জাতীয়তাবাদের পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি দাও

জাতীয়তাবাদের পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি দাও

জাতীয়তাবাদের পক্ষে যুক্তি 

একটি সৃজনশীল ও রাষ্ট্রনৈতিক আদর্শরূপে জাতীয়তাবাদের স্বতন্ত্র গুরুত্ব রয়েছে । কিন্তু ‘ জাতীয়তাবাদ ‘ শব্দটি একই সঙ্গে বিকৃত ও প্রকৃত জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যুক্ত । প্রকৃত জাতীয়তাবাদ হল মানব মুক্তির অগ্রদূত । এর পক্ষে যুক্তিগুলি হল— 

মহান আদর্শ : 

এক মহান আদর্শ রূপে সমগ্র জাতিকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে প্রকৃত জাতীয়তাবাদ দেশের জন্য আত্মত্যাগ করতে অনুপ্রেরণা জোগায় । জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরাধীন জাতিগুলি মুক্তির জন্য আমরণ সংগ্রামে অনুপ্রাণিত হয় । ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে উৎখাত করার জন্য ভারতবাসীরা জাতীয়তাবাদী আদর্শে দীক্ষিত হয়েছিলেন । 

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সহায়ক : 

ইউরোপে নবজাগরণের কালে যে জাতীয়তাবাদের জন্ম তা পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ফরাসি বিপ্লবসহ পৃথিবীর বহু দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হয় । 

সম্প্রীতির প্রতীক :

প্রকৃত জাতীয়তাবাদের মূল মন্ত্র হল — নিজে বাঁচো এবং অপরকে বাঁচতে দাও ( Live and let live ) । জাতীয়তাবাদ বিভিন্ন জাতির কাছে সংঘর্ষ ও সংঘাতের বদলে সহযোগিতা ও সম্প্রীতির বাণী পৌঁছে দেয় । 

মানব সভ্যতার বিকাশে সহায়ক :

জাতীয়তাবাদের জনক ইতালির ম্যাৎসিনির মতে , আদর্শ জাতীয়তাবাদ পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির অন্তর্নিহিত গুণাবলির বিকাশ ঘটিয়ে মানব সভ্যতাকে সমৃদ্ধ ও বিকশিত হতে সাহায্য করে । 

স্থায়িত্ব ও শান্তির সহায়ক :

জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ জনসমাজ স্বশাসন প্রতিষ্ঠা করায় শাসক ও শাসিতের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে । জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষ , হানাহানি , অবিশ্বাস ইত্যাদি না থাকায় দেশের শাসন ব্যবস্থায় স্থায়িত্ব আসে এবং শান্তির অনুকূল পরিবেশ গড়ে ওঠে ।

যুদ্ধের সম্ভাবনা হ্রাসকারী :

আদর্শ জাতীয়তাবাদ পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির মধ্যে যে সহযোগিতা ও সৌভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে , তার ফলে জাতিগুলির মধ্যে পারস্পরিক বৈরী মনোভাব বিনষ্ট হয় । সেই কারণে যুদ্ধ বা যুদ্ধ সংক্রান্ত আশঙ্কা দূর হয় । 

আন্তর্জাতিকতাবাদের সোপান : 

জিমার্নের মতে , জাতীয়তাবাদ হল আন্তর্জাতিকতাবাদে পৌঁছোনোর এক প্রশস্ত সরণি । বর্তমান বিশ্বে প্রতিটি রাষ্ট্র ” নিজে বাঁচো এবং অপরকে বাঁচতে দাও ‘ এই জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে যে পারস্পরিক সদ্ভাব ও মৈত্রীর বাতাবরণ গড়ে তোলে তার ফলে আন্তর্জাতিকতার পথ প্রশস্ত হয় ।

জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে যুক্তি

জাতীয়তাবাদ ‘ শব্দটি একই সঙ্গে প্রকৃত ও বিকৃত জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যুক্ত । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার হিটলারের জার্মানি হল উগ্র বা বিকৃত জাতীয়তাবাদের একটি দৃষ্টান্ত । হায়েসের মতে , উগ্র জাতীয়তাবাদ হল চরম অন্যায় ও অকল্যাণের প্রধান উৎস । রবীন্দ্রনাথ এই ধরনের জাতীয়তাবাদকে মানব সভ্যতার শত্রুরূপে চিহ্নিত করেছিলেন । এর বিপক্ষে যুক্তিগুলি হল— 

