গণতন্ত্রের সাফল্যের শর্তাবলী

গণতন্ত্রের সাফল্যের শর্তাবলী

রাষ্ট্রনৈতিক তত্ত্বে গণতন্ত্র একটি উন্নততর শাসন ব্যবস্থারূপে পরিগণিত হলেও এর সাফল্যের জন্য কয়েকটি শর্ত পূরণ আবশ্যক । শর্তগুলি হল 一

গণতান্ত্রিক চেতনার উন্মেষ 

গণতান্ত্রিক চেতনা জনগণকে সক্রিয়ভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করে । এই সচেতনতার ভিত্তিতে জনগণ সরকারের কাজকর্মের ত্রুটি বিচ্যুতির সমালোচনা করে জনস্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নেয় । 

গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলা 

গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য সামাজিক , রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারগুলির যথাযথ স্বীকৃতি ও সংরক্ষণ একান্ত জরুরি । এইভাবে নাগরিকদের মধ্যে সব ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটলে ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব বিকাশের পরিবেশ রচিত হয় । এই পরিবেশ গণতন্ত্রের সাফল্য সুনিশ্চিত করতে সক্ষম । 

অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা 

অধ্যাপক ল্যাস্কির মতে , শুধুমাত্র রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারগুলি স্বীকৃত হলে গণতন্ত্রের সাফল্য আসে না , তার জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা । যে সমাজে দেশের সম্পদ মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির নিয়ন্ত্রণাধীন , সেখানে জনগণ কখনও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক জীবন যাপন করতে পারে না । 

শিক্ষার ব্যাপক প্রসার 

গণতন্ত্র সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণের শাসন হওয়ায় জনগণের গরিষ্ঠ অংশ যদি অশিক্ষিত থাকে তাহলে গণতান্ত্রিক শাসন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় । জন স্টুয়ার্ট মিল এই কারণে মন্তব্য করেছেন , সর্বজনীন ভোটাধিকারের স্বীকৃতির আগে সর্বজনীন শিক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন । 

পরমত সহিষ্ণুতা

গণতন্ত্রে জনগণের বাক্ ও মতামত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে , যার ফলে বহুমতের সৃষ্টি হয় । সেজন্য এখানে ভিন্ন মতাবলম্বী ব্যক্তিদের মধ্যে , সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে সহিষ্ণু মনোভাব থাকা প্রয়োজন । 

ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ নীতি অনুসরণ 

গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য । এর সাহায্যে জনগণ সক্রিয়ভাবে প্রশাসনিক কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় , তাদের রাজনৈতিক জ্ঞান ও দায়িত্ববোধও বৃদ্ধি পায় । 

লিখিত সংবিধানের উপস্থিতি 

হেনরি মেইন , লেকি প্রমুখের বক্তব্য হল , গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য সংবিধান লিখিত হওয়া আবশ্যক । সংবিধান লিখিত থাকলে জনগণ সরকারের ক্ষমতার সীমা ও নিজেদের অধিকার এবং কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতন থাকতে পারে । এই সচেতনতা সরকারকে স্বৈরাচারী হতে বাধা দেয় ।

প্রশাসনিক কর্তব্য পরায়ণতা 

গণতন্ত্রে প্রশাসনিক দায়িত্ব জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে থাকলেও বাস্তবে স্থায়ী সরকারি কর্মচারীরা প্রশাসন পরিচালনার কাজে নিযুক্ত থাকেন । এই সরকারি কর্মচারীরা সৎ সুদক্ষ ও কর্তব্যপরায়ণ না হলে গণতান্ত্রিক সরকার তার ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারে না । 

ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রনেতার উপস্থিতি 

স্যুমপিটারের মতে , গণতন্ত্রের সাফল্য অনেকটাই রাষ্ট্রনৈতিক নেতৃবৃন্দের ন্যায়নীতি ও বিবেক বোধের ওপর নির্ভরশীল । রাষ্ট্রনেতাদের মধ্যে এইসব গুণের ঘাটতি হলে গণতন্ত্র আদর্শ ভ্রষ্ট হয় ।

সুযোগ্য বিরোধী দলের উপস্থিতি 

অধ্যাপক আইভর জেনিংসের মতে , বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্রের অস্তিত্ব থাকে না । বিরোধী দলের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতনতাই সরকারকে সদাসতর্ক রাখে এবং সঠিক পথে পরিচালিত করে । হার্ভে এবং বেথারের মতে , বিরোধী দল জনগণের স্বাধীনতার প্রতীক । 

সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা 

জন স্টুয়ার্ট মিলের মতে , সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের উপযুক্ত ব্যবস্থা গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম শর্ত । গণতন্ত্রে সংখ্যা গরিষ্ঠের ভোটে সরকার গঠিত হয় । এখানে সংখ্যা লঘিষ্ঠের ভোটের কোনো মূল্য থাকে না । তার ফলে জনগণের একটি অংশ সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ভাগ নিতে পারে না । তাই গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের যথাযথ ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক । 

সদাজাগ্রত জনমত 

সুস্থ , সবল ও সদাজাগ্রত জনমত গণতন্ত্রের সাফল্যের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করে । শক্তিশালী জনমত সরকারি স্বৈরাচারিতাকে রোধ করতে সক্ষম হয় । জনমতকে সুসংহত করে তুলতে রাজনৈতিক দল এবং গণমাধ্যমগুলির ইতিবাচক ভূমিকা অপরিহার্য বলে বিবেচিত হয় । 

জাতীয় সংহতি 

মিলের মতে , জাতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠন গণতন্ত্রের বিকাশের পক্ষে জরুরি । জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্যবোধ না থাকলে গণতন্ত্র সাফল্য মণ্ডিত হয় না । সামাজিক ঐক্যবোধের জন্য জাতিভেদ প্রথাসহ অন্যান্য সামাজিক বৈষম্যের বিলুপ্তি প্রয়োজন ।

স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগের উপস্থিতি 

অনেকে আবার গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগের উপস্থিতির কথা বলেন । বিচার বিভাগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ না হলে জনগণ ন্যায়বিচার পেতে পারে না । এরূপ ব্যবস্থা গণতন্ত্রের সাফল্যের পথে প্রধান অন্তরায় । 

সুনাগরিকতা 

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি মানুষের সবরকম সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সুনাগরিক হিসেবে জাতীয় কর্তব্য পালনে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন । আঞ্চলিকতা , প্রাদেশিকতা , বিচ্ছিন্নতা , ধর্মান্ধতা গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয় । তাই গণতন্ত্রে নাগরিকদের এসব থেকে দূরে থাকা আবশ্যক । 

উপসংহার 

পরিশেষে বলা যায় , গণতন্ত্রের সাফল্য কেবল জনগণের সচেতনতার ওপর নির্ভর করে না , শাসক শ্রেণির সদিচ্ছার ওপরেও তা নির্ভরশীল । 

error: Content is protected !!