তৃতীয় নেপোলিয়নের পতনের কারণ

তৃতীয় নেপোলিয়নের পতনের কারণ

ফরাসী সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত দ্বিতীয় ফরাসী সাম্রাজ্যের পতন ছিল ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি । এই পতনের জন্য মূলত দায়ী ছিল তৃতীয় নেপোলিয়নের ব্যক্তিগত চরিত্র ও সমসাময়িক ইউরোপীয় রাজনীতির জটিল আবর্ত ।

চরিত্রের ভারসাম্যহীনতা 

নিজ চরিত্রের ভারসাম্যহীনতার মধ্যে তৃতীয় নেপোলিয়নের পতনের কারণ নিহিত ছিল । সমকালীন ঐতিহাসিকদের কয়েকটি উদ্ধৃতি স্মরণ করলেই বোঝা যায় , তাঁর চরিত্র কতখানি ভারসাম্যহীন ছিল । 

ঐতিহাসিক লা গর্সির ( La Gorce ) মতে , “ তিনি ছিলেন ‘ ডন কুইকজোট ও মেকিয়াভেলীর সংমিশ্রণ । ” ডেভিড টমসন এর ভাষায় : “ তিনি ছিলেন সর্বদা স্বপ্নবিলাসী ও অবাস্তববাদী অথচ ষড়যন্ত্রকামী । ” ( ” .. always a dreamer and intrigner rather than a practical statesman ” ) রাইকার বলেছেন , “ তৃতীয় নেপোলিয়নের দূরদৃষ্টির অভাব ছিল , — যা তাঁকে অনেকগুলি ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করতে পারত , তাঁর অন্তর্দৃষ্টির অভাব ছিল যা অন্যের দুর্বলতাজনিত সুবিধাগ্রহণে তাকে বঞ্চিত করেছিল । ”

বাস্তবিকই যেভাবে দেশ চ্যুত অবস্থা থেকে সুযোগের সদ্ব্যবহার দ্বারা তিনি ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আসন দখল করেছিলেন , তা তাঁর অসামান্য বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে । অথচ সম্রাটরূপে তিনি এত বেশী ভ্রান্ত নীতি অনুসরণ করতে থাকেন যে তাঁর পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে । আসলে কোন নিয়মবাঁধা ছকে তাঁর চরিত্র বিকশিত হয়নি । 

‘ দারিদ্র্যের অবসান ‘ গ্রন্থে দরিদ্র মানুষের প্রতি তাঁর যে আন্তরিক সহানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে , তা অতুলনীয় । কিন্তু তাঁর জীবনের বহুলাংশই ছিল উচ্ছৃঙ্খলতায় ভরা । ভিক্টর হুগো তাঁকে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সাথে তুলনা করে ‘ ক্ষুদ্র নেপোলিয়ন ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন । মহারানী ভিক্টোরিয়া বলেছেন , ‘ তিনি ( তৃতীয় নেপোলিয়ন ) ছিলেন একজন অসাধারণ ব্যক্তি । এই পরস্পর বিরোধী মূল্যায়ন ছিল তাঁর চরিত্রের আসল রূপের বহিঃপ্রকাশ । এই বৈপরীত্যই তাঁর পতন ডেকে আনে । 

পরস্পর বিরোধী কার্যক্রম 

যে পরস্পর বিরোধী মানসিকতা ও কার্যক্রম নিয়ে তৃতীয় নেপোলিয়ন সিংহাসনে বসেছিলেন , তাতে তাঁর শাসন প্রলম্বিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না । আন্তরিকভাবে তিনি প্রজাতন্ত্রী ছিলেন না । তাঁর স্বপ্ন ছিল ফরাসী সিংহাসন ও স্বৈরাচারী সম্রাটতন্ত্র । অথচ বিপ্লবী উদারতন্ত্রের একনিষ্ঠ পূজারী হিসেবে তিনি ফরাসী জনগণের সামনে আবির্ভূত হয়েছিলেন । বিপ্লবে বীতশ্রদ্ধ ফরাসীগণ সম্রাট পদে তাঁকে মেনে নিলেও , তার স্থায়িত্ব যে দীর্ঘায়িত হবে না তা নিশ্চিত ছিল । কারণ বহু ত্যাগের অংশীদার ফরাসী জনগণ কখনই স্বৈরতন্ত্রকে দীর্ঘদিন লালন করতে পারবে না । 

