নৈরাজ্যবাদ

নৈরাজ্যবাদ

ঊনবিংশ শতকের ভাবজাগতিক বিপ্লবের অংশীদার হিসেবে নৈরাজ্যবাদী দর্শন ( Anarchism ) ও একটা স্থান করে নিয়েছে । ইতিহাসগত ভাবে ‘ নৈরাজ্য ’ শব্দের অর্থ প্রচলিত শাসন , আইন ও কর্তৃপক্ষকে অস্বীকার । সেই নৈরাজ্যবাদী যে কর্তৃপক্ষকে অস্বীকার করে । তবে নৈরাজ্যবাদের স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নির্দেশ করা কঠিন । কারণ এই ধারার প্রবক্তাগণ কোন বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বক্তব্য রাখেননি । এঁদের বক্তব্য মিলের থেকে অমিলই বেশী । 

কোকার ( Kokar ) এর মতে , “ নৈরাজ্যবাদ কেবল রাষ্ট্রের বিরোধী নয় । এই মতাদর্শে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও অপ্রয়োজনীয় বলে স্বীকৃত । ” 

উক নৈরাজ্যবাদ বলতে নেতিবাচক আদর্শের সাথে কিছু ইতিবাচক আদর্শের কথা বলেছেন । তাঁর ভাষায় , “ ইতিহাসগতভাবে নৈরাজ্যবাদী দর্শনে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার সমালোচনা করা হয় এবং কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ সমাজের স্বপ্ন দেখা হয় । এই দর্শনের মূল লক্ষ্য হল সামাজিক ক্রম পরিবর্তন এবং বর্তমান কাজ হল সমাজ ব্যবস্থার সমালোচনা । ” তিনি নৈরাজ্যবাদ বলতে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার অবসানের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ও উন্নততর সমাজব্যবস্থার পত্তনের কথা বলেছেন । 

নৈরাজ্যবাদের উদ্ভব ও বিকাশ

প্রুধোঁ :

ফরাসী চিন্তাবিদ প্রুধোঁ ( ১৮০৯ – ‘৬৫ খ্রীঃ ) ই প্রথম নিজেকে ‘ নৈরাজ্যবাদী ’ বলে ঘোষণা করেন । তিনি রাষ্ট্র চার্চ , ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পুঁজিবাদের ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নতুন সমাজ গঠনের তত্ত্ব প্রচার করেন । তাঁর মতে , রাষ্ট্র হল বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী এমন একটি সংগঠন যার প্রধান লক্ষ্য হল ব্যক্তি স্বাধীনতার কণ্ঠ রোধ করা ও তার স্বাভাবিক বিকাশের পথে দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর খাড়া করে রাখা । ” What is property ” নামক গ্রন্থ রচনা করে তিনি বলেন , সম্পত্তি হল চুরি করা সম্পদ । তাঁর মতে , সমাজে রাষ্ট্র বা চার্চের কোন ভূমিকা থাকবে না । আদর্শ সমাজ গড়ে উঠবে মানুষের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে । উৎপাদন ও বণ্টন নিয়ন্ত্রিত হবে সংঘের মাধ্যমে । 

বাকুনিন : 

রুশ চিন্তাবিদ বাকুনিন ( ১৮১৪ – ১৮৭৬ খ্ৰীঃ ) ছিলেন কূটনীতিবিদের সন্তান । একাধিকবার তিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং ছাড়া পেয়ে যান । প্রুধোঁ এবং মার্কসের সাথে তাঁর বন্ধুত্বও ছিল । নৈরাজ্যবাদের তিনিই ছিলেন প্রধান প্রবক্তা । তিনি ছিলেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ঘোরতর বিরোধী । 

তাঁর মতে , যে কোন রকম প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিস্বার্থের প্রতিকূল । তাই ব্যক্তিত্বের বিকাশের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন রাষ্ট্র এবং অন্যান্য সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অবসান । এজন্য চাই সামাজিক বিপ্লব । এই বিপ্লব অহিংস হবে , নাকি হিংসাত্মক হবে , তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির উপর । পরিবর্তন আনার জন্য তিনি ব্যক্তি হত্যা বা সম্পত্তি ধ্বংসতেও পিছপা ছিলেন না । এই কারণে অনেকে তাঁকে ‘ সন্ত্রাসবাদী রাজ্যবাদী ‘ বলে আখ্যায়িত করেছেন । 

