ভারতের সংবিধান সুপরিবর্তনীয় ও দুষ্পরিবর্তনীয় এর মিশ্রণ

ভারতের সংবিধান সুপরিবর্তনীয় ও দুষ্পরিবর্তনীয় এর মিশ্রণ

সংশোধন পদ্ধতির নিরিখেই কোনো দেশের সংবিধানকে সুপরিবর্তনীয় অথবা দুষ্পরিবর্তনীয় বলে আখ্যা দেওয়া হয় । যে সংবিধানকে সাধারণ আইন পাশের পদ্ধতি অনুযায়ী সহজে পরিবর্তন করা যায় , তাকে সুপরিবর্তনীয় সংবিধান বলে । 

আর যে সংবিধান পরিবর্তন করতে কোনো বিশেষ ও জটিল পদ্ধতির প্রয়োজন হয় তাকে দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধান বলা হয় । ভারতের সংবিধানে সুপরিবর্তনীয়তা ও দুষ্পরিবর্তনীয়তার যে মিশ্রণ ঘটেছে তা সংবিধান সংশোধন পদ্ধতির পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায় । 

সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি 

ভারতীয় সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে তিনটি পদ্ধতি রয়েছে । এই পদ্ধতিগুলি হল সরল পদ্ধতি , আংশিক জটিল পদ্ধতি এবং জটিল পদ্ধতি । 

সরল পদ্ধতি : 

সংবিধানের অন্তর্গত কয়েকটি বিষয়কে অত্যন্ত সরল পদ্ধতিতে পরিবর্তন বা সংশোধন করা যায় । এক্ষেত্রে সাধারণ আইন পাসের পদ্ধতিতে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের সাধারণ সংখ্যা গরিষ্ঠের সমর্থনে সংবিধান সংশোধিত হয় । নতুন রাজ্যের সৃষ্টি বা পুরোনো রাজ্যের সীমানা বা নাম পরিবর্তন , বিধান পরিষদ সৃষ্টি বা বিলোপ , সুপ্রিম কোর্টের এলাকা সম্প্রসারণ প্রভৃতি বিষয় এই পদ্ধতিতে সংশোধন করা হয় । 

আংশিক জটিল পদ্ধতি :

এই পদ্ধতি অনুযায়ী , সংবিধানের কিছু নির্দিষ্ট অংশের সংশোধনের ক্ষেত্রে পার্লামেন্টের দুটি কক্ষের মোট সদস্যের অর্ধেকের বেশি এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারীর সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনের প্রয়োজন হয় । এই পদ্ধতির মাধ্যমে সংবিধানের তৃতীয় ও চতুর্থ পরিচ্ছেদের যথাক্রমে মৌলিক অধিকার ও নির্দেশমূলক নীতিগুলিকে পরিবর্তন বা সংশোধন করা হয় । 

জটিল পদ্ধতি : 

এই পদ্ধতি অনুযায়ী , প্রথমে সংশোধনী প্রস্তাবটিকে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের মোট সদস্যদের অধিকাংশ এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ কর্তৃক সমর্থিত হতে হবে । এরপর প্রস্তাবটিকে রাজ্য আইনসভাগুলির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয় । এক্ষেত্রে অন্তত অর্ধেক রাজ্য আইনসভার অনুমোদন আবশ্যক । যে সমস্ত বিষয় এই পদ্ধতিতে সংশোধিত হয় তার মধ্যে রয়েছে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আইন সংক্রান্ত ক্ষমতা বণ্টন , কেন্দ্র রাজ্যের শাসন সংক্রান্ত ক্ষমতার পরিধি প্রভৃতি । 

উপসংহার 

ভারতের সংবিধান সংশোধনের উপরিউক্ত তিনটি পদ্ধতি পর্যালোচনা করলে এটা দেখা যায় যে , ভারতের সংবিধান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের মতো অতিমাত্রায় দুষ্পরিবর্তনীয় বা ব্রিটেনের মতো সুপরিবর্তনীয় কোনোটাই নয় । ভারতের সংবিধানে সুপরিবর্তনীয়তা ও দুষ্পরিবর্তনীয়তার এক সমন্বয় ঘটেছে । 

কে. সি. হোয়ারের ভাষায় , “ The constitution of India strikes a good balance ” । পণ্ডিত নেহরু গণপরিষদে মন্তব্য করেছিলেন , ‘ আমরা সংবিধানকে এরকম দুষ্পরিবর্তনীয় করতে চাই না যা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে সক্ষম হবে না । ভারতীয় সংবিধানের সংশোধন পদ্ধতির প্রকৃতিতে আপাত দুষ্পরিবর্তনীয়তার মধ্যে যে নমনীয়তা আছে তা সংবিধানের গতিশীলতাকে অব্যাহত রাখতে পেরেছে বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন ।

error: Content is protected !!