পুঁজিবাদ কি

পুঁজিবাদ কি

‘ ধনতন্ত্রবাদ ’ বা ‘ পুঁজিবাদ ’ হল এক বিশেষ ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা । এই ব্যবস্থায় বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্বাধীনভাবে সম্পন্ন হয় । উৎপাদন ও তা বাজারজাত করে মুনাফা অর্জনে রাষ্ট্র কোন ভাবেই হস্তক্ষেপ করে না । 

অর্থনীতিবিদ হেবারনার সোম্বার্ট  ধনতন্ত্রবাদের তিনটি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন , যথা — আগ্রহ , প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক মুক্তি । অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের আগ্রহ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতার ফলে উৎপাদন ও বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় । ব্যয়ের পরিমাণ হ্রাস করে উৎপাদন বৃদ্ধিও ধনতন্ত্রবাদের লক্ষ্য । এজন্য এই মতবাদে বিশ্বাসী প্রতিষ্ঠানসমূহে আধুনিক ও উন্নত দ্রুত উৎপাদনক্ষম যন্ত্রপাতি ও কারিগরি কৌশল আবিষ্কার এবং শ্রমিকশ্রেণীকে ন্যূনতম মজুরি প্রদানের প্রবণতা দেখা যায় । 

মার্কসের মতে , পুঁজি তথা পুঁজিগত সম্পত্তির অবিরাম বৃদ্ধি ধনতন্ত্রের অনিবার্য নিয়ম । তাঁর মতে , ধনতন্ত্রবাদের সারমর্ম হল উৎপাদনকাজে সম্পদশালী বুর্জোয়াশ্রেণী কর্তৃক সম্পত্তিহীন শ্রমিকশ্রেণীর বাধাহীন শোষণ । 

ধনতন্ত্রের বা পুঁজিবাদের উদ্ভব ও বিকাশ

আধুনিক ধনতন্ত্রবাদের উদ্ভব ঘটে ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের পর । অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হয়ে ঊনবিংশ শতকের মধ্যেই শিল্প বিপ্লব ইউরোপের অধিকাংশ দেশে প্রসার লাভ করে । এতকাল যেসব বণিক বাণিজ্যে পুঁজি নিয়োগ করত , তারা এখন শিল্পে পুঁজি নিয়োগ করতে এগিয়ে আসে । দ্রুত উৎপাদনের ফলে শিল্প মালিকদের হাতে প্রভূত সম্পদ জমে ওঠে । এইভাবেই ধনতন্ত্রবাদ বিকাশ লাভ করতে থাকে । উদ্ভব ঘটে পুঁজিবাদী শ্রেণীর । এরা এই নতুন সম্পদ পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে মুনাফার পরিমাণ আরও বাড়াতে থাকে । ধনতন্ত্রবাদের বিকাশে ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশের সরকারগুলির বিশেষ ভূমিকা ছিল । 

প্রথমত , উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থা ছাড়া কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদিত সামগ্রী বাজারজাত করা সম্ভব ছিল না । তাই ইউরোপীয় সরকারগুলি রেলপথ নির্মাণ , রাস্তা নির্মাণ , খাল খনন ইত্যাদির উদ্যোগ নেয় । ১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দে সারা বিশ্বে রেলপথের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ছয় হাজার মাইল । পরবর্তী ত্রিশ বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১৪০ হাজার মাইল । ফরাসী সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন , রুশ জার প্রথম আলেকজাণ্ডার ও নিকোলস , জার্মানীর বিসমার্ক প্রমুখ দ্রুত রেল যোগাযোগ বৃদ্ধি করে ধনতন্ত্রবাদ বিকাশে সাহায্য করেন । 

