জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সংস্কার

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সংস্কার

রাশিয়ার ইতিহাসে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের রাজত্বকাল নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ । প্রধানত , সংস্কারমূলক কাজের জন্যই দ্বিতীয় আলেকজান্ডার রাশিয়া তথা ইউরোপে স্মরণীয় হয়ে আছেন । ছাব্বিশ বছর দীর্ঘ ( ১৮৫৫-৮১ খ্রীঃ ) শাসনকালে আলেকজান্ডার উদার ও গণতান্ত্রিক শাসন প্রবর্তন করে দ্বিতীয় নিকোলাসের শাসনকালীন অনুদার স্বেচ্ছাতন্ত্রের কঠিন বাতাবরণ সরিয়ে রাশিয়ার রাজনৈতিক জীবনে উদারতার ফল্গুধারা বয়াতে সচেষ্ট হয়েছিলেন ।  

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য , দ্বিতীয় আলেকজান্ডারও ছিলেন একজন স্বৈরতন্ত্রী রাজা । উদারতা বা গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর কোন আন্তরিক টান ছিল না । কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করার ক্ষমতা তাঁর ছিল । তিনি বুঝেছিলেন , পিতার অনুদার ও কঠোর শাসননীতি এবং ভূমিদাস প্রথার ব্যাপক প্রচলন রাজ্যের ভিতকে শিথিল করে দিয়েছে । এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ ছিল শাসনরীতির কঠোরতা হ্রাস ও উদারনৈতিক সংস্কারসাধন । 

প্রশাসনিক সংস্কার 

সিংহাসনে বসেই দ্বিতীয় আলেকজান্ডার পিতার আমলে নির্বাসিত ‘ ডিসেমব্রিস্ট ’ বিদ্রোহীদের ফিরে আসার অনুমতি দেন এবং বন্দীদের মুক্তি দেন । বিশ্ববিদ্যালয় ও সংবাদপত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয় । রেলপথ সম্প্রসারিত করা হয় এবং শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নতির বিবিধ ব্যবস্থা নেওয়া হয় । এইভাবে প্রশাসনিক পরিমণ্ডল স্বাভাবিক হয়ে ওঠে । নৈরাজ্যবাদী দার্শনিক ক্রপটকিনের ভাষায় : এর ফলে দেশ যেন সুষুপ্তি এবং পূর্ববর্তী রাজত্বকালের ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠল । 

ভূমিদাস প্রথা বিলোপ 

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সব থেকে উল্লেখযোগ্য সংস্কার কর্ম হল ভূমিদাস প্রথার বিলোপ । রাশিয়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ভূমিদাস প্রথা ছিল অভিশাপের নামান্তর । তা ছাড়া , বিগত অর্ধশতাব্দী কালে রাশিয়ার সমাজ ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের ফলে ভূমিদাস ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাও পাল্টে গিয়েছিল । ভূমিদাসদের ভরণপোষণ আর ভূস্বামীদের কাছে লাভজনক হচ্ছিল না । 

 দেশের অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য ও ভূমিদাসের পরিবর্তে স্বাধীন শ্রমিক ব্যবস্থা বেশী কার্যকর ছিল । কারণ ভূমিদাসদের কর্মপ্রবণতা ও কর্মকুশলতা স্বাধীন শ্রমিকদের থেকে ছিল খুব কম । আবার সামন্ত প্রভুদের ক্রমবর্ধমান অত্যাচারের ফলে ভূমিদাসদের অবস্থাও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল ।  

বস্তুত এরা আর ভূমিদাস ছিল না , পরিণত হয়েছিল ক্রীতদাসে । মালিক প্রয়োজনমত এদের কল-কারখানায় , খনিতে খাটাতে বা ভাড়া দিতে পারতেন । ভূমিদাসদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে । সরকারী নথি উদ্ধৃত করে সেমেভস্কি বলেছেন , “ ১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ৫৫০ টি কৃষক অভ্যুত্থান ঘটেছিল । ” 

এই বৈপ্লবিক পরিস্থিতিও দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে মুক্তির সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল । এই কুপ্রথা বিলোপের জন্য দ্বিতীয় আলেকজান্ডার প্রথম থেকেই সচেষ্ট হন । অভিজাত পরিষদে ব্যক্ত তাঁর অভিমত ছিল , “ নিচুতলা থেকে কবে ভূমিদাস বিলুপ্ত হবে , তার জন্য অপেক্ষা না করে ওপরতলা থেকে তা বিলোপ করাই শ্রেয় । ”  

