প্রাণীদের শ্বসন অঙ্গ বা শ্বসন পদ্ধতি

প্রাণীদের শ্বসন অঙ্গ বা শ্বসন পদ্ধতি

বৈচিত্রময় পরিবেশে প্রাণীদের শ্বাসযন্ত্র যেমন আলাদা তেমনি শ্বসন পদ্ধতিও আলাদা । সরল থেকে জটিল বিভিন্ন ধরনের শ্বসন কৌশল পরিলক্ষিত হয় । গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শ্বসন পদ্ধতির উল্লেখ করা হল ।

দেহতল 

জলজ পরিবেশ বা অন্য কোনো তরল মাধ্যমে বসবাসকারী প্রাণী শ্বসনের জন্য তরলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের উপর নির্ভরশীল । এরা দেহতল অর্থাৎ কোশ আবরণীর মাধ্যমে । ব্যাপন প্রক্রিয়ার সাহায্যে তরলে দ্রবীভূত অক্সিজেন শ্বসন প্রক্রিয়ার জন্য গ্রহণ করে এবং শ্বসন বস্তুর জারণের ফলে উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইডকে একই পদ্ধতিতে পরিবেশে নির্গত করে । উদা : অ্যামিবা , প্যারামেসিয়াম । হাইড্রা , স্পঞ্জ প্রভৃতি বহুকোশি প্রাণী দেহপ্রকারের মাধ্যমে ব্যাপন প্রক্রিয়ার সাহায্যে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করে । 

ত্বক

কেঁচো , জোঁক প্রভৃতি বহুকোষী প্রাণী রক্তজালক পূর্ণ সিক্ত দেহত্বকের সাহায্যে ব্যাপন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবেশ থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে । এই অক্সিজেন শ্বাসরঞ্জক হিমোসায়ানিনের মাধ্যমে বিভিন্ন কলাকোশে পৌঁছোয় । কলাকোশে শ্বসনবস্তুর জারণের ফলে উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইড একইভাবে পরিবেশে নির্গত হয় । ব্যাঙ মূলত শীত ঘুমে থাকার সময় রক্তজালক পূর্ণ সিক্ত ত্বকের সাহায্যে পরিবেশ থেকে অক্সিজেন ব্যাপন প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করে এবং শ্বসন জাত কার্বন ডাই অক্সাইড একইভাবে পরিবেশে ত্যাগ করে । 

ফুলকা 

মাছ , জলজ শামুক , চিংড়ি , কাঁকড়া , ব্যাঙাচি প্রভৃতি বহু জলজ প্রাণীর শ্বাস অঙ্গ ফুলকা । ফুলকা রক্তজালক পূর্ণ এবং ব্যাপনক্ষম , তাই এই সকল জলজ প্রাণী ফুলকার সাহায্যে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং শ্বসন প্রক্রিয়ায় উদ্ভূত কার্বন ডাই অক্সাইড একইভাবে পরিবেশে ত্যাগ করে । অবস্থানের উপর নির্ভর করে ফুলকা দুপ্রকার— ( i ) বহিঃফুলকা , ( ii ) অন্তঃফুলকা । 

( i ) বহিঃফুলকা : প্রাণীদেহের বাইরে উন্মুক্ত ফুলকাকে বহিঃফুলকা বলে । যেমন — ব্যাঙাচির মাথার দুধারে বাইরে উন্মুক্ত ফুলকা । 

( ii ) অন্তঃফুলকা : প্রাণীদেহের নির্দিষ্ট প্রকোষ্ঠে অবস্থিত মাছের গলবিলের দুধারে ফুলকাকে অন্তঃফুলকা বলে । যেমন নির্দিষ্ট প্রকোষ্টে অবস্থিত ফুলকা । 

অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্র 

কই , মাগুর , শিঙি , শোল প্রভৃতি জিয়োল মাছের দেহে ফুলকা ছাড়াও আরও এক প্রকার শ্বাসযন্ত্র থাকে , এই শ্বাসযন্ত্রকে অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্র বলে । শিঙি মাছের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্রটি নলাকৃতি এবং ফুলকার পিছনে দেহকাণ্ডের উভয় পার্শ্বে অবস্থিত । মাগুর মাছের বৃক্ষের ন্যায় আকারের অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্রটি ফুলকার কাছে অবস্থান করে । এর অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্রকে শ্বাসবৃক্ষ বলে । কই মাছের গোলাপ ফুলের মতো অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্র মাথার দুধারে ফুলকার উপরে অবস্থিত । এই অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্রের সাহায্যে জিয়োল মাছ বায়ু থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে । সেইজন্য এরা স্থলেও অনেকক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে । 

