সুনাগরিক বলতে কি বুঝায়

সুনাগরিক বলতে কি বুঝায়

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার মূল উপাদান হল জনগণ । এই কারণে গণতন্ত্রকে জনগণের শাসন বলে অভিহিত করা হয় । গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাফল্যের প্রধান শর্ত হল সুনাগরিকত্ব । সাধারণভাবে নাগরিকদের মধ্যে যারা বিশেষ কয়েকটি উৎকৃষ্ট গুণের অধিকারী তাদের সুনাগরিক বলা হয় । লর্ড ব্রাইস সুনাগরিকের তিনটি প্রধান গুণের কথা উল্লেখ করেছেন । সেগুলি হল – 1. বুদ্ধিমত্তা ( Intelligence ) , 2. আত্মসংযম ( Self Control ) , 3. বিবেক ( Conscience ) । 

বার্নস এগুলি ছাড়া আরও দুটি গুণের কথা উল্লেখ করেছেন । সেগুলি হল— দেশপ্রেম এবং স্বাধীনচেতা মনোভাব । 

অধ্যাপক হ্যারল্ড ল্যাম্বির অভিমত হল , সুনাগরিক নিজের কল্যাণের সঙ্গে বৃহত্তর সমাজের কল্যাণের কথা ভাবে । তাঁর মতে , সুনাগরিক হবে বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন এবং কার্যক্ষেত্রে যথাযথ বিচার বুদ্ধি প্রয়োগের যোগ্যতাও তার থাকবে । 

সুনাগরিকের প্রতিবন্ধকতা

সুনাগরিকত্বের প্রধান অন্তরায়গুলি হল— 

নির্লিপ্ততা : 

সুনাগরিকত্বের প্রধান অন্তরায় হল নির্লিপ্ততা । যখন নাগরিকরা ভাবতে শুরু করে যে রাষ্ট্র তথা সমাজের প্রতি কর্তব্য পালনের দায়ভার তার একার নয় , তখন দেখা দেয় ঔদাসীন্য বা উৎসাহহীনতা । দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে একজন ব্যক্তির যা কিছু কর্তব্য পালনীয় , নির্লিপ্ত মনোভাবের কারণে সে তা থেকে বিরত থাকে । যেমন নির্বাচনের সময় ভোটাধিকার প্রয়োগ না করা , সরকারি কর্মীদের কাজের প্রতি অবহেলা , মুমূর্ষু প্রতিবেশীদের সাহায্য না করে নির্বিকার থাকা ইত্যাদি । 

নাগরিকদের মধ্যে নির্লিপ্ত মনোভাব জন্ম নেওয়ার পেছনে কয়েকটি বিশেষ কারণকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেছেন । সেই কারণগুলি হল বর্তমান জনবহুল বৃহদায়তন রাষ্ট্রে ব্যক্তির নগণ্য ও অসহায় অস্তিত্ব , জীবন সংগ্রামের ক্রমবর্ধমান তীব্রতা , নিরক্ষরতা , কুশিক্ষা ইত্যাদি । 

স্বার্থপরতা : 

সুনাগরিকত্বের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হল ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা । সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ সমাজ তথা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আত্মনিয়োগের পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে । রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন , “ মানুষের সবচেয়ে বড়ো ধর্ম হইল সমাজ ধর্ম ” । ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা মানুষকে অসামাজিক তথা রাষ্ট্রবিরোধী কাজে প্ররোচিত করে । ফলে রাষ্ট্রীয় জীবনে দুর্নীতির প্রকোপ ঘটে ; কর ফাঁকি , উৎকোচ গ্রহণ ও প্রদান প্রভৃতির মতো অপরাধ প্রবণতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে । 

দলীয় সংকীর্ণতা : 

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে । কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলি অনেক সময় দেশ ও দেশবাসীর বৃহত্তর স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে পরিচালিত হয় । এর ফলে দলীয় সংঘর্ষ , নীতিহীন ক্ষমতালোভী রাজনীতির প্রসার , নির্বাচনি কারচুপি , ভোট কেনাবেচা , রাজনৈতিক সন্ত্রাস ইত্যাদি ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হয় । এইভাবে দলীয় সংকীর্ণতা গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয় । 

অজ্ঞতা : 

সুনাগরিকত্বের ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায় হল নাগরিকদের অজ্ঞতা । উপযুক্ত শিক্ষাদীক্ষার অভাবে অজ্ঞতার জন্ম হয় । উন্নয়নশীল গণতান্ত্রিক বিশ্বের বহু মানুষ এখনও নিরক্ষরতা ও অজ্ঞতার অন্ধকারে ডুবে রয়েছে । অজ্ঞতা ও নিরক্ষরতা থেকে জন্ম নেয় কুসংস্কার , সাম্প্রদায়িক মনোভাব , ধর্মীয় সংকীর্ণতা প্রভৃতি । সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজের মুষ্টিমেয় এলিট শাসকবর্গ তাদের সংকীর্ণ স্বার্থ চরিতার্থ করার সুযোগ পায় । এইসব মনোভাব জাতীয় জীবনকে সংকটাপন্ন করে তোলে । 

গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতার অভাব :

সুনাগরিকত্বের আর এক প্রতিবন্ধকতা হল গণমাধ্যমগুলির নেতিবাচক ভূমিকা । গণমাধ্যমগুলি বিশেষ বিশেষ শ্রেণিস্বার্থে পরিচালিত হয় বলে তারা তাদের ভূমিকা সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারে না । দেশের আপামর জনগণকে কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধ করতে অনেক সময় গণমাধ্যমগুলি যথাযথ ভূমিকা নেয় না । এই কারণে নাগরিকদের মধ্যে সুষ্ঠু জনমতের বিকাশ ঘটে না । 

উপসংহার 

সুনাগরিকত্বের প্রতিবন্ধকতা আধুনিক উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রধান সমস্যা । বস্তুত , উন্নয়নশীল দেশগুলির ব্যাপক আর্থসামাজিক বৈষম্য নাগরিকদের মধ্যে নিরাশার জন্ম দেয় । এই কারণে জনগণের এক বিশাল অংশ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় দায়িত্বের সঙ্গে অংশগ্রহণের বিষয়ে যাবতীয় উৎসাহ উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলে ।

error: Content is protected !!