এককেন্দ্রিক সরকার কাকে বলে

এককেন্দ্রিক সরকার কাকে বলে

শাসন ক্ষমতা বণ্টনের ভিত্তিতে সরকারকে এককেন্দ্রিক ( unitary ) এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় ( federal ) — এই দু-ভাগে বিভক্ত করা হয় ।

এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা বলতে এমন এক শাসন ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে সরকারি ক্ষমতা একটিমাত্র কর্তৃপক্ষ বা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকে । সাধারণত এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার ছাড়া অন্য কোনো সরকারের অস্তিত্ব থাকে না । তবে শাসন কাজের সুবিধার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার এক বা একাধিক আঞ্চলিক সরকার গঠন করতে পারে । এইসব আঞ্চলিক সরকারের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা বা স্বাতন্ত্র্য থাকে না । এদের ক্ষমতা ও অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপেই কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল । 

অধ্যাপক গার্নারের মতে , যে শাসন ব্যবস্থায় সমস্ত ক্ষমতা সংবিধানের মাধ্যমে একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকে তাকে এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা বলা হয় । 

অধ্যাপক ডাইসি এককেন্দ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে একটিমাত্র কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দ্বারা চূড়ান্ত আইনগত ক্ষমতার স্বাভাবিক প্রয়োগ বলে অভিহিত করেন । 

এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে গ্রেট ব্রিটেন , ফ্রান্স , নিউজিল্যান্ড , ইতালি , চিন , জাপান প্রভৃতি দেশের কথা উল্লেখ করা যায় । 

এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য

এককেন্দ্রিক সরকারের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলি হল— 

কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাধান্য :

এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় সরকারের চূড়ান্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকায় সমগ্র দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয় । অবশ্য প্রশাসনের সুবিধার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কয়েকটি আঞ্চলিক সরকার ও আঞ্চলিক স্বায়ত্ত শাসিত প্রতিষ্ঠান গঠন করতে পারে । এইসব সরকারের স্বাধীন অস্তিত্ব বলে কিছু থাকে না । 

কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজন হলে এদের ক্ষমতার হ্রাস , বৃদ্ধি , এমনকি বিলুপ্তিও ঘটাতে সক্ষম । স্থানীয় সরকারগুলির প্রধান কাজ হল কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক অর্পিত দায়দায়িত্ব পালন করা । 

কেন্দ্রীয় আইনসভার প্রাধান্য : 

অধ্যাপক ডাইসির মতে , কেন্দ্রীয় আইনসভার প্রাধান্য এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য । কেন্দ্রীয় আইনসভা এই শাসন ব্যবস্থায় সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী । যে কোনো ধরনের আইন প্রণয়ন এবং প্রচলিত আইন সংশোধন বা বাতিল করার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় আইনসভা ভোগ করে থাকে । 

বস্তুতপক্ষে , এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় সংবিধানের প্রাধান্যের পরিবর্তে আইনসভার প্রাধান্য বজায় থাকে । কেন্দ্রীয় আইনসভা প্রয়োজন হলে সংবিধানের যে কোনো ধরনের রদবদল করতে পারে ।

সুপরিবর্তনীয় সংবিধান : 

এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় সংবিধান সুপরিবর্তনীয় হয়ে থাকে । এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় আইনসভা শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থনের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে পারে । এজন্য কোনো বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বনের দরকার পড়ে না । 

ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ : 

এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটে । কেন্দ্রীয় সরকারের হাতেই যাবতীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে । 

লিখিত বা অলিখিত সংবিধান : 

এককেন্দ্রিক সরকারের সংবিধান লিখিত বা অলিখিত দুই-ই হতে পারে । যেমন , ব্রিটেনের সংবিধান মূলত অলিখিত ; অন্যদিকে ফ্রান্স , চিন ও নিউজিল্যান্ডের সংবিধান লিখিত । 

বিচার বিভাগের গুরুত্বহীনতা : 

এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় সংবিধানের প্রাধান্য না থাকায় বিচার বিভাগ এখানে দুর্বল । সংবিধানের অভিভাবক এবং ব্যাখ্যাকর্তা হিসেবে বিচার বিভাগের গুরুত্ব এখানে অস্বীকৃত । প্রকৃতপক্ষে আইন বিভাগের প্রাধান্য মেনে নিয়েই এখানে বিচার বিভাগ কাজ করে থাকে । 

একনাগরিকত্বের স্বীকৃতি : 

এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় একনাগরিকত্বের অনুসৃত হয় । গ্রেট ব্রিটেন , ফ্রান্স , নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশে আঞ্চলিক সরকারগুলির অধীন অধিবাসীদের জন্য আলাদা কোনো নাগরিকত্বের ব্যবস্থা নেই । 

সার্বভৌম ক্ষমতার অবস্থান সুষ্পষ্ট : 

এককেন্দ্রিক সরকারে সার্বভৌমিকতার অবস্থান সুস্পষ্ট । এখানে কেন্দ্রীয় সরকার এককভাবে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী । কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই । আঞ্চলিক সরকার বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলি প্রশাসনে যুক্ত থাকলেও , সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী হতে পারে না ।

error: Content is protected !!