কিন্তু অভিজাতরা জারের এই উদার আহ্বানে সাড়া দেননি । কিন্তু সব বাধা তুচ্ছ করে আলেকজান্ডার একটি কমিশন গঠন করে । ভূমিদাস প্রথা উচ্ছেদের পরিকল্পনা সুপারিশ পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে লিথুয়ানিয়া প্রদেশের ভূমিদাসদের মুক্ত বলে স্বার্থান্বেষী অভিজাতশ্রেণী এর প্রচণ্ড বিরোধিতা করে । কিন্তু জার আলেকজান্ডার তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন । অতঃপর ১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দের ১৯ শে ফেব্রুয়ারী সারা দেশে ভূমিদাস প্রথার বিলোপসাধন করা হয় । অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে অভিজাতগণ এই আইন মেনে নিতে বাধ্য হন । 

আরো পড়ুন : রাশিয়ার শিল্প বিপ্লব আলোচনা করো

মুক্তিদাতা জার 

নতুন আইন অনুসারে 一

( ১ ) ভূমিদাসরা নাগরিক অধিকার লাভ করল , 

( ২ ) সরকারী ঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সন্তানদের কাছ থেকে কিছু কিছু জমি ক্রয় করে ভূমিদাসদের দেওয়া হল , 

( ৩ ) সামন্ত প্রভুদের কাছ থেকে অধিকৃত ভূমির উপর কৃষকদের ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকৃত হল না এবং 

( ৪ ) ‘ মীর ‘ নামক গ্রাম্য সমবায় সমিতির তত্ত্বাবধানে জমি চাষ আবাদ হবে । এইভাবে রাশিয়াতে দীর্ঘকাল বঞ্চিত ভূমিদাসগণ যৌথভাবে জমির মালিকানা লাভ করে দেশের স্বাধীন নাগরিকে পরিণত হল ।  

এইজন্যই জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে ‘ মুক্তিদাতা জার ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে । 

স্বায়ত্ত শাসন প্রবর্তন 

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের আর একটি উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হল স্বায়ত্ত শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন । এজন্য তিনি ১৮৬৪ খ্রীষ্টাব্দে একটি আইন প্রণয়ন করেন । এই আইন অনুযায়ী প্রতি জেলায় একটি করে ‘ জেমস্টোভো ’ নামক প্রতিনিধি সভা গঠন করা হয় । এগুলির প্রতিনিধি নির্বাচন করত সামন্ত প্রভু , কৃষক ও শহরবাসী জনগণ । জেলা জেমস্টেভো নির্বাচিত করত প্রাদেশিক জেমস্টোভো ।  

এইসব স্থানীয় সভা রাস্তাঘাট উন্নয়ন , প্রাথমিক শিক্ষা , জনস্বাস্থ্য , ব্যবসা বাণিজ্য প্রভৃতি বিষয়ের তত্ত্বাবধান করত । এইভাবে শাসন ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকৃত করে ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে শাসনভার অর্পণ করে দ্বিতীয় আলেকজান্ডার দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন । 

বিচার সংস্কার 

ন্যায় বিচার প্রবর্তনেও দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের প্রচেষ্টা কম ছিল না । ‘ আইনের শাসন ‘ প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে তিনি শাসনবিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করেন । বিচারকদের ভাতা , নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত হয় । সারা দেশে একই ধরনের বিচারব্যস্থা ও জুরীপ্রথার প্রবর্তন করা হয় । 

শিক্ষা সংস্কার 

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রমুখী ও সর্বজনীন করার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় আলেকজান্ডার একাধিক সংস্কার প্রবর্তন করেন । প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘ জেমস্টোভো ’ গুলির উপর । শিক্ষামন্ত্রী গোলাভনিন একটি ‘ বিশ্ববিদ্যালয় বিধি ’ প্রণয়ন করেন ।  

বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আংশিক স্বায়ত্তশাসন স্বীকৃত হয় । অধ্যাপক নিয়োগে অধ্যাপক সমিতির মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয় । মাধ্যমিক শিক্ষা সবার নিকট উন্মুক্ত হয় । ছাত্র ছাত্রীদের জন্য পৃথক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় । তবে মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমে গ্রীক ভাষা ও অঙ্কশাস্ত্রের উপর জোর দেওয়া হয় । কিন্তু বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্ব হ্রাস করা হয় । কারণ জার ( Czar ) স্বয়ং আধুনিক শিক্ষাদানের পক্ষপাতী ছিলেন না । 

শিল্প সংস্কার 

শিল্পোন্নয়নের জন্যও দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের রাজত্বকাল স্মরণীয় । ভূমিদাস প্রথার বিলুপ্তির ফলে শিল্প শ্রমিকদের যোগান বৃদ্ধি পায় । রেলপথ সম্প্রসারিত হওয়ার ফলে বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় । সেই সময়ে বস্ত্রশিল্পের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয় এবং রাশিয়াতে কয়লা ও খনিজ শিল্পের সূচনা ঘটে । 

