একনায়কতন্ত্রের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ

একনায়কতন্ত্রের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ

একনায়কতন্ত্রের সংজ্ঞা 

নিউম্যান প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী বলা যায় , দেশের সমগ্র প্রশাসন এক বা একাধিক ব্যক্তি দখল করে অপ্রতিহত স্বৈরাচারী ক্ষমতা প্রয়োগ করলে তাকে একনায়কতন্ত্র বলা হয় । অস্টিন রেনির মতে , একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় প্রশাসনের চূড়ান্ত ক্ষমতা এক বা একাধিক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয় । 

সাধারণ অর্থ :

বস্তুত , যে শাসন ব্যবস্থায় যাবতীয় সরকারি ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির হাতে থাকে তাকে একনায়কতন্ত্র আখ্যা দেওয়া হয় । একনায়কতন্ত্রে রাষ্ট্রনায়ক বা নায়কবৃন্দ বলপূর্বক ক্ষমতা দখল ক’রে জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে নিজস্ব শ্রেণিস্বার্থে শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করেন । সমস্ত বিরোধী দল বা বিরোধী মতামত ও শক্তিকে দমন করে রাষ্ট্রনায়ক অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী হন । 

একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণের মতামতকে কোনো মূল্য দেওয়া হয় না । সরকার বিরোধী জনমতকে এখানে ধ্বংস করা হয় । ইতালিতে মুসোলিনি এবং জার্মানিতে হিটলারের শাসন ব্যবস্থা একনায়কতন্ত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ । 

একনায়কতন্ত্রের ভিত্তি :

একনায়কতন্ত্রের ভিত্তি রচনায় , যেসব দার্শনিক তাঁদের বক্তব্য প্রচার করেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জার্মান দার্শনিক হেগেল , নিৎসে এবং ট্রিটসকে । এঁদের মতে রাষ্ট্রই প্রধান , ব্যক্তি অপ্রধান । অতএব প্রথমে রাষ্ট্র , পরে মানুষ । রাষ্ট্রের যূপকাষ্ঠে মানুষের স্বাধীনতা , স্বাতন্ত্র্য ও অধিকারকে বলি দেওয়া করা হয় । এইভাবে একনায়কতন্ত্রে রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়ায় সর্বাত্মক ও সর্বশক্তিমান ।

বিভিন্ন প্রকারের একনায়কতন্ত্র 

একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রধানত তিনটি রূপ দেখা যায় । সেগুলি হল – [ 1 ] ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্র , [ 2 ] দলগত একনায়কতন্ত্র এবং [ 3 ] শ্রেণিগত একনায়কতন্ত্র । 

ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্র : 

সমগ্র দেশের শাসন ক্ষমতা একজন ব্যক্তি বা সামরিক নেতার হাতে সম্পূর্ণরূপে কেন্দ্রীভূত হলে তাকে ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্র বলা হয় । এই ধরনের শাসন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষ সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী হলেও তার পিছনে কোনো রাজনৈতিক দল বা সামরিক বাহিনীর সক্রিয় সমর্থন থাকে । রোমে জুলিয়াস সিজারের শাসন ব্যবস্থাকে ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্র বলে উল্লেখ করা হয় । এ ছাড়া যখন কোনো সেনানায়ক সেনাবাহিনীর সক্রিয় সমর্থনে দেশে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন তখন তাকে সামরিক একনায়কতন্ত্র বলা হয় । 

সাধারণত কোনো সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের শাসন ক্ষমতা দখল করে সামরিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয় । পাকিস্তানের সেনানায়ক আয়ুব খান , স্পেনের সেনানায়ক ফ্রাঙ্কো প্রমুখ এইভাবেই সামরিক একনায়কতন্ত্রের পত্তন করেন । অনেক সময় আবার আইন অনুমোদিত পদ্ধতিতে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে । যেমন —– জার্মানিতে হিটলার , ইতালিতে মুসোলিনি এবং ঘানায় নকুমার একনায়কতন্ত্র প্রভৃতি । 

দলগত একনায়কতন্ত্র : 

দেশের যাবতীয় রাষ্ট্রক্ষমতা পুরোপুরি একটি দলের হাতে যখন কেন্দ্রীভূত থাকে এবং সংশ্লিষ্ট দলটি ছাড়া অন্য সমস্ত দল অস্বীকৃত হয় তখন তাকে দলগত একনায়কতন্ত্র বলে । দলগত একনায়কতন্ত্রের মধ্যে আবার ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায় । যেমন—– নাৎসি পার্টির দলীয় একনায়কতন্ত্রের আড়ালে হিটলারের ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্র এবং ফ্যাসিস্ট দলে মুসোলিনির একনায়কতন্ত্র । জার্মানি ও ইতালিতে যথাক্রমে হিটলার ও মুসোলিনি ছিলেন দলনায়ক । সেজন্য তাঁদের শাসনব্যবস্থাকে আবার দলগত একনায়কতন্ত্রও বলা হয় । 

শ্রেণিগত একনায়কতন্ত্র : 

যখন সমগ্র দেশে কোনো একটি বিশেষ শ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় । তখন তাকে শ্রেণিগত একনায়কতন্ত্র বলা যায় । ম্যাকাইভারের অভিমত হল , ‘ কোনো শাসন ব্যবস্থাতেই সর্বময় কর্তৃত্ব একজনের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে না । আপাতদৃষ্টিতে একজন চূড়ান্ত শাসক থাকলেও দেখা যায় যে তাঁর ক্ষমতার ভিত্তি হল একটি বিশেষ শ্রেণির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগ । শাসক এই শ্রেণির স্বার্থে এবং সহযোগিতাতেই শাসন করেন । তাই উদারনৈতিক গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনব্যবস্থার নামে আসলে ধনিক-বণিক শ্রেণির একনায়কতন্ত্র বজায় থাকে । 

অন্যদিকে , সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বহারা শ্রেণির একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায় । গণসাধারণতন্ত্রী চিনে সর্বহারা শ্রেণির একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । এই ধরনের একনায়কতন্ত্রে আদর্শ গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে দাবি করা হয় । 

error: Content is protected !!