সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার দোষ গুণ বা সুবিধা অসুবিধা

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার দোষ গুণ বা সুবিধা অসুবিধা

সংসদীয় সরকারের গুণ বা সুবিধা 

সংসদীয় সরকারের উল্লেখযোগ্য সুবিধা ও গুণাবলি হল— 

আইন ও শাসন বিভাগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক : 

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় আইনসভার নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল সরকার গঠন করে । এজন্য শাসনবিভাগ ও আইনবিভাগের মধ্যে একটা সুসংহত ঐক্য বজায় থাকে । ফলে সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সুষ্ঠু পরিবেশ রচিত হয় । শাসনবিভাগ এবং আইনবিভাগের মধ্যে কোনো বিরোধ না থাকায় সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার আশঙ্কা দেখা যায় না । গার্নারের ভাষায় , একমাত্র সংসদীয় শাসনব্যবস্থাতেই আইনবিভাগ ও শাসনবিভাগের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ভিত্তিতে সরকারি কাজকর্ম পরিচালিত হয় । 

গণতন্ত্র সম্মত :

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত মন্ত্রীপরিষদ হল দেশের শাসনবিভাগের প্রকৃত কর্ণধার । মন্ত্রীপরিষদ তার যাবতীয় কাজকর্মের জন্য আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকে । এই কারণে মন্ত্রীপরিষদের স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার কোনো সুযোগ থাকে না । 

মন্ত্রীপরিষদ জনস্বার্থ বিরোধী কোনো পদক্ষেপ নিলে আইনসভায় বিরোধী পক্ষের সদস্যরা তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারে । প্রয়োজন হলে অনাস্থা প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে মন্ত্রীপরিষদকে পদচ্যুত করার ক্ষমতাও আইনসভার রয়েছে । এই কারণে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের তুলনায় সংসদীয় সরকারকে অধিকতর গণতন্ত্রসম্মত বলে মনে করা হয় । 

নমনীয়তা : 

সংসদীয় শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান গুণ হল , এটি এমন একটি নমনীয় শাসনব্যবস্থা যেখানে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি রেখে প্রশাসন বা সরকারের প্রয়োজনমাফিক রদবদলের ব্যবস্থা রয়েছে । সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় সরকার পরিবর্তন অনেক বেশি সহজসাধ্য । যেমন — দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংল্যান্ডে , চেম্বারলেনের পরিবর্তে চার্চিলের নেতৃত্বে war cabinet গঠন করা হয়েছিল । 

রাজনৈতিক শিক্ষা বিস্তার : 

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় সরকারি নীতি , সরকারি কার্যক্রম এবং মুলতবি প্রস্তাব ও দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাবের মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে আইনসভায় যেসব আলোচনা হয় তা গণমাধ্যম মারফত প্রচারিত হওয়ায় জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক শিক্ষার বিস্তার ঘটে । 

আন্তর্জাতিক সুনাম : 

সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানের পদে স্থানীযুণী ব্যক্তিতে নিয়োগ করা সম্ভব হয় । এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাষ্ট্রের সুনাম বৃদ্ধি পায় । উদাহরণ হিসেবে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ কিংবা প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রথিতযশা বিজ্ঞানী এ. পি. জে. আবদুল কালামের নিয়োগের কথা বলা যায় । 

প্রশাসনিক স্বচ্ছতা :

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার সরকারের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত আইনসভাকে না জানিয়ে গ্রহণ করা সম্ভব নয় । যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আইনসভায় সবিস্তারে আলোচিত হওয়ার পর বাস্তবে রূপায়িত হয় । এর ফলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় থাকে বলে অনেকে মনে করেন । 

বিরোধী দলের মর্যাদা : 

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার একটি প্রধান গুণ হল এই ধরনের শাসন ব্যবস্থায় বিরোধী পক্ষের মর্যাদা ও গুরুত্ব স্বীকৃত । আইনসভায় বিরোধী দলনেতা এখানে স্বতন্ত্র মর্যাদা ও সম্মানে ভূষিত হন । তা ছাড়া আইনসভার অধিবেশনে সরকারের যাবতীয় নীতি ও কর্মসূচির ত্রুটিবিচ্যুতি তুলে ধরে অবাধ সমালোচনা করার অধিকার বিরোধী পক্ষের থাকে । এর ফলে সংসদীয় গণতন্ত্র অধিকতর জনমুখী ও সাফল্য মণ্ডিত হয়ে ওঠে । 

