আইনের উৎস গুলি আলোচনা করো

আইনের উৎস গুলি আলোচনা করো

বাস্তব দিক থেকে সার্বভৌম শক্তির অনুমোদনকে আইনের একমাত্র উৎস বলে অভিহিত করা হলেও আইনের উৎস হিসেবে আর্থ-সামাজিক , ধর্মীয় , সাংস্কৃতিক প্রভাব যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ । রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা আইনের যেসব উৎসকে মুখ্য বলে বর্ণনা করেছেন সেগুলি হল— 

প্রথা 

আইনের সবচেয়ে প্রাচীন উৎস হল প্রথা । প্রথা হচ্ছে সমাজ জীবন থেকে সৃষ্ট সেইসব নিয়মকানুন যা ব্যক্তির বা সমষ্টির আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে । প্রাচীন সমাজে প্রথার সাহায্যে দ্বন্দ্বের মীমাংসা করা হত । আদিম সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রথাগত নিয়মকানুনের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হত । সমাজে সকলেই এই প্রথাগুলি মেনে চলে কারণ— 

i. এই সামাজিক নিয়মকানুনগুলি গোষ্ঠী জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় । 

ii. সমাজের সবাই দীর্ঘকাল ধরে এইসব নিয়মকানুন মেনে চলতে অভ্যস্ত । 

iii. সকলেই সমাজজীবনে শৃঙ্খলা রক্ষা করতে আগ্রহী । কালক্রমে , এইসব প্রথা রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও বিধিবদ্ধ হয় এবং আইনের মর্যাদা লাভ করে । বাস্তবে কোনো রাষ্ট্রই প্রথাকে উপেক্ষা করে , আইন প্রণয়ন করতে পারে না । আধুনিককালে অনেক রাষ্ট্রের আইনের মধ্যে প্রথাগত বিধানের অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায় । যেমন , ব্রিটেনে অলিখিত সংবিধানের বেশিরভাগটাই সেখানকার রীতিনীতি ও প্রথার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে ।

ধর্ম 

আইনের অন্যতম প্রাচীন উৎস হল ধর্ম । প্রাচীনকালে প্রায় সব সামাজিক প্রথাই ছিল ধর্মভিত্তিক । ধর্মীয় বিধিভঙ্গ ছিল নীতিবিরুদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ । তাই ধর্মীয় অনুশাসন ও রীতিনীতি প্রাচীন সমাজজীবনে শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠা করেছিল । অর্থাৎ , ধর্মীয় অনুশাসন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আইনের বিবর্তনে সহায়তা করেছিল । রাজাকে যেহেতু ঈশ্বরের প্রতিনিধি ভাবা হত , তাই তার নির্দেশগুলিও ধর্মীয় সমর্থন পেত ।

উইলসনের মতে , প্রথম যুগে রোমের আইন কয়েকটি ধর্মীয় সূত্র ছাড়া আর কিছুই ছিল না । ইহুদি সমাজে ধর্মীয় অনুশাসনের একটি বড়ো অংশ আইনে রূপান্তরিত হয়েছে । মুসলিম রাষ্ট্রগুলিতেও অনুরূপ চিত্র দেখা যায় । 

বিচারব্যবস্থা 

বিচারালয়ের সিদ্ধান্ত আইনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস । আদিম সমাজে রাজা বা দলপতির ওপর বিচারের ভার দেওয়া হয়েছিল । ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে এই বিচারকরা যেসব রায় দিতেন তা পরবর্তীকালে বিচারকাজে আইন হিসেবে গণ্য হত । বর্তমানেও অনেক সময় এইভাবে বিচারের রায় আইন সৃষ্টি করে । বিচারকরা আইনের যে ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ প্রদান করেন তা থেকে আইনের অর্থ সুস্পষ্ট হয় । তা ছাড়া বিচারপতিদের ঘোষিত সিদ্ধান্ত পরবর্তীকালে অনুরূপ মামলায় নজির হিসেবে গৃহীত হয় । এইসব নজিরকে বিচারক সৃষ্ট আইন ( Judge made law ) বলা হয় । 

ন্যায়বিচার 

আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হল ন্যায়বিচার । দেশে প্রচলিত আইনকানুনের সাহায্যে কোনো ক্ষেত্রে যদি ন্যায়বিচারের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব না হয় , তাহলে বিচারপতিগণ নিজস্ব বিচারবুদ্ধি ও ন্যায়নীতিবোধ অনুসারে বিচার কাজ সম্পাদন করেন । এর ফলেও নতুন আইনের সৃষ্টি হয় । 

আইনজ্ঞদের আলোচনা 

বিভিন্ন মামলাকে কেন্দ্র করে এবং আইন সংক্রান্ত বিষয়ে সুপণ্ডিত ব্যক্তিদের মতামত ও সিদ্ধান্ত আইনের উৎস হিসেবে কাজ করে । আইনের ওপর আইনজ্ঞদের আলোচনা , ভাষ্য , টীকা ইত্যাদি বিচারের রায়দানের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় । ব্ল্যাকস্টোন , কোক প্রমুখের টীকা ব্রিটেনের আইনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে । আমাদের দেশে মনু প্রমুখ স্মৃতিশাস্ত্রের ব্যাখ্যাকার হিন্দু আইনের সংস্কারসাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন । 

আইনসভা 

বর্তমান যুগে আইনসভা কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে আইন প্রণয়ন হল আইনের প্রধান উৎস । আইনসভার সদস্যরা জনমতের সঙ্গে সংগতি রেখে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করেন । জনকল্যাণকর রাষ্ট্রে ব্যাপক দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য যেসব আইনের প্রয়োজন হয় তা তৈরি করে আইনসভা । এর ফলে আইনসভা কর্তৃক প্রণীত আইনের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে । অন্যদিকে প্রথা , ধর্ম ইত্যাদি উৎসের গুরুত্ব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে ।

error: Content is protected !!