তবে রাষ্ট্রের অবসান ঘটলেও সমাজ বা সামাজিক সম্পর্ক থাকবে না , — একথা তিনি বলেননি । সমাজ থাকবে , থাকবে সামাজিক সম্পর্কও , তবে গড়ে উঠবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং তা এগিয়ে চলবে নিজের গতিতে । সেই সমাজ বা সম্পর্কের উপর রাষ্ট্র বা কোন সংগঠনের কোনরূপ নিয়ন্ত্রণ থাকবে না । অর্থাৎ সমাজ হবে শাসনহীন ও শোষণহীন । এখানে ব্যক্তি মালিকানা থাকবে না । সবাই কাজ করবে সাধ্যমত এবং নিজের যা প্রয়োজন তা পাবে সমাজের কাছ থেকে ।

মার্কসবাদ ও নৈরাজ্যবাদ 

মার্কসবাদী পণ্ডিতেরা নৈরাজ্যবাদকে আদৌ প্রগতিমূলক কোন মতাদর্শ বলে মনে করেন না । বস্তুত নৈরাজ্যবাদীরা সব সময়েই অতীতের আদর্শ সমাজ ও ভবিষ্যতের আদর্শ সমাজের কল্পনার ছবি এঁকেছেন । বাস্তবতার সাথে তার মিল সামান্যই । অতীতের নিরাপত্তাহীনতা থেকে মুক্তির জন্যই রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে , অথচ নৈরাজ্যবাদীরা সেই রাষ্ট্রের অবসানের মধ্যেই ভবিষ্যৎ মুক্তির পথ অনুসন্ধান করেছেন । 

আপাতদৃষ্টিতে মার্কসবাদ ও নৈরাজ্যবাদকে সম আদর্শের অনুসারী মনে হয় । কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায় , এদের মধ্যে প্রভেদ অনেক । মার্কসবাদে মনে করা হয় ‘ পুঁজি ’ সমস্ত পাপ ও অত্যাচারের সূত্র । তাই তাঁরা পুঁজিবাদের অবসান আবশ্যিক মনে করেন । কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা ‘ পুঁজি ’ কে বিপজ্জনক বলে মনে করেন না কিংবা পুঁজিবাদের অবসান কামনা করেন না । 

মার্কসবাদী মতে , পুঁজিবাদ অব্যাহত রাখার জন্য রাষ্ট্র শোষক যন্ত্রে পরিণত হয়েছে । কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা মনে করেন , রাষ্ট্র থেকেই পুঁজিবাদের জন্ম ; তাই রাষ্ট্র ধ্বংস হলে পুঁজিবাদ আপনা থেকেই ধ্বংস হয়ে যাবে । 

নৈরাজ্যবাদের গুরুত্ব

বস্তুত নৈরাজ্যবাদের মধ্যে অবাস্তব ধারণার প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায় । রাষ্ট্র ধ্বংস হলে সামাজিক বিরোধকে নিষ্পত্তি করবে , এ প্রসঙ্গে তাঁরা নীরব । তাঁদের রাষ্ট্র কর্তৃত্বের অবসান তত্ত্ব প্রচারিত হওয়ার একশ বছর পরেও রাষ্ট্র টিকে আছে । ইতিমধ্যে আন্দোলন হয়েছে , যা রাষ্ট্রকে আরও সুসংহত , সুদৃঢ় করেছে , কিন্তু ধ্বংস করেনি । 

তাই বলা যায় , জনমনে নৈরাজ্যবাদের কোন প্রভাব পড়েনি । সমাজবাদের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় , এই মতবাদ শোষণ মুক্তি সমাজের কল্পনা করে সমাজবাদী আদর্শকে , সামান্যভাবে হলেও , পরিপুষ্ট করেছে এবং এইটুকুই এর সাফল্য । 

আরো পড়ুন : সমাজতন্ত্রবাদ কি

প্যারি কমিউন এর তাৎপর্য আলোচনা করো

error: Content is protected !!