গণতন্ত্রের প্রকৃতি আলোচনা কর

গণতন্ত্রের প্রকৃতি আলোচনা কর

গণতন্ত্রের স্বরূপ বিশ্লেষণ করলে নিম্নলিখিত দিকগুলি বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে— 

সংখ্যা গরিষ্ঠের শাসন 

অধ্যাপক ডাইসি এবং লর্ড ব্রাইসের মতো আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা লিংকনের দেওয়া সংজ্ঞার মতো গণতন্ত্রকে এত সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি । ডাইসি জনগণের অধিকাংশের শাসন পরিচালনায় অংশগ্রহণকে গণতন্ত্র আখ্যা দিয়েছেন । তাঁর মতে , সংখ্যা গরিষ্ঠের শাসনই হল গণতন্ত্র । লর্ড ব্রাইসের বক্তব্য হল , জনগণের সকলের হাতে শাসন ক্ষমতা থাকলেও গণতন্ত্র আসলে সংখ্যা গরিষ্ঠের শাসন । 

জনগণ কর্তৃক শাসন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ 

সাম্প্রতিককালের সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে কার্ল পপার , রবার্ট ডাল , জোসেফ স্যুমপিটার প্রমুখ গণতন্ত্রের অত্যাধুনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন । কার্ল পপারের মতে , গণতন্ত্র হল এমন একধরনের প্রতিষ্ঠান যার মাধ্যমে জনগণ শাসকদের নিয়ন্ত্রণ এমনকি প্রয়োজনে ক্ষমতা চ্যুত করতে পারে । গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থাই হল গণতন্ত্র । 

সাম্য নীতির অনুসরণ 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সাম্য নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত এক ব্যবস্থা বলে অভিহিত করেছেন । গণতন্ত্রে জাতি-ধর্ম , স্ত্রী-পুরুষ , ধনী-দরিদ্র , শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে আপামর জনগণ সম অধিকার ও সমমর্যাদা ভোগ করে থাকেন । গণতন্ত্রে সার্বভৌম ক্ষমতার চূড়ান্ত অধিকারী হল জনগণ । 

জনমত চালিত শাসন ব্যবস্থা 

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গণতন্ত্রকে জনমত চালিত শাসনব্যবস্থা বলে আখ্যায়িত করেছেন । তাঁদের মতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা , অভিমত এবং ইচ্ছা-অনিচ্ছা ইত্যাদির প্রতিফলন ঘটে জনমতের মাধ্যমে । নির্বাচনে জনগণের রায়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে বলে গণতান্ত্রিক সরকার জনবিরোধী কোনো নীতি বা আইন পাস করা থেকে বিরত থাকে । 

শাসিতের সম্মতি নির্ভর 

গণতন্ত্রকে শাসিতের সম্মতির ওপর প্রতিষ্ঠিত সরকার বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে । গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে শাসিতের সম্মতির প্রতিফলন ঘটে । 

বিশিষ্ট জীবনধারা 

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গণতন্ত্রকে নিছক একটি আদর্শ বা তত্ত্ব হিসেবে দেখেননি । তাঁরা গণতন্ত্র বলতে একটি বিশেষ জীবনধারাকে বুঝিয়েছেন । গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি , চিন্তা-চেতনা , আচার-আচরণ , পারস্পরিক নির্ভরশীলতা , পারস্পরিক সদ্ভাব ও সম্প্রীতি , পারস্পরিক মত বিনিময় ও আলাপ-আলোচনা প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে এই জীবনধারা গড়ে ওঠে । 

উপসংহার 

গণতন্ত্র একটি চিরায়ত আদর্শ । প্রাচীন গ্রিসে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের সূচনা লগ্ন থেকে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক উদারনৈতিক গণতন্ত্র পর্যন্ত আজও এর কোনো বিকল্প নেই । মার্কসবাদীদের অভিমত হল , ধনবৈষম্যমূলক সমাজে কখনোই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না । তাঁদের মতে , অর্থনৈতিক সাম্য ব্যতীত রাজনৈতিক সাম্য অলীক কল্পনা মাত্র ।

error: Content is protected !!