দ্বিতীয়ত , ইউরোপীয় সরকারগুলি শিল্প সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করে পুঁজিবাদের বিকাশে সহায়তা করে । কোন দেশের দেশজ শিল্প সামগ্রী যাতে উন্নত দেশের শিল্পজাত সস্তা ও উন্নত শিল্পসামগ্রীর সাথে প্রতিযোগিতায় হটে না যায় , তার জন্য সরকারগুলি এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে । এতে বহিরাগত শিল্প সামগ্রীর উপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া হয় । ফলে সেগুলির মূল্য অনেক বেড়ে যায় । এবং তাদের চাহিদা কমে যায় । ফলে দেশের মধ্যে শিল্পসামগ্রীর বিরাট চাহিদা সৃষ্টি হয় । 

তৃতীয়ত , বিভিন্ন সরকার কর্তৃক গৃহীত ‘ Laissez Faire ‘ বা না হস্তক্ষেপ করার নীতি ধনতন্ত্রের বিকাশে যথেষ্ট সাহায্য করে । সরকার যদি উৎপাদিত সামগ্রীর মূল্য নিয়ন্ত্রণ করত , বা মালিক কর্তৃক শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দিতে বাধ্য করত , তাহলে শিল্পে খুশিমত মুনাফার সুযোগ থাকত না । 

কিন্তু শিল্প বিপ্লবের অব্যবহিত পরে ইউরোপীয় সরকারগুলি শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য না হস্তক্ষেপ নীতি গ্রহণ করে । অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ মুক্ত অবাধ উৎপাদন ও বাণিজ্য নীতি গৃহীত হয় । ফ্রান্সে লুই ফিলিপ এই ব্যবস্থার প্রয়োগ করে শিল্পপতিদের অবাধ শোষণ ও অসীম মুনাফার সুযোগ করে দেন । অন্যান্য দেশেও এই ব্যবস্থা গৃহীত হয় । 

চতুর্থত , সরকারগুলি ব্যাঙ্ক লোনের ব্যবস্থা করে , এমনকি বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করে শিল্পে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করে শিল্প বিস্তার তথা ধনতন্ত্রের বিকাশে সাহায্য করে । 

প্রতিযোগিতা যেমন ধনতন্ত্রকে বিকাশ করে , তেমনি প্রতিযোগিতার ফলে বিভিন্ন শিল্পজাত দ্রব্যের মান উন্নয়ন করা আবশ্যিক হয়ে দাঁড়ায় । ফলে মুনাফার পরিমাণ কমে যায় । এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবার জন্য একই ধরনের বিভিন্ন শিল্পকে একত্রিত করে বিরাট একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান গঠনের তোড়জোড় শুরু হয় । ফলে কোন নতুন কোম্পানির পক্ষে এদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে । এমতাবস্থায় এইসব বৃহৎ প্রতিষ্ঠান খুশিমত দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ করে অতিরিক্ত মুনাফা লাভে সক্ষম হয় । ইউরোপের প্রায় সব দেশেই এইরকম একচেটিয়া বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়ে সীমাহীন পুঁজির অধিকারী হতে থাকে । 

পুঁজিবাদের দ্রুত বিকাশের ফলে উৎপাদন এত বৃদ্ধি পায় যে , তা দেশের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশী । পুঁজিবাদের লক্ষ্যই হল অধিক উৎপাদন ও অধিক মুনাফা । কিন্তু উপযুক্ত বাজার সৃষ্টি না হলে অধিক মুনাফা সম্ভব নয় । তা ছাড়া অধিক উৎপাদনের জন্য বেশী পরিমাণ কাঁচামালও দরকার । এই দ্বিবিধ চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনে পুঁজিবাদীরা উপনিবেশ বিস্তারের জন্য নিজ নিজ সরকারের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করতে থাকে । 

ফলে ইংল্যাণ্ড , ফ্রান্স , স্পেন , পর্তুগাল প্রভৃতি দেশ উপনিবেশ দখলের যুদ্ধে লিপ্ত হয় । আমেরিকা , এশিয়া , আফ্রিকা প্রভৃতি মহাদেশগুলিতে এইসব ইউরোপীয় দেশ উপনিবেশ স্থাপন করে । এইসব দেশকে শোষণ করে ইউরোপের ধনতন্ত্র ফেঁপে উঠতে থাকে । শুধু তাই নয় , উপনিবেশ দখলের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলি নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষেও লিপ্ত হয় । মার্কসের মতে , ইউরোপীয় দেশগুলির উপনিবেশ দখলজনিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয় । 

