ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় উল্লেখিত নীতি 

ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় উল্লেখিত নীতি

সাধারণত যেসব আদর্শ ও নীতিগুলিকে ভিত্তি করে সংবিধান গড়ে ওঠে সেগুলি প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয় । ভারতীয় সংবিধানেও এই ধারা অনুসরণ করা হয়েছে । ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় উল্লিখিত নীতিগুলি হল— 

আমরা ভারতের জনগণ 

প্রস্তাবনার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় একেবারে শুরুতেই ‘ আমরা ভারতের জনগণ ‘ ( We the people of India ) — এই কথাগুলি বলা হয়েছে । এর অর্থ ভারতে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী জনগণ এবং জনগণই সংবিধানের রচয়িতা । 

ড. আম্বেদকর এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন , ভারতে সংবিধানের উৎস জনগণ , সংবিধানের কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমিকতা জনগণের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে । 

সুপ্রিমকোর্ট এ. কে. গোপালন বনাম মাদ্রাজ রাজ্য মামলায় এই অভিমত প্রকাশ করে যে , প্রস্তাবনা অনুযায়ী ভারতের জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী । এভাবে প্রস্তাবনার শুরুতেই জনগণের সার্বভৌমত্বের নীতির উল্লেখ করা হয়েছে ।

সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র 

প্রস্তাবনায় ভারতকে একটি সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র ( Sovereign Socialist Secular Democratic Republic ) বলে বর্ণনা করা হয়েছে । ‘ সার্বভৌম ’ কথাটির অর্থ হল ভারত অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় দিক থেকে চূড়ান্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী । প্রস্তাবনায় ‘ সমাজতান্ত্রিক ’ ও ‘ ধর্মনিরপেক্ষ ’ এই দুটি নীতির উল্লেখ করে বলতে চাওয়া হয়েছে যে , গণতান্ত্রিক সমাজবাদের আদর্শ অনুসরণ করে মিশ্র অর্থনীতির মাধ্যমে এখানে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে । 

অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রাচীন ভারতের এক মহান আদর্শ । ধর্মসংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্র এখানে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ । রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা বা বিরোধিতা — কোনোটাই করে না । গণতান্ত্রিক ও সাধারণতন্ত্র পরিভাষা দুটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরু বলেছিলেন , গণতন্ত্র ও সাধারণতন্ত্র এই দুটি শব্দ সমার্থব্যঞ্জক । ভারতে দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে । 

ন্যায়বিচার , স্বাধীনতা , সাম্য এবং ভ্রাতৃত্ববোধ 

সংবিধানের প্রস্তাবনায় সামাজিক , অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের নীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে । সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলিকে স্বীকৃতি দিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংকল্প দৃঢ়ভাবে ঘোষিত হয়েছে । 

এ ছাড়া সংবিধানের চতুর্থ অধ্যায়ে নির্দেশমূলক নীতিগুলির মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া হয়েছে । এ ছাড়া প্রস্তাবনায় চিন্তা , মতপ্রকাশ , বিশ্বাস , ধর্ম ও উপাসনার স্বাধীনতা , সুযোগসুবিধার ক্ষেত্রে সাম্য , ব্যক্তির মর্যাদা এবং জাতির ঐক্য ও সংহতির নিশ্চয়তা সাধনে ভ্রাতৃত্ববোধের প্রসারের কথা বলা হয়েছে ।

error: Content is protected !!