সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার প্রয়োগের সাফল্য ও সমস্যা

সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার প্রয়োগের সাফল্য ও সমস্যা

ভারতে সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের সাফল্য 

ভারতে সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের সার্থক রূপায়ণের পথে বহু অন্তরায় থাকা সত্ত্বেও এর সাফল্যের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ । ভারতে সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের সাফল্যের উল্লেখযোগ্য দিকগুলি হল—

রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ : 

ভারতে সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার নাগরিকদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ এনে দিয়েছে । এর ফলে ১৮ বছর এবং তার ঊর্ধ্বে সমস্ত ভারতীয় নাগরিক দেশের শাসন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ লাভ করেন ।

গণসার্বভৌমত্বের বাস্তব রূপায়ন : 

ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারীরূপে জনগণের কথা তুলে ধরে গণসার্বভৌমত্বের নীতি ঘোষিত হয়েছে । ভারতে সার্বভৌম শক্তির আধার হল জনগণ । সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের স্বীকৃতির ফলে গণসার্বভৌমত্বের এই নীতির বাস্তব রূপায়ণ ঘটেছে । 

নির্বাচনে অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি : 

ভারতীয় জনগণের মধ্যে দারিদ্র , নিরক্ষরতা ও অজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ভোটদানের হার উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলির তুলনায় যথেষ্ট সন্তোষজনক । সমীক্ষা অনুযায়ী , ১৯৬৭ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত লোকসভার নির্বাচনে ভোটদানের গড় হার ছিল ৫৭ শতাংশ । পরবর্তীকালে ১৯৮৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত লোকসভার নির্বাচনগুলিতে ভোটদানের গড় হার ছিল ৫৩.১ শতাংশ । রাজ্য বিধানসভাগুলির নির্বাচনেও জনগণের ভোটদানের গড় হার অত্যন্ত ইতিবাচক । 

সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ্য , ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনে ৮৩ শতাংশের বেশি ভোটদাতা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন । 

রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি : 

ভারতে নাগরিকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের সার্থক রূপায়ণের ইঙ্গিত দেয় । ১৯৭৫ সালে জারি করা জরুরি অবস্থার ফলাফল বিচার বিবেচনা করে ভারতীয় জনগণ ১৯৭৭ সালে লোকসভার সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় দেন । অনুরূপভাবে ১৯৮০ সালের সাধারণ নির্বাচনে জনতা দলের অন্তর্কলহের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে ভোটদাতারা আবার কংগ্রেস দলকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনেন । 

বর্তমানে ভারতীয় নাগরিকরা সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারকে সরকার পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় ক্রমশ দক্ষ হয়ে উঠছেন । ফলে সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বুলেটের পরিবর্তে ব্যালটই গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে । দৃষ্টান্ত স্বরূপ ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত তামিলনাড়ু , কেরল ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনের কথা উল্লেখ করা যায় । 

সামাজিক তাৎপর্য : 

ভোটাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার লাভ করার পর বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অনগ্রসর শ্রেণির মানুষজন নিজেদের সামাজিক ও অন্যান্য অধিকার সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতনতা অর্জন করেছেন ।

গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা : 

ভারতে সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে । বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের অধিবাসী হিসেবে ভারতবর্ষের নাগরিকরা সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে চলেছেন । 

সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার প্রয়োগের সমস্যা

ভারতে সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের সাফল্যের পথে বেশ কিছু অন্তরায় রয়েছে । যেসব কারণে ভারতে সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার সম্পূর্ণ ফলপ্রসু হয়নি সেই কারণগুলি হল— 

শিক্ষার অভাব :

সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী সমগ্র ভারতে সাক্ষরতার হার মাত্র শতকরা ৭৪ ভাগ ( ২০১১ সালের গণনা অনুসারে ) । এ থেকে প্রমাণ হয় যে , এখনও প্রায় শতকরা ২৬ ভাগ মানুষ নিরক্ষর । সমালোচকদের মতে , প্রকৃত শিক্ষা ও রাজনৈতিক চেতনার অভাবে ভোটদাতাদের এক বিরাট অংশ নির্বাচনের সময় যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করতে পারে না । এর ফলে সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার নীতির প্রকৃত উদে ব্যর্থ হয় , গণতন্ত্র তার উৎসমূলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় ।

আর্থিক প্রলোভন : 

ভারতে এক বিশাল জনসমষ্টি এখনও দারিদ্র্য সীমারেখার নীচে বসবাস করে । এদের মধ্যে আর্থিক অনিশ্চয়তা অত্যন্ত প্রকট । বলা বাহুল্য যে , নির্বাচনের সময় এরা সহজেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিত্তবান প্রার্থীদের আর্থিক প্রলোভনের শিকার হয় । এর ফলে একদিকে যেমন অসৎ ও অযোগ্য প্রার্থীরা অর্থের বিনিময়ে নির্বাচনে জয়লাভ করতে সমর্থ হয় , অন্যদিকে তেমনি সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের নীতির পরাজয় ঘটে ।

জাতপাত ও সম্প্রদায় ভিত্তিক মনোভাব : 

নির্বাচনের সময় জাতপাত , ধর্ম , ভাষা ও সম্প্রদায় ভিত্তিক অন্য আনুগত্যের ভিত্তিতে ভোটদাতাদের একটি বৃহৎ অংশ এখনও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে থাকেন । অনেক সময় ভোটদানের ক্ষেত্রে সংকীর্ণ আঞ্চলিক মনোভাবও প্রাধান্য লাভ করে । এর ফলে সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের মতো প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক নীতির অপপ্রয়োগ ঘটে । 

অন্ধ আবেগের প্রাধান্য সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার নীতির সাফল্য ভোটদাতাদের যুক্তিনিষ্ঠ ও বিচক্ষণ মনোভাবের ওপর নির্ভরশীল । কিন্তু ভারতে ভোটদাতাদের একটি বৃহৎ অংশ নির্বাচনের সময় প্রায়শ অন্ধ আবেগের বশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে থাকেন । এ ধরনের বহু দৃষ্টান্ত অতীতে দেখা গেছে । প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮৪ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে রাজীব গান্ধির নেতৃত্বে কংগ্রেস দলের বিপুল জয়ের কথা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য । 

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন : 

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারকে অনেকাংশে প্রহসনে পরিণত করেছে । বহু কুখ্যাত অপরাধী , এমনকি দাগি আসামিও সন্ত্রাস ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নির্বাচনে জয়লাভ করে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভার সদস্যপদ দখল করে । ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের এ এক কলঙ্কিত দিক । 

প্রার্থীর জৌলুসের প্রতি গুরুত্বদান : 

ভারতের নির্বাচনি রাজনীতিতে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জৌলুস ( Glamour ) ও ভোটদাতাদের প্রবলভাবে আকর্ষণ করে থাকে । রুপোলি পর্দার নায়ক নায়িকারা এইভাবেই নির্বাচনে জয়লাভ করতে সক্ষম হন । এই ধরনের নির্বাচনকে অনেকে জনমতের যথার্থ প্রতিফলন বলে মেনে নিতে চাননি । সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের সাফল্যের পথে এটিও একটি অন্তরায় । 

এ ছাড়া অন্যের অনুকরণে বা নির্দেশে অযোগ্য প্রার্থীকে ভোটদান , স্বজনপ্রীতি , নির্বাচনি দুর্নীতি ও কারচুপি , বিত্তবান ও এলিট শ্রেণির প্রাধান্য , মিথ্যা প্রচার ইত্যাদি কারণকেও সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের সাফল্যের পথে অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা যায় ।

error: Content is protected !!