আরো পড়ুন : সমাজতন্ত্রবাদ কি

ধনতন্ত্রবাদ বা পুঁজিবাদের কুফল

ধনতন্ত্রবাদ বা পুঁজিবাদী প্রথার কুফলগুলি সাধারণভাবে স্বীকৃত । 

( ১ ) এই অবস্থায় দেশের সমূহ সম্পদ মুষ্টিমেয় ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর হাতে সঞ্চিত হতে থাকে । সামন্তপ্রথার মত এটিও একটি বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলে । অধিকাংশ শ্রমিকশ্রেণী এই ব্যবস্থায় শোষণের শিকার হয় । শ্রমিকেরা পশুর ন্যায় জীবনযাপনে বাধ্য হয় । 

( ২ ) ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উৎপাদকদের সংঘবদ্ধ থাকার ফলে উদ্ভব হয় একচেটিয়া বাণিজ্যের , ফলে উৎপাদকরা ইচ্ছামত দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ করতে পারে । অধিক মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয়ে বাধ্য হবার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নেমে যায় । 

( ৩ ) ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধিক উৎপাদন ও অধিক মুনাফা অবশ্যম্ভাবী । সেইজন্য প্রয়োজন বেশী বাজারের । এই প্রয়োজন মেটাতে শুরু হয় উপনিবেশ স্থাপনের উদ্যোগ । উপনিবেশ এর জনগণ শিকার হয় ঔপনিবেশিকদের সীমাহীন শোষণের । সেই সঙ্গে শুরু হয় উপনিবেশ দখলের সংগ্রাম । এইভাবে পুঁজিবাদী রাজনীতি জন্ম দেয় একাধিক পাপের । 

( ৪ ) পুঁজিবাদের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে সাম্রাজ্যবাদের । জাপান কর্তৃক মাঞ্চুরিয়া দখল বা ইংল্যাণ্ড কর্তৃক ভারতে শাসন কর্তৃত্ব স্থাপন এই ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের বিশেষ উদাহরণ । 

ধনতন্ত্রবাদ বা পুঁজিবাদের সুফল

অবশ্য উপরিলিখিত কুফলগুলি বর্তমান ধনতান্ত্রিক দেশগুলি দূরীকরণে সচেষ্ট হয়েছে । ঊনবিংশ শতকের ধনতন্ত্র বিংশ শতকে চরিত্রগতভাবে পরিশোধিত হয়েছে । দুটি কারণে এটি সম্ভব হয়েছে । 

প্রথমত , শ্রমিকশ্রেণী ক্রমশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন শুরু করার ফলে তাদের সুযোগ সুবিধা অনেকখানি বেড়েছে । ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও বিভিন্ন প্রকার শ্রমিক কল্যাণমূলক আইন জারি হয়েছে । শ্রমিকের দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে , চাকুরির নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে ইত্যাদি । 

দ্বিতীয়ত , গণতন্ত্র ও উদারতন্ত্রের প্রসারের ফলে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারগুলিও ধনতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই এই ব্যবস্থাকে মুষ্টিমেয়র স্বার্থে নিয়োজিত না রেখে অধিকাংশের স্বার্থে প্রয়োগ করতে সচেষ্ট হচ্ছেন । এর জন্য জারি হয়েছে বিভিন্ন আইন । উৎপাদনের মান ও মূল্য ন্যায়সংগত করার জন্য স্থাপিত হয়েছে সরকারী নিয়ন্ত্রণ ।

আরো পড়ুন : নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা

বার্লিন সংকট কি

পঞ্চশীল নীতি কাকে বলে

error: Content is protected !!