ভারতীয় দল ব্যবস্থার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য 

ভারতীয় দল ব্যবস্থার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য 

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অঙ্গ হল দল ব্যবস্থা । ভারতের উদার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাও এক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রম নয় । এদেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রয়োজনে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল ব্যবস্থার স্বতন্ত্র মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে । সেগুলি হল 一

সাংবিধানিক স্বীকৃতি

ভারতের সংবিধানে রাজনৈতিক দল ব্যবস্থার কোনো উল্লেখ ছিল না । সংসদীয় শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে দল ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল । ১৯৮৫ সালে ৫২ তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ভারতের দলব্যবস্থা সর্বপ্রথম সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করে । 

ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল ব্যবস্থা 

ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলের উদ্ভব ও বিকাশ ভারতের দলীয় ব্যবস্থার আর একটি বৈশিষ্ট্য । বিশিষ্ট কোনো নেতা বা নেত্রীকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ দল পরিচালিত হয় । এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নেতা বা নেত্রীর ভাবমূর্তির ওপর দল নির্ভরশীল হয়ে পড়ে । 

জাতীয় কংগ্রেসে নেহরু , ইন্দিরা গান্ধি ও রাজীব গান্ধির নেতৃত্ব , সমাজতন্ত্রী দলে জয়প্রকাশ নারায়ণ ও রামমনোহর লোহিয়ার নেতৃত্ব , লোকদলে চরণ সিংয়ের নেতৃত্ব , এ.ডি.এম.কে দলে রামচন্দ্রনের নেতৃত্ব , তেলুগু দেশমে এন.টি.রামারাওয়ের নেতৃত্ব এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ । 

আঞ্চলিক দলের গুরুত্ব

ভারতে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলিকেও সক্রিয় অবস্থায় দেখা যায় । বিভিন্ন রাজ্যে আঞ্চলিক দলের প্রভাব লক্ষ করার মতো । উদাহরণ হিসেবে তামিলনাড়ুতে ডি.এম.কে. , এ.আই.এ.ডি. এম. কে. , অন্ধ্রপ্রদেশে তেলুগু দেশম , মণিপুরে মণিপুর পিপল্স পার্টি , জম্মু কাশ্মীরে ন্যাশনাল কনফারেন্স , পাঞ্জাবে অকালি দল , ঝাড়খন্ডে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা , অসমে অসম গণপরিষদ প্রভৃতির কথা বলা যায় । 

প্রসঙ্গত বলা যায় , কেন্দ্রে জোট সরকার গঠনে আঞ্চলিক দলগুলির ভূমিকা সাম্প্রতিককালে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে । 

ধর্ম ভিত্তিক দলের অস্তিত্ব 

ভারতে ধর্মের ওপর ভিত্তি করেও কিছু রাজনৈতিক দল গড়ে উঠেছে । এই ধরনের দলগুলি নিজেদের ধর্মীয় সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করে প্রাধান্য বজায় রাখতে পেরেছে । যেমন — মুসলিম লিগ , হিন্দু মহাসভা , রামরাজ্য পরিষদ , অকালি দল , শিবসেনা প্রভৃতি ।

ভাষা ভিত্তিক দলের অস্তিত্ব 

ভাষা ভিত্তিক কিছু রাজনৈতিক দলও এদেশে রয়েছে । এই ধরনের রাজনৈতিক দল নিজেদের আঞ্চলিক ভাষাভাষী গোষ্ঠীর ওপর মুখ্যত নির্ভরশীল । উদাহরণ স্বরূপ তামিলনাড়ুর ডি. এম. কে এবং এ. ডি. এম.কে. পশ্চিমবাংলার গোর্খা লিগ , বিহারের ঝাড়খণ্ড পার্টি , অন্ধ্রের তেলেঙ্গানা প্রজা সমিতি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য । 

নীতি , আদর্শ ও কর্মসূচিগত পার্থক্য 

ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন দলের মধ্যে নীতি আদর্শ ও কর্মসূচিপত মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান । ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যতাবাদ , গান্ধিবাদ , মার্কসবাদ , জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ ও নীতি রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে লক্ষ করা যায় । 

এমনকি আঞ্চলিক ও উপজাতি স্বার্থের প্রতি আনুগত্য , গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়গত মানসিকতা ইত্যাদিও কোনো কোনো দলের আদর্শ হিসেবে কাজ করে । এ ছাড়া ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির কর্মসূচির মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায় । 

মোৰ্চা বা জোট গঠনের প্রয়াস 

ভারতের দল ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্যরূপে সাম্প্রতিককালে মোর্চা বা জোট গঠনের প্রয়াস লক্ষ করা যায় । রাজ্যগুলিতে সরকার গঠনে এবং কেন্দ্রের সরকার গঠনেও এই প্রয়াস দেখা যায় । 

কেন্দ্রে ১৯৭৭ সালে জনতা সরকার , ১৯৯৬ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকার , ১৯৯৮ সালে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার , ১৯৯৯ সালে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট ( N.D.A. ) সরকার এবং বর্তমানের সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট ( U.P.A. ) সরকার এর প্রাসঙ্গিক উদাহরণরূপে উল্লেখ্য । 

নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি 

ভারতীয় দল ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল জাতীয় ও রাজ্যদলের পাশাপাশি বহুসংখ্যক স্বীকৃত ও নথিভুক্ত স্বীকৃতিহীন দলের উপস্থিতি । 

২০১০ সালের নির্বাচনী পরিসংখ্যান অনুসারে ভারতের নির্বাচন কমিশন কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জাতীয় দলের সংখ্যা ছিল ৬ টি [ কংগ্রেস , বিজেপি ,  সি. পি. আই. , সি. পি. আই. ( এম. ) , ন্যাশনালিষ্ট কংগ্রেস পার্টি এবং বহুজন সমাজ পার্টি এবং রাজ্যদলের সংখ্যা ছিল ৫২ , এ ছাড়া নথিভুক্ত স্বীকৃতিহীন দলের সংখ্যা ছিল ১১১২ । 

গণ সংগঠনের গুরুত্ব 

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে গণসংগঠনের ঘনিষ্ঠ সংযোগ ভারতীয় দল ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য । প্রতিটি জাতীয় ও আঞ্চলিক দলের সঙ্গে শ্রমিক , কৃষক , ছাত্র , যুব ও মহিলা সংগঠন যুক্ত রয়েছে । উদাহরণ স্বরূপ কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠন INTUC ; সি পি আইয়ের AITUC এবং সি. পি. আই ( এম ) -এর CITU- এর কথা বলা যায় । 

error: Content is protected !!