সাম্রাজ্যবাদের জনক : 

বিকৃত জাতীয়তাবাদকে সাম্রাজ্যবাদের জনকরূপে অভিহিত করা হয় । ঊনবিংশ শতাব্দীতে এক সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী উন্মাদনায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি এশিয়া , আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার তথা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারে সচেষ্ট হয়েছিল । 

জাতি বিদ্বেষের জনক : 

বিকৃত জাতীয়তাবাদের প্রবক্তারা শুধুমাত্র নিজের জাতিকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেন । অন্য জাতির কৃষ্টি ও সভ্যতার প্রতি ঘৃণার মনোভাব জাতি বিদ্বেষের জন্ম দেয় । 

সুস্থ সংস্কৃতির পরিপন্থী : 

বিকৃত বা উগ্র জাতীয়তাবাদ সর্বদা নিজের সংস্কৃতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে করে , এমনকি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য তাঁরা অপরের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না । 

গণতন্ত্র হত্যাকারী : 

বিকৃত জাতীয়তাবাদীদের শাসনকালে কোনো বিরোধী পক্ষকে জীবিত রাখা হয় না । যাবতীয় বিরোধিতাকে কঠোর হস্তে দমন করা হয় , বিরোধীকণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া হয় । 

সাংস্কৃতিক স্থবিরতার জন্মদাতা : 

বিকৃত জাতীয়তাবাদের ফলে জাতীয় রাষ্ট্র অন্যান্য জাতির উন্নত সংস্কৃতির কাছ থেকে যা কিছু শিক্ষণীয় বস্তু তা সব বিসর্জন দেয় । এই উন্নাসিক মানসিকতার ফলে একটি জাতি সাংস্কৃতিক স্থবিরতার শিকার হয় । 

বিশ্ব শান্তির বিরোধী : 

বিকৃত জাতীয়তাবাদের জনক মুসোলিনী বিশ্ব শান্তির প্রচেষ্টাকে ‘ কাপুরুষের স্বপ্ন ’ বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন । বিংশ শতাব্দীতে যে দুটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয় তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় , দুটি যুদ্ধেই বিকৃত জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন । 

আন্তর্জাতিকতার বিরোধী : 

মার্কসবাদী চিন্তাবিদদের মতে , জাতীয়তাবাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন চেহারায় আবির্ভূত হয়ে শুধুমাত্র শোষকশ্রেণির স্বার্থের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে । এ ধরনের সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের সোপান বেয়ে কখনোই আন্তর্জাতিকতার প্রশস্ত আঙিনায় পৌঁছোনো যায় না । 

উপসংহার 

পরিশেষে উল্লেখ করা যেতে পারে যে , আদর্শ হিসেবে জাতীয়তাবাদ সব সময়ই মানব কল্যাণের অগ্রদূত । সবধরনের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত যুক্তিনির্ভর প্রকৃত জাতীয়তাবাদ মানবজাতির সার্বিক উন্নয়নের পক্ষে খুবই প্রয়োজনীয় । কিন্তু এই জাতীয়তাবাদই যখন সংকীর্ণ বা আগ্রাসী চেহারায় হাজির হয় তখন তা সমগ্র মানব সভ্যতার পক্ষেই বিপদ হয়ে দাঁড়ায় । 

জাতীয়তাবাদ বিকৃত রূপ ধারণ করলে মানব কল্যাণের পথ রুদ্ধ হয় , বিশ্ব শান্তি বিনষ্ট হয় । এই ধরনের বিকৃত জাতীয়তাবাদকে নিঃসন্দেহে মানব সভ্যতার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা যায় । বস্তুত , জাতীয়তাবাদ কীভাবে ব্যবহৃত হবে তার ওপরেই নির্ভর করে তার কল্যাণকর-অকল্যাণকর ভূমিকা ।

error: Content is protected !!