সংসদীয় সরকারের দোষ বা অসুবিধা 

সংসদীয় সরকারও সম্পূর্ণ ত্রুটি মুক্ত নয় । এই ধরনের শাসন ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য ত্রুটিগুলি হল—

ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণের অনুপস্থিতি :

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় সমালোচনায় প্রথমেই বলা যায় , এখানে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ না থাকায় মন্ত্রীপরিষদের সদস্যরা একই সঙ্গে আইনবিভাগ ও শাসন বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করায় সুষ্ঠুভাবে প্রশাসন পরিচালনার জন্য তাঁরা যথোপযুক্ত সময় পান না । ফলে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় সুশাসনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় । 

স্থিতিশীলতার অন্তরায় :

সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তনশীলতা বা নমনীয়তা একটি দুর্বলতা । স্থিতিশীল ও সুদৃঢ় সরকার প্রতিষ্ঠা এক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে । 

আমলাতান্ত্রিকতা :

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় সরকার পরিচালনার জন্য যে অভিজ্ঞতা ও বিশেষীকৃত দক্ষতার প্রয়োজন অধিকাংশ মন্ত্রীদের তা থাকে না । এর ফলে মন্ত্রীদের আমলা নির্ভর হতে হয় । আর এই কারণে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পর্যবসিত হয় । 

দলীয় সংকীর্ণতা :

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গ হল রাজনৈতিক দল ব্যবস্থা । সংকীর্ণ দলাদলি , দলীয় স্বার্থ সাধন , রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের প্রতিযোগিতা , নির্বাচনি দুর্নীতি প্রভৃতি সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার দক্ষতাকে খর্ব করে । লর্ড ব্রাইস সংসদীয় সরকারের প্রধান ত্রুটি হিসেবে সংকীর্ণ দলীয় মনোভাব এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার কথা বলেছেন । 

বহুদলীয় ব্যবস্থার কুফল :

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় বহু রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বের জন্য অনেক সময়ে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব হয় না । ফলে একাধিক দলের সমন্বয়ে জোট সরকার গঠিত হয় । কিন্তু শরিক দলগুলির অন্তর্বিরোধে মন্ত্রীপরিষদ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তা স্বভাবতই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না । উদাহরণ স্বরূপ সাম্প্রতিক কালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দলের জোট শরিকদের কথা উল্লেখ করা যায় । 

নয়া স্বৈরাচারের উদ্ভব :

সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের ওপর মন্ত্রীপরিষদের নিয়ন্ত্রণ ব্যাপকভাবে বিস্তারিত হয় । এইভাবে মন্ত্রীসভা সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে । তা ছাড়া জাতীয় সংকট ও জরুরি অবস্থার সময় মন্ত্রীসভা প্রভৃত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে পড়ে । এইসব কারণে অনেকে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থাকে নয়া স্বৈরাচার বা New Despotism বলে অভিহিত করেন । 

অযোগ্যদের প্রাধান্য :

সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় যেসব প্রতিনিধি আইনসভায় সদস্যপদ লাভ করেন তাঁরা গুণগত যোগ্যতার নিরিখে নির্বাচিত হন না । বহু অযোগ্য ব্যক্তি দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অবতীর্ণ হন । ফলে আইনসভার গুণগত মান হ্রাস পায় , শাসনব্যবস্থায় অযোগাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয় ।

জরুরি অবস্থার অনুপযোগী : 

সংসদীয় শাসনব্যবস্থাকে জরুরি অবস্থার অনুপযোগী বলে মনে করা হয় । বহিঃশত্রুর আক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের পরিস্থিতিতে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয় না । 

মতপার্থক্য :

সংসদীয় শাসনব্যবস্থার ত্রুটি হিসেবে নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রকৃত শাসকপ্রধানের মতবিরোধের কথা অনেকে বলে থাকেন । অনেক সময় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানের মতপার্থক্য লক্ষ করা যায় । এরূপ অবস্থায় শাসনব্যবস্থায় গভীর সংকট দেখা দেয় । 

উপসংহার 

ওপরে উল্লিখিত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ কথা বলা যায় যে , সব ধরনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে সংসদীয় শাসনব্যবস্থাই অধিকতর গ্রহণযোগ্য । সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হলে মন্ত্রীপরিষদ বা আমলাতন্ত্র কখনও স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে না ।

error: Content is protected !!