডকেন্দ্রিক জাতীয় রাষ্ট্রগুলির সীমানা বা ভূখণ্ডের অবলুপ্তি সম্পর্কিত ধারণা ; 

4. বেসরকারিকরণ ও উদারিকরণ ; 

5. মুক্তবাজার অর্থনীতি ; 

6. প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ , 

7. আমদানি নিয়ন্ত্রণ মুক্ত অবাধ বাণিজ্য ; 

8. বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে অবাধ যাতায়াত ; 

9. এক দেশ থেকে অন্য দেশে পুঁজির অবাধ আদান প্রদান ; 

10. উৎপাদনের একত্রীকরণ ও কেন্দ্রীভবন ইত্যাদি ।

বিশ্বায়নের প্রতিক্রিয়া 

বিশ্বায়নের তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায় , যথা— উদারনৈতিক ও নয়া উদারনৈতিক প্রতিক্রিয়া ; বিরোধী প্রতিক্রিয়া ; সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া । নয়া-উদারনৈতিক চিন্তাবিদরা বিশ্বায়ন সংক্রান্ত নীতিকে সমর্থন জানিয়ে এক মুক্ত সমাজের কথা প্রচার করেন । তাঁদের মতে , বিশ্বায়ন হল সেই স্বপ্নের বাস্তবরূপ যা সীমানা বিহীন এক মুক্ত সমাজকে প্রতিষ্ঠা করে । 

অন্যদিকে , বিশ্বায়ন বিরোধী প্রতিক্রিয়া ১৯৯৯ সালের সিয়াটোল সম্মেলনের পর লক্ষ করা যায় । বিশ্বায়নের সমালোচনা করে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ নয়া-উদারনীতিবাদী বিশ্বায়নকে কার্যত দারিদ্র্যের বিশ্বায়ন বলে আখ্যা দিয়েছেন । উপসংহার একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বায়ন যে এক অবশ্যম্ভাবী আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া সে – বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । বহির্বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের মুক্তবাণিজ্য নীতি উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে ।

বিশ্বায়নের সুফল 

বিশ্বায়ন একটি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া । জোসেফ স্টিগলিৎজের মতে , বিশ্বায়ন বলতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দেশ ও জনগণের মধ্যে নিবিড় সংযোগসাধনের প্রক্রিয়াকে বোঝায় । আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । বিশ্বায়নের সুফলগুলি হল— 

1. পণ্য ও মূলধনের বাজারের প্রসার ; 

2. টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি , 

3. তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি ; 

4. ব্যাংক , বিনিয়োগ , শিল্প ও বাণিজ্যের অকল্পনীয় বিস্তার ; 

5. বিভিন্ন জাতি , গোষ্ঠী , জনজাতি ও এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যবধান হ্রাস করে তাদের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি ইত্যাদি ।

error: Content is protected !!