জোট নিরপেক্ষতা কাকে বলে 

জোট নিরপেক্ষতা কাকে বলে 

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জোট নিরপেক্ষতা বা নির্জেটি আন্দোলন একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে দুই মহাশক্তিধর রাষ্ট্র , যথাক্রমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ও সামরিক জোটের বাইরে তৃতীয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলির নেতৃত্বে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সূচনা হয় । 

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন প্রধানত ‘ ঠান্ডা লড়াই ’ এর দুনিয়ায় বৃহৎ কোনো শক্তিজোটে যোগ না দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী । বিভিন্ন দেশের সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ বিরোধী জাতীয় মুক্তি যুদ্ধের সপক্ষে বিশ্বব্যাপী এক প্রগতিশীল পদক্ষেপ হল এই আন্দোলন । 

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রধান প্রবক্তারা হলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু , যুগোশ্লাভিয়ার রাষ্ট্রপতি টিটো , ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি সুকর্ণ , মিশরের রাষ্ট্রপতি নাসের এবং ঘানার প্রধানমন্ত্রী নক্রুমা । ১৯৬১ সালে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রথম সূচনা হয় বেলগ্রেড শীর্ষসম্মেলনে । এই সম্মেলনে ২৫ টি রাষ্ট্র যোগ দেয় । 

জোট নিরপেক্ষতা বলতে কোনো নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা সমস্ত জোট থেকে সমদূরত্ব বজায় রেখে চলার নীতি বোঝায় না । জোট নিরপেক্ষতা হল একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি । জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী স্বাধীন নীতির অনুসরণই হল জোট নিরপেক্ষতার মূল কথা । 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ বার্টন তাঁর International Relations গ্রন্থে জোট নিরপেক্ষ নীতির উদ্ভবের নেপথ্যে যেসব বিষয়ের উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাতীয়তাবাদী চেতনা , ঔপনিবেশিকতাবাদদের বিরোধিতা , অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা প্রভৃতি । 

জোট নিরপেক্ষতার সংজ্ঞা নির্দেশ করতে গিয়ে বার্টন বলেছেন , জোট নিরপেক্ষতা বলতে সেইসব দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে বোঝায় যারা কমিউনিস্ট জোট বা পুঁজিবাদী জোট , পাশ্চাত্যের কোনো জোটে যোগদান করা থেকে বিরত থেকেছে ।

সাধারণভাবে জোট নিরপেক্ষতার নীতি কোনো বৃহৎ শক্তির সামরিক জোটে যোগদানের বিরোধী । অবশ্য জোট নিরপেক্ষতা বলতে কঠোর নিরপেক্ষতা বোঝায় না । আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞদের মতে জোটনিরপেক্ষতা হল গতিশীল নিরপেক্ষতা ।

উৎস

১৯৫৪ সালের এপ্রিলে চিন-ভারত সম্পর্ক নির্ধারণে ‘ পঞ্চশীল ‘ নামে যে পাঁচটি নীতি গৃহীত হয় তা ছিল জোট নিরপেক্ষতার মূল উৎস । এই নীতিগুলি হল— 

( 1 ) শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান , 

( 2 ) ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ; 

( 3 ) অনাক্রমণ ; 

( 4 ) অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা , 

( 5 ) সমতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা ।

জোট নিরপেক্ষতা মূল নীতি

১৯৫৫ সালে বান্দুং সম্মেলনে জোট নিরপেক্ষতার মূল নীতিগুলি ঘোষিত হয় । ওই সম্মেলনে গৃহীত জোট নিরপেক্ষতার নীতিগুলি হল— 

( 1 ) সব জাতির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি মর্যাদাজ্ঞাপন , 

( 2 ) সমস্ত বর্ণ ও জাতির সমানাধিকারের স্বীকৃতি ; 

( 3 ) অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত হওয়া ; 

( 4 ) সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদ অনুযায়ী প্রতিটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন , 

