এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য

এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য

ক্ষমতা বণ্টনের নীতির ভিত্তিতে সরকার বা শাসন ব্যবস্থাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয় । যে রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা পরিচালিত হয় তাকে এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা বলে । অন্যদিকে যে শাসন ব্যবস্থায় সংবিধান কর্তৃক বণ্টিত ক্ষমতার মাধ্যমে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার উভয়েই নিজ নিজ প্রশাসনিক এলাকায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম , তাকে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা বলা হয় । এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্যগুলি হলㅡ

সরকারের গঠনগত পার্থক্য 

এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থার শীর্ষে থাকে একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সরকার । কোনো কোনো ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সরকারের অস্তিত্ব থাকলেও তাদের তেমন কোনো স্বাস্থ্য থাকে না । কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও অঙ্গ রাজ্যগুলির জন্য দু-ধরনের সরকার থাকে । উভয় সরকারই নিজস্ব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে । 

ক্ষমতা বণ্টনগত পার্থক্য 

যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় লিখিত সংবিধানের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যগুলির মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন করা হয় । পররাষ্ট্র প্রতিরক্ষা , মুদ্রা ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়গুলি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকে এবং আঞ্চলিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি , যেমন কৃষি , স্বাস্থ্য , শিক্ষা ইত্যাদি রাজ্য সরকারের হাতে থাকে । কিন্তু এককেন্দ্রিক সরকারে এই ধরনের জাতীয় বা আঞ্চলিক সব ক্ষমতাই কেন্দ্রীভূত থাকে একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে । 

সংবিধানের প্রকৃতিগত পার্থক্য 

যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় সংবিধান লিখিত হয়ে থাকে এবং সংবিধানের প্রাধান্যকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় । সংবিধান বিরোধী কোনো আইন , আদেশ বা নির্দেশ কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলি প্রণয়ন করতে পারে না । এখানে সব ক্ষমতার উৎস হল সংবিধান । অন্যদিকে এককেন্দ্রিক সরকারে সংবিধানের প্রাধান্য স্বীকার করা হয় না । 

অনেকে মনে করেন , যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানের প্রাধান্য থাকে বলে কেন্দ্রীয় সরকার স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে না । এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় সংবিধানের প্রাধান্য স্বীকৃত না হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের স্বৈরাচারী হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ থাকে । 

বিচার বিভাগের ক্ষমতাগত পার্থক্য 

যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালতের অস্তিত্ব । সংবিধানের ব্যাখ্যাকর্তা ও অভিভাবক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । সংবিধান বিরোধী আদেশ , নির্দেশ বা আইন যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত বাতিল করতে পারে । অন্যদিকে এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিচার বিভাগ অত্যন্ত দুর্বল হয় । এই ধরনের শাসন ব্যবস্থায় সংবিধানের ব্যাখ্যাকর্তা ও রক্ষাকর্তা হিসেবে আদালতের কোনো গুরুত্বই থাকে না । 

নাগরিকত্ব জনিত পার্থক্য 

এককেন্দ্রিক প্রশাসনে কোনো দ্বৈত নাগরিকত্বের ব্যবস্থা থাকে না , একনাগরিকত্বের নীতি অনুসৃত হয় । জনগণের আনুগত্য শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি থাকে । কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারে দ্বৈত নাগরিকত্ব দেখা যায় , এখানে জনগণের আনুগত্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে বিভক্ত থাকে । উদাহরণ স্বরূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে । মার্কিন নাগরিকরা একই সঙ্গে কেন্দ্রে ও অঙ্গরাজ্যের নাগরিকত্ব পেয়ে থাকেন । 

সংবিধানের অস্তিত্ব 

যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যগুলির জন্য স্বতন্ত্র সংবিধানের অস্তিত্ব থাকে । কেন্দ্রের সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে রাজ্যগুলির সংবিধান রচিত হয় । এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে যেসব আঞ্চলিক সরকার থাকে তাদের কোনো স্বতন্ত্র সংবিধান থাকে না । আঞ্চলিক সরকারগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে । 

সংবিধান সংশোধন 

এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় সংবিধান লিখিত বা অলিখিত যাই হোক না কেন তা কিন্তু সুপরিবর্তনীয় । এই ধরনের সংবিধানকে সাধারণ আইন প্রণয়নের পদ্ধতিতে খুব সহজেই পরিবর্তন করা যায় । অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসব্যবস্থায় সংবিধান প্রকৃতিগতভাবে দুষ্পরিবর্তনীয় হয়ে থাকে । 

আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো 

এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় একটিমাত্র আইনসভা ও প্রশাসনিক কাঠামো থেকে সমগ্র দেশের জন্য একই আইন প্রণয়ন করা হয় । অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় আইনসভার পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যগুলির জন্য পৃথকভাবে আইনসভা থাকায় সমগ্র দেশে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরে দু-ধরনের আইন প্রণয়ন করা হয় । 9। 

সিদ্ধান্ত গ্রহণজনিত পার্থক্য 

এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় সর্বময় কর্তৃত্ব সম্পন্ন কেন্দ্রীয় সরকার যে কোনো বিষয়ে অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম । কিন্তু একাধিক স্বতন্ত্র সরকার বিশিষ্ট যুক্তরাষ্ট্রে তা সম্ভব নয় ।

জাতীয় সংস্কৃতি 

এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় সমগ্র দেশের জন্য একটিমাত্র জাতীয় সরকারের অস্তিত্ব থাকায় এখানে জাতীয় ঐক্যের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটে । কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির পৃথক সরকার থাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদ ও প্রাদেশিক মনোভাব মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে । 

উপসংহার 

বর্তমানে কেন্দ্র প্রবণতা বৃদ্ধির ফলে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মৌল কাঠামোর রূপান্তর ঘটছে । ফলে যুক্তরাষ্ট্রীয় ও এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার মধ্যেকার মৌলিক পার্থক্যের রূপরেখারও নতুন বিন্যাস ঘটেছে ।

error: Content is protected !!