গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য

গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য

রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র দুটি বিপরীতধর্মী আদর্শ । এই কারণে গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের মধ্যে মৌলিক প্রভেদ রয়েছে । 

তত্ত্বের উৎসজনিত পার্থক্য 

গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের তত্ত্বগত উৎস সম্পূর্ণ পৃথক । ব্রিটিশ উদারনৈতিক মানবতাবাদী ও হিতবাদী দর্শন হল গণতন্ত্রের তত্ত্বগত উৎস । অন্যদিকে জার্মান আদর্শবাদী দার্শনিক হেগেলের চরম রাষ্ট্রবাদী দর্শন হল একনায়কতন্ত্রের প্রধান উৎস । 

সার্বভৌমত্বের অবস্থানগত পার্থক্য 

গণতন্ত্রে জনগণের সার্বভৌমত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত । অন্যদিকে , একনায়কতন্ত্রে জনগণের মতামতের কোনো মূল্য নেই । একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সর্বময় সার্বভৌম ক্ষমতা একনায়কের হাতে ন্যস্ত থাকে । 

ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের গুরুত্ব সংক্রান্ত পার্থক্য

গণতন্ত্র একনায়কতন্ত্রের মধ্যে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের গুরুত্বের প্রশ্নে মৌলিক পার্থক্য দেখা যায় । গণতন্ত্রে জনসাধারণের কল্যাণের জন্যই রাষ্ট্রের সৃষ্টি বলে মনে করা হয় । অন্যদিকে একনায়কতন্ত্রে রাষ্ট্রের গুরুত্ব সর্বাধিক । বস্তুত , একনায়কতন্ত্রে রাষ্ট্রশক্তির যূপকাষ্ঠে স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার বলিদান ঘটে । এককথায় , গণতন্ত্রে রাষ্ট্র ব্যক্তির জন্য , একনায়কতন্ত্রে ব্যক্তি রাষ্ট্রের জন্য । 

শাসন ব্যবস্থার প্রকৃতিগত পার্থক্য 

একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রকৃতিগত মৌলিক পার্থক্য রয়েছে । গণতান্ত্রিক শাসনকে জনগণের শাসন বলে অভিহিত করা হয় । অন্যদিকে , একনায়কতান্ত্রিক শাসন হল সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী একজন ব্যক্তি বা একটি বিশেষ দল বা একটি বিশেষ শ্রেণির শাসন ।

শাসন ক্ষমতার ভিত্তিগত পার্থক্য 

গণতন্ত্রের ভিত্তি হল শাসিতের সম্মতি । গণতন্ত্রে শাসকগণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন এবং জনমত অনুসারে শাসন পরিচালনা করেন । অন্যদিকে , একনায়কতন্ত্রের ভিত্তি হল পশুশক্তি । একনায়ক জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি নন । তিনি বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা অধিকার করেন এবং বজায় রাখেন । নায়কের ইচ্ছাই একনায়কতন্ত্রে চূড়ান্ত । 

স্বায়ত্ত শাসনজনিত পার্থক্য 

স্বায়ত্তশাসন গণতন্ত্রের মূলনীতি । গণতন্ত্রে জনগণ স্বায়ত্ত শাসনের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে শাসনকাজে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় । কিন্তু একনায়কতন্ত্রে স্বায়ত্ত শাসন সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত । 

ব্যক্তি স্বাধীনতা সংক্রান্ত পার্থক্য 

গণতন্ত্রে ব্যক্তি স্বাধীনতা একটি প্রধান স্বীকৃত উপাদান ; অন্যদিকে একনায়কতন্ত্রে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেওয়া হয় না । একনায়কতন্ত্র ব্যক্তি স্বাধীনতার আমুল বিরোধী । 

দলগত অস্তিত্ব সংক্রান্ত পার্থক্য 

গণতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলি সমমর্যাদা পেয়ে থাকে । সরকারের কাজকর্মের ভুল ত্রুটি সম্বন্ধে বিরোধী দল প্রকাশ্যে সমালোচনা করার অধিকার লাভ করে । অন্যদিকে , একনায়কতন্ত্রে শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন দল ছাড়া অন্য কোনো দলের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয় না । 

বিশ্ব শান্তি বিষয়ক পার্থক্য 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে গণতন্ত্র প্রকৃত জাতীয়তাবাদের পৃষ্ঠপোষক এবং বিশ্ব শান্তির আদর্শে বিশ্বাসী । কিন্তু একনায়কতন্ত্র উগ্র জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয় যা বিশ্ব শান্তির পরিপন্থী । 

জরুরি অবস্থাজনিত পার্থক্য 

একনায়কতন্ত্রে একনায়কের মতামতই চূড়ান্ত । তাই এই ধরনের শাসনব্যবস্থায় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব , কিন্তু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় তা হয় না । গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সাংবিধানিক রীতিনীতি এবং নিয়মকানুন মেনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় বলে অহেতুক বিলম্বের সৃষ্টি হয় । 

বিপ্লবের সম্ভাবনা সংক্রান্ত পার্থক্য 

গণতন্ত্রে জনগণ নিজেরাই প্রতিনিধি নির্বাচন করে সরকার গঠনের কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় বলে এখানে বিপ্লবের কোনো সম্ভাবনা থাকে না । গণতন্ত্রে নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সরকার পরিবর্তন করা সম্ভব । অন্যদিকে , একনায়কতন্ত্রে স্বৈরাচারী একনায়ককে উৎখাত করতে চাওয়া হলে বিপ্লব ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই । 

স্থায়িত্বগত পার্থক্য : 

গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের মতামতের ওপর নির্ভরশীল । এই জনমত সদা পরিবর্তনশীল , তাই সরকারেরও ঘন ঘন পরিবর্তন ঘটে । অন্যদিকে , একনায়কতন্ত্রে একদলীয় শাসনের অধীনে রাষ্ট্রব্যবস্থা অনেক মজবুত ও স্থিতিশীল থাকে বলে মনে করা হয় । 

উপযোগিতাগত পার্থক্য 

অনেকে মনে করেন , একনায়কতন্ত্র বৃহৎ রাষ্ট্রের পক্ষে একেবারেই অনুপযুক্ত । একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের সমগ্র প্রশাসন এক বা একাধিক ব্যক্তির দ্বারা সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা সম্ভব নয় । অন্যদিকে , গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা জনগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে পরিচালিত হওয়ার ফলে তা ক্ষুদ্র-বৃহৎ সর্বস্তরের রাষ্ট্রের পক্ষে উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয় । 

সাম্যনীতি রূপায়ণে পার্থক্য 

গণতন্ত্রে সাম্য ও স্বাধীনতার নীতির বাস্তব রূপায়ণ সম্ভব হয় বলে এইধরনের শাসনব্যবস্থায় স্ত্রী-পুরুষ , জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনগণের মধ্যে কোনোরকম বৈষম্য করা হয় একনায়কতন্ত্রে সর্বস্তরে বৈষম্য প্রকট । দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষ এখানে বিনা প্রতিবাদে স্বৈরাচারী শাসন মেনে নিতে অন্যদিকে , বাধ্য হয় ।

উপসংহার 

উপরিউক্ত বিশ্লেষণের শেষে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে , গণতন্ত্র নিঃসন্দেহে একনায়কতন্ত্র অপেক্ষা উৎকৃষ্ট এবং অধিকতর গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা ।

error: Content is protected !!