( 5 ) মৌলিক মানবিক অধিকার এবং জাতিপুঞ্জের উদ্দেশ্য ও নীতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ; 

( 6 ) কোনো বৃহৎ শক্তির প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত স্বার্থরক্ষা থেকে বিরত হওয়া ; 

( 7 ) অন্য কোনো দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করা থেকে বিরত হওয়া ; 

 ( 8 ) কোনো দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা অথবা রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতি বলপ্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন মূলক কার্যকলাপ থেকে বিরত হওয়া ;  

( 9 ) শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলাপ আলোচনা , আপস , সালিশি ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে যাবতীয় বিরোধের মীমাংসা করা ; 

( 10 ) আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও ন্যায় নীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন ; 

( 11 ) পারস্পরিক স্বার্থ ও সহযোগিতা বজায় রাখা । 

অন্যান্য নীতি

১৯৬১ সালের জুন মাসে কায়রো সম্মেলনে জোটনিরপেক্ষ দেশগুলি বিশ্ব শান্তি , আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ হয় । বেলগ্রেডে জোটনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলির প্রথম শীর্ষসম্মেলনে ( ১৯৬১ সালের সেপ্টেম্বর ) ‘ ঠান্ডা লড়াই ‘ ও সার্বিক আণবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বিশ্বকে রক্ষা করার জন্য কয়েকটি নীতি গৃহীত হয় । সেই নীতিগুলি হল— 

( 1 ) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে আরও শক্তিশালী করা ;  

( 2 ) পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ , আণবিক অস্ত্র পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ ; 

( 3 ) উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনীতির বিকাশ ;  

( 4 ) উপনিবেশবাদ , নয়া উপনিবেশবাদ , জাতি বিদ্বেষ ও বর্ণ বৈষম্যের বিরোধিতা ইত্যাদি । 

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য

জোট নিরপেক্ষতার নীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে ঔপনিবেশিকতা , নয়া ঔপনিবেশিকতা এবং বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে এক স্বাধীন নীতি অনুসারে ঐক্যবদ্ধ করেছিল । তাই ১৯৫৫ সালে বান্দুং সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে যে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল তার গতি আজও অব্যাহত । বর্তমানে বিশ্বের শতাধিক দেশ জোট নিরপেক্ষতার আওতায় এসেছে । সুতরাং এর কার্যকারিতা সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই । জোট নিরপেক্ষ নীতির পাঁচটি বৈশিষ্ট্য হল— 

1. জোট নিরপেক্ষতা যেমন নিঃসঙ্গবাদ নয় , তেমনি নিরপেক্ষতাবাদও নয় । জোট নিরপেক্ষতা বলতে শুধুমাত্র দুটি শক্তিজোটের বাইরে থাকাকে বোঝায় না । জোট নিরপেক্ষতা হল সাম্রাজ্যবাদ , উপনিবেশবাদ ও নয়া-উপনিবেশবাদের বিরোধী এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান । 

2. জোট নিরপেক্ষতা বিদেশনীতির একটি কৌশলমাত্র । জোট নিরপেক্ষতার মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শক্তিজোটের বাইরে তাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে এবং প্রগতিশীল বিদেশনীতি রূপায়িত করে । 

3.  জোট নিরপেক্ষতা শান্তিপূর্ণ আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বের উত্তেজনা পূর্ণ পরিস্থিতি নিরসনের পক্ষপাতী । জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিবাদ-বিসংবাদ , যুদ্ধ বা যুদ্ধ সংক্রান্ত ভীতি প্রদর্শন , অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ প্রভৃতিকে উৎসাহ দেয় না । 

4. জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন মনে করে প্রতিটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্ব আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি স্বীকৃত উপাদান । 

5. জোটনিরপেক্ষতার মধ্যে আছে একটি সহযোগিতার বাতাবরণ । জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে শান্তি ও নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করে একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সমাজ গড়ে তুলতে চায় । 

