রোমান্টিকতাবাদ বা রোমান্টিসিজম

রোমান্টিকতাবাদ বা রোমান্টিসিজম

অষ্টাদশ শতকের শেষ থেকে ঊনবিংশ শতকের শেষ পর্যন্ত সময়কে ইউরোপের ‘ রোমান্টিকতার যুগ ‘ বলা হয়ে থাকে । ‘ রোমাণ্টিকতাবাদ ’ বলতে ঠিক কি বোঝায় তা নিয়ে বিতর্ক আছে । সাধারণভাবে মনে করা হয় অষ্টাদশ শতকের যুক্তিবাদ ও ক্লাসিকবাদের ( Classic ) বিরোধী ধ্যানধারণা বা ভাবপ্রবণতাই হল ‘ রোমান্টিকতাবাদ ’ বা ‘ রোমান্টিসিজম ‘  । 

এই রোমান্টিকতার প্রভাব সবথেকে বেশী পড়ে সাহিত্যে । এছাড়া সঙ্গীত , শিল্প , বিজ্ঞান সবকিছুর উপরেই এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয় । এই রোমান্টিকতাবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে , জীবনের যে কোন সুন্দর দিক নিয়ে সাহিত্য ও শিল্প সৃষ্টি । এই সৃষ্টি কেবলমাত্র ক্লাসিক ধ্যান ধারণার দ্বারা আবদ্ধ থাকবে না । এই যুগের শিল্পীরা কেবল ‘ শিল্পের জন্যই শিল্প সৃষ্টি ‘ র ( Arts for arts sake ) সাধনায় মগ্ন হন । যা কিছু সত্য , যা কিছু সুন্দর তাই তাঁদের শিল্প সৃষ্টির বিষয়বস্তু হয় । 

সাহিত্যের উপর রোমান্টিকতার প্রভাব

অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে যেসব রোমাণ্টিক সাহিত্য সৃষ্টি হয় তার মধ্যে টমাস গ্রের ব্যালাড , জেমস ম্যাকফারসনের ওশিয়ান কাব্য , গ্যেটের সরোজ অফ ওয়ার্থর ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । তবে পরের শতকে অর্থাৎ ঊনবিংশ শতকেই রোমান্টিকতার বিকাশের প্রধান সময় বলা যায় । 

ফরাসী বিপ্লব জনিত অস্থিরতা ও সন্ত্রাসের ভয়াবহতা এ যুগের বুদ্ধিজীবীগণকে যুক্তিবাদের পরিবর্তে ভাবপ্রবণতার দিকে আকৃষ্ট করে ও তাঁরা রোমান্টিক সাহিত্য রচনা শুরু করেন । তাছাড়া তৎকালীন দার্শনিকগণ , যথা— হেগেল , বেন্থাম প্রমুখ দার্শনিক তাঁদের রচনার মাধ্যমে মানুষেরা স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকাকে , তাদের আশা আকাঙ্ক্ষার ধারণাকে প্রকাশ করেন । এ যুগের সাহিত্যে দেশপ্রেম , জাতীয় চেতনা , জাতীয় ঐতিহ্যবোধ ইত্যাদিও বিশিষ্ট স্থান নেয় । 

ইংরেজী সাহিত্যে ইংরেজ কবি কোলরিজ ওয়ার্ডসওয়ার্থ , বাইরণ প্রমুখ রোমাণ্টিক সাহিত্যের যে ধারার সূচনা করেন , পরে ব্রাউনিং , টেনিসন সেই ধারা অব্যাহত রাখেন । 

কোলরিজ ও ওয়ার্ডসওয়ার্থের Lyrical Ballads প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানব জীবনের সুন্দর অনুভূতিগুলিকে প্রকাশ করে । শেলী ও কীটস এর কবিতার মূল উপপাদ্য ছিল রোমান্টিকতা । টেনিসনের কবিতায় ছিল দেশপ্রেম । ডিকেন্সের উপন্যাসগুলি সাধারণ মানুষের জীবনের সুখ দুঃখ , ব্যথা বেদনাকে প্রকাশ করে । তাঁর A Tale of Two Cities ফরাসী বিপ্লবের ভয়াবহ চিত্রকে ফুটিয়ে তোলে । রুডইয়ার্ড কিপলিং এর রচনায় দুঃসাহসিক অভিযানের বর্ণনা পাওয়া যায় । 

এছাড়া স্যার ওয়াল্টার স্কট , রবার্ট লুই , স্টিভেনসন প্রমুখের রচনাতেও ভাবপ্রবণতার প্রকাশ দেখা যায় । ফরাসী সাহিত্যিক আলেকজান্ডার ডুমা এর রচনায় রোমান্টিকতার প্রভাব দেখা যায় । তাঁর রচিত উপন্যাসগুলির মধ্যে বিখ্যাত হল ‘ থ্রি মাসকেটিয়ার্স ‘ , লা মেজারেবলস এর রচয়িতা ‘ হিউম্যান কমিডির ’ রচয়িতা বালজাক , ‘ মেডিটেশন ’ এর রচয়িতা আলফানসো লামার্টিন প্রমুখ সাহিত্যিক । রাশিয়ার সাহিত্যিকগণও রোমান্টিক সাহিত্য রচনায় অগ্রসর হন । এ বিষয়ে পুস্কিনের পরবর্তী ছিলেন তুর্গেনিভ , ডস্টয়েভস্কি প্রমুখ । 

