নারোদনিক আন্দোলন 

নারোদনিক আন্দোলন 

রাশিয়ার সত্তরের দশকে আর একটি বিপ্লবী আন্দোলন বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে । এটি ‘ নারোদনিক আন্দোলন ’ বা ‘ জনতাবাদী আন্দোলন ‘ ( Narodnik of Populism Movement ) নামে সমধিক প্রসিদ্ধ । ষাটের দশকের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী নিহিলিষ্ট আন্দোলন সত্তরের দশকের জনতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে অনেকাংশে মিশে যায় । ফলে হতাশাগ্রস্ত নৈরাজ্যবাদী বিপ্লবীরা একটি রাজনৈতিক , সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি খুঁজে পায় । 

নারোদনিক আন্দোলনের উদ্ভব  

রুশ কৃষকদের দুঃখ দুর্দশা জনতাবাদীদের অভিভূত করে । তারা অনুভব করে যে , ‘ ভূমিদাসদের মুক্তির আইন ‘ ( ১৮৬১ খ্রীঃ ) রুশ কৃষকদের দুরবস্থা দূরীকরণের জন্য যথেষ্ট নয় । অথচ রুশ কৃষকদের কঠোর শ্রমে উৎপাদিত সম্পদ থেকেই সাধারণ মানুষ শিক্ষিত হয়েছে । তাই আজকের বুদ্ধিজীবীদের নৈতিক কর্তব্যই হল , এইসব শোষিত অসহায় কৃষকদের অবস্থার উন্নতি ঘটানো । তাই এদের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কৃষক সম্প্রদায় । বুদ্ধিজীবীদের স্থির বিশ্বাস ছিল নৈতিক বিশুদ্ধতা ও সততার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছে একমাত্র দরিদ্র , মূর্খ ও সহজ সরল গ্রাম্য কৃষকদের মধ্যে । তাই নারোদনিকরা তাদের আন্দোলনকে কৃষক জনতার দরবারে পৌঁছে দিয়ে তাদের ( অর্থাৎ কৃষকদের ) অবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নের সাথে সাথে নিজেরাও ( নারোদনিকরা ) সততা ও বিশুদ্ধতা ফিরে পেতে চেয়েছিল । 

নারোদনিক আন্দোলনের লক্ষ্য 

ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রী আন্দোলনের সাথে ঘনিষ্ঠ পরিচিত থাকলেও নারোদনিক বিপ্লবীরা মার্কসবাদের অনুগামী ছিল না । এরা হার্জেন , বাকুনিন , চেরনিশেভস্কি , লাভরফ প্রমুখের মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল । এদের স্থির বিশ্বাস ছিল রুশ গ্রামীণ কমিউনগুলির মাধ্যমে সরাসরি সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পৌঁছানো সম্ভব হবে । অর্থাৎ পুঁজিবাদকে এড়িয়ে সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে । এ কাজে নারোদনিক বিপ্লবীরা কোনরকম রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি । এদের বিশ্বাস ছিল যে , কৃষক বিপ্লবের আঘাতে পুরাতনতন্ত্র এবং পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে । 

নারোদনিক আন্দোলনের কর্মসূচী 

চরম লক্ষ্যে পৌঁছানোর ব্যাপারে নারোদনিক নেতাদের মধ্যে কৌশলগত মতভেদ ছিল । বাকুনিনের অনুগামীরা মনে করত যে , জনগণ বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত । এখন বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা আন্দোলনের ডাক দিলেই হবে । পক্ষান্তরে , পিটার লাভরফের অনুগামীরা মনে করত , বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্য যথেষ্ট সময় ও শিক্ষার প্রয়োজন । আবার পিটার টকাচেভ বিশ্বাস করতেন , জনসাধারণের উদ্যমের চেয়ে একজন বিপ্লবী নেতার যথার্থ কৌশলই বিপ্লবের সাফল্য এনে দিতে পারে । 

গ্রাম অভিযান :

