সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা কাকে বলে

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা কাকে বলে

যে শাসন ব্যবস্থায় শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান এবং শাসনবিভাগের স্থায়িত্ব আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থার ওপর নির্ভরশীল তাকে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা বলা হয় । 

আইনসভার কাছে দায়িত্বশীল থাকার জন্য একে আবার দায়িত্বশীল শাসন ব্যবস্থাও বলা হয় । সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় সরকারের যাবতীয় ক্ষমতা তত্ত্বগতভাবে একজন নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে ন্যস্ত থাকে । তিনি জাতির প্রতীক , শাসন বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা । তাঁর নামেই শাসনকাজ পরিচালিত হয় । 

কিন্তু বাস্তবে প্রকৃত শাসন ক্ষমতার অধিকারী হল প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রীপরিষদ । এই মন্ত্রীপরিষদই আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের নামে শাসনকাজ পরিচালনা করে । সংসদীয় শাসনব্যবস্থার দেশ হিসেবে গ্রেট ব্রিটেন , ভারত , জাপান প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য । 

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য

সংসদীয় বা মন্ত্রীপরিষদ চালিত সরকারের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে । সেগুলি হল  

নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানের অস্তিত্ব :

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় দেশের যাবতীয় শাসন ক্ষমতা তত্ত্বগতভাবে একজন নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে থাকলেও তিনি প্রকৃত শাসন ক্ষমতার অধিকারী নন । যাবতীয় শাসনকাজ তাঁর নামে পরিচালিত হয় বলে তাঁকে নিয়মতান্ত্রিক বা নাম সর্বস্ব রাষ্ট্রপ্রধান বলা হয় । সংসদীয় ব্যবস্থায় নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানকে রাষ্ট্রের প্রধান বলা যায় , কিন্তু সরকারের প্রধান বলা যায় না । সরকারের প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী । ভারতের রাষ্ট্রপতি ও ব্রিটেনের রাজা বা রানি হলেন সংসদীয় ব্যবস্থার নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানের উদাহরণ । 

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব :

সংসদীয় বা মন্ত্রীপরিষদ চালিত সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব । আইনসভার নির্বাচনে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সেই দলের নেতা বা নেত্রী প্রধানমন্ত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত হন । রাষ্ট্রের প্রকৃত শাসন ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে । প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করে থাকেন । বস্তুত , প্রধানমন্ত্রীর দক্ষতা ও যোগ্যতার ওপর সরকারের সাফল্য নির্ভরশীল , তিনিই এই প্রকার শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু । 

ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির অনুপস্থিতি :

ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির অনুপস্থিতি সংসদীয় ব্যবস্থার একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য । সরকারের তিনটি বিভাগ , যথাক্রমে আইন , শাসন ও বিচারবিভাগ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত হয়ে কাজ করে । যেমন আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা একদিকে আইন প্রণয়ন করেন , অন্যদিকে মন্ত্রীসভা গঠন করে সরকার পরিচালনা করেন । অবশ্য বিচারবিভাগের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা এখানে স্বীকৃত হয় ।

আইনসভার নিম্নকক্ষের প্রাধান্য : 

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় মন্ত্রীসভা গঠনে আইনসভার নিম্নকক্ষের প্রাধান্য লক্ষ করা যায় । নিম্নকক্ষে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সেই দলের নেতা বা নেত্রী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন , পরে তাঁর পরামর্শে মন্ত্রীসভার অন্য সদস্যরা নিযুক্ত হয়ে থাকেন । আইনসভার উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্ব মন্ত্রীসভায় যে থাকে না তা নয় , তবে নিম্নকক্ষের তুলনায় তা যৎসামান্য । অবশ্য কিছুক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও লক্ষ করা যায় । উদাহরণ স্বরূপ ভারতে চতুর্দশ লোকসভা নির্বাচনে ( ২০০৫ ) প্রধানমন্ত্রী পদে রাজ্যসভার সদস্য ড. মনমোহন সিংহের নিযুক্তির কথা উল্লেখযোগ্য । 

মন্ত্রীসভার যৌথ দায়িত্বশীলতা : 

সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীসভা বা সরকার আইনসভার নিম্নকক্ষের কাছে দায়বদ্ধ থাকে । ব্রিটেন ও ভারতে মন্ত্রীসভার অস্তিত্ব আইনসভার নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থার ওপর নির্ভরশীল । তা ছাড়া সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীসভার যৌথ দায়িত্বশীলতার নীতি অনুসারে সরকারি নীতি ও কাজকর্মের জন্য মন্ত্রীরা যৌথভাবে আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকেন । এই কারণে কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনসভায় অনাস্থা প্রস্তাব গৃহীত হলে সময় মন্ত্রীসভাকে পদত্যাগ করতে হয় ।

বিরোধী দলের গুরুত্ব :

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল আইনসভায় শক্তিশালী বিরোধী দলের অস্তিত্ব । আইনসভায় যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তারা সরকার গঠন করে , অন্যদিকে যারা গরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয় তারা বিরোধী দলের আসনে বসে । আইনসভায় বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনা সংসদীয় সরকারকে যুক্তি সংগত কাজে বাধ্য করে বলে অনেকে মনে করেন । 

মন্ত্রীসভার একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা : 

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার একটি সাম্প্রতিক বৈশিষ্ট্য হল মন্ত্রীসভার একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা । সরকারি নীতি ও কর্মসূচি নির্ধারণ , আইন প্রণয়ন ইত্যাদি ব্যাপারে শীর্ষস্থানীয় দলীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয় । দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মন্ত্রীসভার যাবতীয় সিদ্ধান্ত আইনসভায় অতি সহজেই অনুমোদিত হয় । আইনসভা এখানে মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত অনুমোদনকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করে মাত্র । ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার যথেষ্ট সম্ভাবনা থেকে যায় । 

আইন প্রণয়নের ক্ষমতা : 

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় আইন প্রণয়নে মন্ত্রীসভা একক ক্ষমতা ভোগ করে থাকে । আইনসভায় উত্থাপনের জন্য যাবতীয় সরকারি বিল মন্ত্রীসভার সদস্যরা নিজেরাই তৈরি করেন । আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যদের নিয়ে মন্ত্রীসভা গঠিত হয় বলে আইনসভায় পেশ করা মন্ত্রীদের বিল অনায়াসে অনুমোদন লাভ করে ।

error: Content is protected !!