ভ্রান্ত বিদেশ নীতি 

উপরিলিখিত বৈপরীত্য থেকেই জন্ম নিয়েছিল তাঁর পরস্পর বিরোধী শান্তি ও যুদ্ধনীতি । তিনি যুদ্ধপ্রিয় ছিলেন না । সিংহাসনে বসেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন ‘ সাম্রাজ্যের অর্থ শান্তি ’। অথচ নেপোলিয়ন বোনাপার্টের বিরামহীন ও গৌরবদীপ্ত পররাষ্ট্র নীতি পুনঃপ্রয়োগের আশা নিয়েই জনগণ তাঁকে সিংহাসনে বসিয়েছিলেন । নেপোলিয়ন বিপ্লবকে অস্বীকার করেই বৈপ্লবিক পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করতে পেরেছিলেন , এবং যুদ্ধ না করেই চেয়েছিলেন ইউরোপের পুনর্গঠন করতে ।

এই আদর্শহীন পররাষ্ট্র নীতির ব্যর্থতা ছিল অবশ্যম্ভাবী । তিনি ইতালীর ঐক্য আন্দোলনকে সমর্থন করতে চেয়ে অস্ট্রিয়ার বিরাগভাজন হয়েছেন , আবার মাঝপথে যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়িয়ে ইতালীবাসী ও স্বদেশবাসীর ঘৃণা কুড়িয়েছেন । 

রাশিয়ার মিত্রতা লাভের জন্য তাঁর চেষ্টার অন্ত ছিল না , অথচ রাশিয়ার পোলিশ বিদ্রোহীদের সাহায্য করতে গিয়ে রাশিয়াকে নিজের শত্রুতে পরিণত করেছেন । প্রাশিয়াকে শ্রেজভিগ-হলস্টিন দখল করতে বলে ডেনমার্ককে শত্রু করেছেন , আবার জার্মান ভূখণ্ড ভোগ করতে চেয়ে প্রাশিয়ার মিত্রতা হারিয়েছেন । এইভাবে দেখা যায় যে , স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা আর উদারতান্ত্রিক প্রয়োজনীয়তার মধ্যে সামঞ্জস্য করতে গিয়ে তিনি বিপর্যয় ডেকে এনেছেন । 

বিসমার্কের আবির্ভাব 

সমসাময়িক রাজনীতিতে বিসমার্কের আবির্ভাব তৃতীয় নেপোলিয়নের পতনের জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিল । বিসমার্ক ছিলেন কূটনীতির জাদুকর । তার বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা ছিল অপরিমেয় । নেপোলিয়ন বিসমার্কের কূটজালে নিজেকে জড়িয়ে বিপদগ্রস্ত হন । স্যাডোয়ার যুদ্ধে তাঁর নিরপেক্ষতা স্যাডানের যুদ্ধে চূড়ান্ত পতনের জন্য অনেকখানি দায়ী ছিল । তৃতীয় নেপোলিয়ন কখনই বুঝতে পারেননি যে , বিসমার্কের সব পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সের বিভাজন । 

রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা 

তদানীন্তন ফ্রান্সের কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থন তাঁর পশ্চাতে ছিল না । তৃতীয় নেপোলিয়ন উদারতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে যে সামঞ্জস্যবিধানের চেষ্টা করেছিলেন , তা ছিল অসম্ভব । ফলে রাজতন্ত্রী বা প্রজাতন্ত্রী কেউই তাঁকে মেনে নিতে পারেনি । শ্রমিকদের উন্নয়নে তাঁর চেষ্টা ছিল , কিন্তু তিনি ছিলেন সমাজতান্ত্রিকদের শত্রু । আবার ধর্মীয় কারণেও ক্যাথলিকরা তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন । 

এইভাবে সর্বক্ষেত্রে নির্বান্ধব অবস্থায় দীর্ঘকাল টিকে থাকা সম্ভব ছিল না । এইভাবে দেখা যায় , নানাবিধ কারণে তৃতীয় নেপোলিয়নের পতন ঘটেছিল ও দ্বিতীয় ফরাসী সাম্রাজ্যের অবসান হয়েছিল । অবশ্য ব্যর্থ হলেও ব্যর্থতার গ্লানি দিয়ে তাঁর চরিত্রকে মুড়ে রাখলে অবিচার করা হবে । আসলে তিনি হয়েছিলেন পরিস্থিতির দাস । জাতীয়তাবাদের বিকাশ ও ইউরোপের পুনর্গঠনে তাঁর বিদেশ নীতির অবদান অনস্বীকার্য ।

আরো পড়ুন : তৃতীয় নেপোলিয়নের অবদান আলোচনা করো

তৃতীয় নেপোলিয়নের অভ্যন্তরীণ সংস্কার গুলি আলোচনা করো

error: Content is protected !!