উপরিলিখিত মতভেদ সত্ত্বেও নারোদনিক বিপ্লবীরা ১৮৭৩ খ্রীষ্টাব্দে ‘ জনতার কাছে যাওয়ার ’ আন্দোলন শুরু করে । কৃষকদের মধ্যে বিপ্লবী আদর্শ প্রচার করে তাদের বিপ্লবমুখী করে তোলার জন্য দলে দলে শিক্ষিত যুবক-যুবতী কৃষকদের পোশাকে সজ্জিত হয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরতে থাকে । জনগণের কাছে যাওয়ার ’ ( going to the people ) — এই নীতির জন্যই এই বিপ্লবীরা ‘ নারোদনিক ’ বা ‘ জনতাবাদী ’ নামে পরিচিতি লাভ করে । ( রুশ শব্দ ‘ নারোদ ’ এর অর্থ জনগণ ) । নারোদনিক বিপ্লববাদীদের এই জনসংযোগ আন্দোলন শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে ১৮৭৪ – এর গ্রীষ্মে । 

নারোদনিক আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ 

প্রাথমিক পর্বে হাজার হাজার মানুষ নারোদনিক বিপ্লবীদের সাথে হাত মেলালেও , তা চরম লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হয় । এর প্রধান কারণ হল , প্রথমত , বিপ্লবীদের কোন সংগঠনগত সংহতি বা কর্মসূচী ছিল না । ফলে আন্দোলন ছিল বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন । দ্বিতীয়ত , কৃষকদের মধ্যে কোন পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না । সমাজ বা শ্রেণীবৈষম্য সম্পর্কেও তারা ছিল সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ও নিস্পৃহ । তাই নারোদনিকদের সমাজতান্ত্রিক আদর্শ কৃষকদের মধ্যে সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয় । এমতাবস্থায় রুশ সরকার দেশব্যাপী দমন পীড়ন নীতি গ্রহণ করলে বিপ্লব খুব সহজেই ঝিমিয়ে পড়ে । 

নতুন সন্ত্রাসবাদ :

অতঃপর নারোদনিক বুদ্ধিজীবীরা কৃষকশ্রেণীর প্রধান চাহিদা , অর্থাৎ জমি ও স্বাধীনতা ভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তুলতে এবং সাধারণ মানুষকে উপযুক্ত ভাবে প্রশিক্ষণ দিতে উদ্যোগী হন । এক গোপন সম্মেলনে ‘ জেমলিয়া-ই-ভলিয়া ” ( অর্থাৎ জমি ও স্বাধীনতা ) নামে একটি গুপ্ত সমিতি গঠন করা হল ( ১৮৭৬ খ্রীঃ ) । সরকারী অত্যাচার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নারোদনিক আন্দোলনও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে লিপ্ত হতে শুরু করে । এইভাবে সন্ত্রাসবাদ উদ্দেশ্যসিদ্ধির উপায়মাত্র না থেকে নিজেই উদ্দেশ্যে পরিণত হয়ে যায় । 

নারোদনিক আন্দোলনের অবসান 

প্রতিষ্ঠার তিন বছরের মধ্যেই ‘ জেমলিয়া-ই-ভলিয়া ‘ দল বিভক্ত হয়ে যায় । সংখ্যা গরিষ্ঠরা গঠন করে ‘ নারদনিয়া ভলিয়া ‘ ( The people’s will বা জনতার ইচ্ছা ) এবং বাকিরা সংগঠিত হয় । ‘ চেরী পেরিডল ’ ( কৃষ্ণ বাঁটোয়ারা ) নামক দলের ছত্রছায়ায় । এদের অধিকাংশই ছিল পূর্বতন নিহিলিষ্ট । নারদনিয়া ভলিয়া খুব দ্রুত সংগঠিত হয়ে জঙ্গী ক্রিয়াকলাপ শুরু করে এবং রাজকর্মচারী হত্যার কর্মসূচী অনুযায়ী একদা তারা জার দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডারকেও হত্যা করে । তবে সরকারের অমানবিক দমন নীতির ফলে শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায় ।

আরো পড়ুন : নিহিলিস্ট আন্দোলন 

ইতালির ঐক্য আন্দোলন

ভারতে বৈপ্লবিক আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ

error: Content is protected !!