জোট নিরপেক্ষতার প্রকৃতি 

জোট নিরপেক্ষতার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে যে বিষয়গুলি স্পষ্ট হয় সেগুলি হল—

1. জোট নিরপেক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক আইনে উল্লিখিত নিরপেক্ষতার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে । আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কোনো নিরপেক্ষ রাষ্ট্র যুদ্ধের সময় কোনো বিবাদমান রাষ্ট্রকে নিজের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে যেমন দিতে পারে না , তেমনি কোনো আর্থিক বা সামরিক সাহায্যও দিতে পারে না । জোটনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইনের এই বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হয় না । 

2. জোট নিরপেক্ষতা বলতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে নিস্পৃহতা বা নির্লিপ্ততাকে বোঝায় না । আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা , বিবাদ ও বিসংবাদে জোট নিরপেক্ষ দেশগুলি নিজেদের অবস্থান স্বাধীনভাবে জানাতে পারে । এই অবস্থান কোনো পক্ষকে সন্তুষ্ট করার জন্য বা কারও দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার জন্য নয় ।

3. জোট নিরপেক্ষতা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যুদ্ধকে বর্জন করতে চায় । এই কারণে জোট নিরপেক্ষতা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন , সামরিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও আণবিক অস্ত্র উৎপাদনের তীব্র বিরোধিতা করে । 

4. জোট নিরপেক্ষতা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমস্ত রকম আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধী ।

5. জোট নিরপেক্ষতার অর্থ নিঃসঙ্গতা ( isolation ) নয় । জোট নিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলি নিজেদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংযোগ রক্ষা করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জোট নিরপেক্ষতার আদর্শকে রূপায়িত করতে চায় । 

6. জোট নিরপেক্ষতা কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের পক্ষপাতিত্ব করে না । বাস্তবে জোট নিরপেক্ষতাকে রাজনৈতিক মতাদর্শ নিরপেক্ষ আন্দোলনরূপে অভিহিত করা হয় । উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক দেশগুলির পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক দেশও এই আন্দোলনে শামিল হয়েছে । 

7. আন্তর্জাতিক সম্পর্কের লেখকদের মতে পৃথিবীতে দারিদ্র্য , অশিক্ষা , অনগ্রসরতা ও শ্রেণি বৈষম্য থাকার ফলে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় । এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আর্থিক ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় জোট নিরপেক্ষতা হল অন্যতম হাতিয়ার । 

8. জোট নিরপেক্ষতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী । জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমিকতার প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন , অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার নীতি প্রভৃতি কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে । 

9. আণবিক মারণাস্ত্রের সম্প্রসারণ রোধ ও সার্বিক নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্য পূরণের জন্যে জোট নিরপেক্ষতা আন্দোলনের বিভিন্ন সম্মেলনে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে । এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ থেকে বিশ্বকে মুক্ত রাখার আহ্বানও জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সাম্প্রতিক সম্মেলনে জানানো হয়েছে । 

উপসংহার 

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে ঠান্ডা লড়াই মুক্ত একমেরু বিশ্বে ( Uni polar world ) জোট নিরপেক্ষতার প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটেছে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সমাজতন্ত্রী ও ধনতন্ত্রী এই দুই পরস্পর বিরোধী জোটের বিকল্প হিসেবে যে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তা আজ ইতিহাসে স্থান পেয়েছে । জোট নিরপেক্ষতার রাজনৈতিক গুরুত্বের অবসান হয়েছে । 

বর্তমানে জোট নিরপেক্ষতার প্রকৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটছে এ কথা বলা যায় । অবশ্য জোট নিরপেক্ষতার প্রাসঙ্গিকতা এখনও হারায়নি বলে অনেকে মনে করেন । একবিংশ শতাব্দীর একমের বিশ্বে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বে বৈষম্যের অবসানে , সন্ত্রাসবাদ ও রাষ্ট্রীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জোট নিরপেক্ষ নীতি বিশ্বশান্তি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এক উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করতে পারে ।

error: Content is protected !!