শ্বাসনালি 

সন্ধিপদ পর্বের অন্তর্ভুক্ত পতঙ্গ শ্রেণির প্রাণীদের শ্বাসঅঙ্গ হল শ্বাসনালি । বড়ো শ্বাসনালি ক্রমান্বয়ে শাখান্বিত হয়ে সমগ্র দেহে জালকের ন্যায় বিস্তৃত থাকে । শ্বাসনালিগুলি দেহের দুপাশে অবস্থিত মোট দশজোড়া শ্বাসছিদ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকে । নির্দিষ্ট পেশির সাহায্যে পতঙ্গশ্রেণির প্রাণীদের বক্ষ এবং উদর খণ্ডকগুলির ক্রমাগত নড়াচড়ার ফলে বায়ু থেকে অক্সিজেন শ্বাসছিদ্রের মাধ্যমে শ্বাসনালিতে প্রবেশ করে এরপর এই অক্সিজেন শাখা শ্বাসনালি এবং শ্বাসনালির জালকের মাধ্যমে আন্তঃকোশান্তর স্থানে পৌঁছায় । ওই স্থান থেকে কলা কোশ দ্বারা ব্যাপন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অক্সিজেন গৃহীত হয় এবং কার্বন ডাই অক্সাইড পরিত্যক্ত হয় । এরপর কার্বন ডাই অক্সাইড সমৃদ্ধ বায়ু শ্বাসনালি দিয়ে শ্বাসছিদ্রের মাধ্যমে দেহের বাইরে নির্গত হয় । 

ফুসফুস 

মেরুদণ্ডী পর্বের উভচর থেকে স্তন্যপায়ী শ্রেণির প্রাণীর প্রধান শ্বাসঅঙ্গ ফুসফুস । এই সকল প্রাণীর বক্ষঃগহ্বরে অনেকটা থলির মতো দেখতে এবং স্পঞ্জের মতো দুটি ফুসফুস থাকে । গলবিলের প্রাচীর ভেতরের দিকে বৃদ্ধি পেয়ে ফুসফুস গঠন করে । ফুসফুসের আবরণকে প্লুরা ধলে । 

প্লুরা দুটি আবরণ দ্বারা গঠিত । বাইরের আবরণকে প্যারাইটাল স্তর এবং ভিতরের আবরণকে ভিসেরাল স্তর বলে । স্তরদুটির মাঝে একপ্রকার তরল পদার্থ থাকে যা ফুসফুসকে ঘর্ষণজনিত আঘাত থেকে রক্ষা করে । ফুসফুসের ভিতরের পর্দা ভাঁজ যুক্ত হয়ে অসংখ্য ছোটো ছোটো বায়ু প্রকোষ্ট বা অ্যালভিওলাস ( বহুবচনে – অ্যালভিওলাই ) গঠন করে । এই বায়ু প্রকোষ্ট বা বায়ুথলিগুলির প্রাচীরে অসংখ্য রক্তজালক থাকে । বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন সমৃদ্ধ বায়ু আনুষঙ্গিক শ্বাসঅঙ্গের মাধ্যমে প্রশ্বাস প্রক্রিয়ায় যেমন — মানুষের ক্ষেত্রে বহিঃনাসারন্ধ্র , নাসাপথ , অন্তঃনাসারন্ধ্র , মুখবিবর , গলবিল , গ্লটিস , ল্যারিংক্স , ট্রাকিয়া , ব্রঙ্কাস এবং ব্রঙ্কিওলের মাধ্যমে ফুসফুসের বায়ুথলিতে প্রবেশ করে । 

এখানে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় বায়ুস্থলির বায়ু এবং রক্তজালকের রক্তের মধ্যে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইডের আদান প্রদান হয় । অর্থাৎ রক্ত থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুস্থলির বায়ুর সঙ্গে মেশে এবং বায়ুস্থলির বায়ু থেকে অক্সিজেন রক্তে মেশে । এরপর নিঃশ্বাস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুস্থলির বায়ু বিপরীত পথে অর্থাৎ ব্রঙ্কিওল , ব্রঙ্কাস , ট্রাকিয়া , ল্যারিংক্স , গ্লটিস , গলবিল , মুখবিবর , অন্তঃনাসারন্ধ্র , নাসাপথ এবং বহিঃনাসারন্ধ্র হয়ে দেহের বাইরে নির্গত হয় ।

আরো পড়ুন : মানুষের শ্বসন প্রক্রিয়া

শ্বসন কাকে বলে

মানুষের শ্বাসতন্ত্র

error: Content is protected !!