মানবাধিকার এবং অন্যান্য অধিকারের মধ্যে পার্থক্য

মানবাধিকার এবং অন্যান্য অধিকারের মধ্যে পার্থক্য

আপাতদৃষ্টিতে মানবাধিকার ও অন্যান্য অধিকার , উভয়েই ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের পক্ষে সহায়ক । সেদিক থেকে এই দুই অধিকারকে অভিন্ন বলে ধরা যেতে পারে । তবে মানবাধিকারের সঙ্গে অন্যান্য অধিকারের কয়েকটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে । সেগুলি হল—

উদ্ভবগত পার্থক্য 

সাধারণ অধিকারের ধারণার উদ্ভব ঘটে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষদিকে । অন্যদিকে মানবাধিকারের ধারণার জন্ম হয় বিংশ শতাব্দীর চারের দশকে । 

সর্বজনীনতাগত পার্থক্য 

মনুষ্যত্বের অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে মানবাধিকারের ধারণার ওপর গুরুত্ব আরোপিত হয় । এই কারণে মানবাধিকারের প্রকৃতি সর্বজনীন । অন্যদিকে , রাষ্ট্রীয় আইনের দ্বারা সংরক্ষিত সাধারণ অধিকার শুধুমাত্র সেই রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট জনসমষ্টির পক্ষেই ভোগ করা সম্ভব । তাই সাধারণ অধিকারকে কোনোভাবেই সর্বজনীন আখ্যা দেওয়া যায় না । 

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে পার্থক্য 

মানবাধিকার জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক — এই দুই স্তরেই আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে স্বীকৃতি অর্জন করে । সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সর্বজনীন মানবাধিকার সংক্রান্ত বিশ্বজনীন ঘোষণায় ১৯৪৮ সালের ১০ ই ডিসেম্বর মানবাধিকারকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় । সাধারণ অধিকারের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেখা যায় না । সাধারণ অধিকার কেবল জাতীয় ক্ষেত্রে নিজের রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডের সীমানার মধ্যেই স্বীকৃতি পায় । 

আন্তর্জাতিক নজরদারির প্রশ্নে পার্থক্য 

মানবাধিকার সুরক্ষিত করার জন্য আন্তর্জাতিক নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে । ১৯৯৩ সালে মানবাধিকার সম্পর্কিত বিশ্ব সম্মেলনে গৃহীত ভিয়েনা ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচিতে বলা হয় মানবাধিকারকে উৎসাহ দেওয়া ও তার সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক মহলের একটি দায়িত্ব । অন্যান্য অধিকারের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো আন্তর্জাতিক নজরদারির কথা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের কারণে কল্পনা করা যায় না । সাধারণ অধিকারের সুরক্ষার জন্য নজরদারি রাষ্ট্র নিজেই করে থাকে । 

আইনগত বাধ্যবাধকতা সংক্রান্ত পার্থক্য

মানবাধিকার রূপায়ণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই । অন্যদিকে , রাষ্ট্রীয় এক্তিয়ারের অধীন মৌলিক অধিকারগুলি সংবিধান কর্তৃক বিধিবদ্ধ থাকে বলে তার আইনগত বাধ্যবাধকতা লক্ষ করা যায় । নাগরিক অধিকার সম্পূর্ণভাবে আইন নির্ভর । অন্যদিকে , মানবাধিকার একটি নৈতিক অধিকার ।

কমিশনের ভূমিকার প্রশ্নের পার্থক্য 

মানবাধিকারের বাস্তব রূপায়ণে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরে মানবাধিকার কমিশন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে থাকে । জাতিপুঞ্জের অধীনে মানবাধিকার হাইকমিশনারের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য , জাতীয় স্তরেও বিভিন্ন দেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করেছে । সাধারণ অধিকারের রক্ষণাবেক্ষণ বা তার রূপায়ণের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো কমিশনের ভূমিকা লক্ষ করা যায় না ।

আদালতের ভূমিকার ক্ষেত্রে পার্থক্য 

মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে সেই সংক্রান্ত অভিযোগ সরাসরি আদালতে পেশ করা যায় না । এজন্য মানবাধিকার কমিশন বা কমিটির কাছে আবেদন জানাতে হয় । অন্যদিকে , যেসব সাধারণ অধিকার সংবিধানে লিপিবদ্ধ হওয়ার কারণে মৌলিক অধিকারের মর্যাদা লাভ করেছে তা লঙ্ঘিত হলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচারবিভাগ বা শীর্ষ আদালত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে । 

উপসংহার 

পরিশেষে বলা যায় , মানবাধিকার ও অন্যান্য অধিকারের মধ্যে প্রকৃতিগত পার্থক্য রয়েছে । তবে মানবাধিকার সভ্য দুনিয়ায় মনুষ্যত্বের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে এক মহত্তম বিশ্বজনীন আদর্শের অঙ্গীকার । 

error: Content is protected !!