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সংস্কারের ত্রুটি 

বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রবর্তন করে দ্বিতীয় আলেকজান্ডার রাশিয়াকে মধ্যযুগীয় অন্ধকার থেকে আধুনিক যুগের আলোকে আনতে সচেষ্ট হয়েছিলেন । এজন্য তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় । কিন্তু তাঁর সংস্কার প্রচেষ্টাগুলি ত্রুটিমুক্ত ছিল না , তাই শেষ পর্যন্ত সেগুলি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । 

প্রথমত , ভূমিদাস বিলোপ আইন দ্বারা কৃষকেরা আইনগত স্বাধীনতা পেলেও তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসেনি । সামন্তদের কর্তৃত্বের স্থলে স্থাপিত হয়েছিল ‘ মীর ’ নামক গ্রাম্য সমবায়গুলির একাধিপত্য । তা ছাড়া , ভূমির অধিকার লাভের জন্য কৃষকদের যে ঋণ গ্রহণ করতে হয়েছিল , তা পরিশোধ করতে তাদের প্রাণান্ত হচ্ছিল । তার উপরে ছিল রাষ্ট্রকে প্রদেয় বিভিন্ন কর । অথচ কৃষকদের ভাগ্যে জুটেছিল অনুর্বর ছোট ছোট জমি , যার উৎপাদনক্ষমতা ছিল খুবই কম ।  

এই সংস্কার রুশ কৃষকদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি । রুশ চরমপন্থীরাও এই কাজের মধ্যে কোন মৌলিক পরিবর্তন খুঁজে পায়নি । তাই ভূমিদাস প্রথা বিলোপের অল্পকালের মধ্যে গ্রামাঞ্চলে দুর্দশাগ্রস্ত , হতাশ ও ক্ষুব্ধ কৃষকশ্রেণী বিদ্রোহী আন্দোলন গড়ে তোলে । কোন কোন ঐতিহাসিক এমনও মন্তব্য করেছেন যে , এই সংস্কার কৃষকদের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার উদ্দেশ্যে সরকার ও ভূস্বামীদের গভীর গোপন ষড়যন্ত্রের ফসল ।  

এই বক্তব্যে ঐতিহাসিক নিরপেক্ষতা নেই বলেই অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন । মুক্তির ঘোষণায় কিছু ত্রুটি ছিল ঠিকই , কিন্তু তাই বলে এটিকে ‘ কৃষক বিরোধী ষড়যন্ত্র ’ বলা বা এর নৈতিক মূল্যকে অস্বীকার করা যাবে না । 

দ্বিতীয়ত , জেমস্টোভোগুলির নির্বাচন ব্যবস্থা সর্বজনীন ছিল না । পরন্তু প্রাদেশিক গভর্নরদের সর্বময় কর্তৃত্ব স্বীকৃত হওয়ার ফলে এই স্বায়ত্ত শাসন সংস্কার স্বাধীনতা খর্ব হয়েছিল । তা ছাড়া , সরকারী অনুদানের উপর নির্ভরশীল থাকার ফলে এরা স্বাধীনভাবে পরিকল্পনা রচনা করতে পারত না । 

তৃতীয়ত , দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের বিচার সংস্কারও স্বয়ং সম্পূর্ণ ছিল না । বিচারের ক্ষেত্রে রাজক্ষমতা চূড়ান্ত হওয়ার ফলে বহুক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ বিচার প্রবর্তিত হত না । বহু জুরী ও বিচারক অসৎ হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচন আইন অনুযায়ী তাদের অপসারণ করা সম্ভব ছিল না । তা ছাড়া , সামরিক ও ধর্মীয় আদালত সমূহ চালু থাকার ফলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হচ্ছিল । 

চতুর্থত , জারের আপসমূলক নীতি অনেকের কাছে তাঁর দুর্বলতা বলে মনে হয়েছিল । ফলে পোল্যাণ্ডবাসী বা নিহিলিস্ট নামক উগ্রপন্থীরা বিদ্রোহ ও অভ্যুত্থান সংঘটিত করে শাসন ব্যবস্থাকে ও গৃহীত সংস্কার সমূহকে বানচাল করতে উদ্যোগী হয় । এর পরিণতিতেই জার ক্রমশ স্বৈরতন্ত্রী হয়ে ওঠেন এবং কঠোর হাতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য হন । শেষ পর্যন্ত নিহিলিষ্ট আততায়ীদের হাতেই জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার নিহত হন ( ১৮৮১ খ্রীঃ ) । 

প্রবর্তিত সংস্কার সমূহের দোষ ত্রুটি সত্ত্বেও জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের শুভ প্রচেষ্টা ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে ।

আরো পড়ুন : তৃতীয় নেপোলিয়নের অবদান আলোচনা করো

error: Content is protected !!