সঙ্গীতের উপর রোমান্টিকতার প্রভাব 

রোমান্টিক ধ্যান ধারণা এ যুগের সঙ্গীতকেও প্রভাবিত করে । এই প্রসঙ্গে হেস বলেছেন , “ Music during the era from 1830 to 1878 was the most throughly romantic of all arts . ” সর্বকালের বিখ্যাত সুরস্রষ্টা লুইউইগ বিটোফেন তাঁর সাতটি সিম্ফনি রচনা করেন । ইনি ছিলেন জাতিতে জার্মান । জার্মানীর অপর সঙ্গীতজ্ঞ সুবার্ট কে ‘ সঙ্গীতের জনক ‘ আখ্যা দেওয়া হয়েছে । মেণ্ডেলসন ও ওয়েবার তাঁদের গীতিকাব্যে মাধুর্যে সকলকে আপ্লুত করেন । জার্মান সুরকার শুম্যান রচিত সিম্ফনিগুলি সঙ্গীতের ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে । জার্মান জাতীয়তাবাদের উন্মেষে সুরকার ভাগনার এর অবদান উল্লেখযোগ্য । 

এছাড়া এ যুগের অন্যান্য বিখ্যাত সুরকারগণ হলেন ইতালীর রোশিনি , বেল্লিনি ও দোনিজেত্তি , পোল্যাণ্ডের ফ্রেডারিক সোপিন , ফ্রান্সের শোপাঁ প্রমুখ । রোমান্টিকতার প্রভাবে এ সময়ে ইউরোপের প্রায় সকল দেশেই জাতীয় সঙ্গীত রচিত হয়েছিল ও লৌকিক সঙ্গীতগুলি পুনরায় লোকপ্রিয় হয়ে উঠেছিল । 

শিল্পের উপর রোমান্টিকতার প্রভাব 

রোমান্টিকতার প্রভাবে এ যুগের চিত্রশিল্পীরা তাঁদের সহজাত আবেগকে রূপ দিতে থাকেন । সহজ সরলভাবে অঙ্কিত চিত্রের মধ্যে দিয়ে তাঁরা তাঁদের কল্পনাকে প্রকাশ করতে থাকেন । শিল্পের বিষয়বস্তুও নির্বাচন করতে থাকেন তাঁরা নিজেরাই । শিল্পের মধ্যে দিয়ে শিল্পীর নিজস্ব সত্তাই বিকশিত হতে থাকে । 

যেমন , স্পেনীয়দের জীবনধারার বিভিন্ন দিক ফুটে ওঠে শিল্পী গেয়ার অঙ্কিত চিত্রের মধ্য দিয়ে । ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধের চিত্রশিল্পী ছিলেন ডোরিকল ও ডেলাক্রয় । তাঁদের সর্ববিখ্যাত চিত্র ছিল ‘ The Raft of the Medusa ‘ . এছাড়া ‘ Wounded Soldier in a car ‘ অথবা ‘ The Return from Rusia ‘ ইত্যাদি চিত্রে নেপোলিয়নের সময়ের বিভিন্ন ঘটনা উদ্ভাসিত হয়েছে । 

ডেলাক্রয়ে অঙ্কিত ‘ সিওর হত্যাকাণ্ড ’ চিত্রটি বিখ্যাত । চিত্রটিতে গ্রীকদের দেশপ্রেমের নিখুঁত অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে । এ যুগের অন্যান্য চিত্রশিল্পীদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন ফরাসী শিল্পী করোট , ইংরেজ শিল্পী কনস্টেবল ও টানার , বার্ন জেরিনস , রসোটি , হাস্ট প্রমুখ । 

সাহিত্যের মত রোমান্টিকতার প্রভাব স্থাপত্য শিল্পে ছিল না । সাধারণভাবে গ্রথিক রীতির প্রয়োগকে স্থাপত্যে রোমান্টিকতার স্পর্শ বলে মনে করা হয় । ইংল্যাণ্ড ফ্রান্সে গ্রথিক স্থাপত্যরীতির নয়নমুগ্ধকর প্রয়োগ দেখা যায় । ইংল্যাণ্ডের গথিক রীতির আদি প্রবক্তা ছিলেন অগাস্টাস বুগিস । বিশ্বখ্যাত উইণ্ডসর রাজপ্রাসাদে এই রীতির সুষম প্রয়োগ দেখা যায় । ফ্রান্সে গথিক রীতির প্রয়োগ করেন প্রখ্যাত স্থপতি ভায়োলেট লে ডুক । প্যারিসের ‘ নেতারডম ’ প্রাসাদে গথিক রীতির প্রয়োগ দেখা যায় । এছাড়া বড় হোটেল , রেলওয়ে স্টেশন বা কিছু বাসগৃহেও গথিক স্থাপত্য রীতির প্রয়োগ ঘটেছিল ।

আরো পড়ুন : ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের কারণ আলোচনা কর

সাহিত্যে নবজাগরণের প্রভাব

error: Content is protected !!