জোট রাজনীতির বৈশিষ্ট্য

জোট রাজনীতির বৈশিষ্ট্য

ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রতিক প্রবণতার একটি প্রধান দিক হল দলীয় জোট ব্যবস্থা । সাধারণ নির্বাচনে লোকসভায় কোনো দলের পক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব না । হওয়ায় কেন্দ্রে জোট রাজনীতির চল শুরু হয় । আবার , রাজ্যগুলিতে বিধানসভার নির্বাচনেও এই প্রবণতার সূত্রপাত ঘটে । 

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত , জোট রাজনীতির বিষয়টি ভারতের দল ব্যবস্থায় বর্তমানে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে । ভারতের কেন্দ্র রাজনীতিতে দলীয় জোট ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে ১৯৭৭ সালে ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচনে । এর আগেই রাজ্যগুলিতে ১৯৬৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে কোয়ালিশন বা জোট রাজনীতির সূচনা হয় । 

১৯৬৭ সালে কেরালা , বিহার , তড়িশা , উত্তরপ্রদেশ , মধ্যপ্রদেশ , হরিয়ানা , পাঞ্জাব এবং পশ্চিমবঙ্গ এই ৮ টি রাজ্যে অ-কংগ্রেসি জোট সরকার গড়ে ওঠে । 

ভারতের রাজনীতিতে দলীয় জোট ব্যবস্থার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে । সেগুলি হল一

বহুদলীয় প্রাধান্য

ভারতের রাজনীতিতে দলীয় জোটব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল বহুদলীয় প্রাধান্যের প্রতিষ্ঠা । স্বাধীনতার পর থেকে বহুদিন যাবৎ ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কংগ্রেস দলের একক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত ছিল । মরিস জোন্স ও অধ্যাপক অ্যালান বল প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী একে ‘ কর্তৃত যুক্ত একদল প্রধান রাজনৈতিক ব্যবস্থা ‘ ( Dominant party system ) বলে আখ্যা দিয়েছিলেন । 

ভারতের রাজনীতিতে দলীয় জোট ব্যবস্থা একদলীয় প্রাধান্য যুক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবসান ঘটায় এবং ভারতীয় রাজনীতিতে বহুদলীয় প্রাধান্যকে প্রতিষ্ঠা করে । 

আঞ্চলিক দলগুলির প্রাধান্য 

বর্তমান ভারতের রাজনীতিতে দলীয় জোট ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল আঞ্চলিক দলগুলির প্রাধান্য । ১৯৮৯ সালের পর থেকে পাকাপাকিভাবে জোট রাজনীতির চল শুরু হওয়ার পর ভারতীয় রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে । 

ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র একটি বহুত্ববাচক দেশ । এখানে অঞ্চলভেদে ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতির ভিন্নতা চোখে পড়ে সহজে । আঞ্চলিক জনমানসের প্রতিনিধি হিসেবেই উঠে আসে বিভিন্ন আধুলিক রাজনৈতিক দল । এই আঞ্চলিক দলগুলির ক্রমবর্ধমান প্রভাব যে রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করে তাকে স্বীকার ক’রে নিয়ে জাতীয় দলগুলি জোট গঠনে বাধ্য হয় । 

একক বৃহত্তম দলের নেতৃত্ব 

দলীয় জোটব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য হল জোটের মধ্যে একক বৃহত্তম দলের নেতৃত্ব । জোটের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ছোটো বা মাঝারি দলের অস্তিত্ব থাকলেও নেতৃত্ব থাকে একক বৃহত্তম দলের হাতে । দৃষ্টান্ত স্বরূপ , কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চা ( UPA ) বা বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চার ( NDA ) কথা উল্লেখ করা যায় । 

অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি 

বর্তমান ভারতের রাজনীতিতে দলীয় জোট ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির অস্তিত্ব । বলাবাহুল্য যে , সাধারণ নির্বাচনের সময় এই অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচিকে সামনে রেখেই জোট ভুক্ত দলগুলি ঐক্যবদ্ধ হয় । পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে জোটের অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি অনুসারে সরকারের কাজকর্ম পরিচালিত হয় । 

আপসমূলক দৃষ্টিভঙ্গি 

জোট ব্যবস্থার একটি তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল আপসমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য । জোট ব্যবস্থায় শরিক দলগুলির দাবিদাওয়ার দিকে দৃষ্টি রেখে জোট রাজনীতি চালিত হয় । জোট সরকারের নেতা হিসেবে কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী বা রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে কখনোই নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না ।

error: Content is protected !!