সমাজতন্ত্রবাদ কি

সমাজতন্ত্রবাদ কি

‘ সমাজতন্ত্রবাদ ’ কথাটি প্রথম ব্যবহার করেন জনৈক ব্রিটিশ চিন্তাবিদ রবার্ট আওয়েন । ‘ সমাজতন্ত্রবাদ ’ একটি বিশেষ অর্থনৈতিক মতবাদ । এই মতবাদের প্রচারক ও সমর্থকেরা সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তির রূপান্তর ঘটাতে চেয়েছিলেন । জীবন ও কর্মের সংগঠনে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সামাজিক বা সমষ্টিগত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই পরিবর্তন সম্ভব হবে বলে এঁরা মনে করতেন । 

অর্থাৎ যে মতবাদ প্রচলিত ধনতন্ত্রবাদের মূলে কুঠারাঘাত করে যৌথ বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পথ নির্দেশ করে , সেটাই ‘ সমাজতন্ত্রবাদ ’ । সমাজতন্ত্রবাদীদের মধ্যে তত্ত্বগত মতভেদ আছে । মার্কস পূর্ববর্তী সমাজতান্ত্রিকদের ‘ আদি সমাজতন্ত্রবাদী ’ বলা হয় । মার্কস এঁদের ‘ ইউটোপিয়ান ’ ( Utopian ) বা ‘ অবাস্তব আদর্শবাদী ‘ বলে আখ্যায়িত করেছেন । 

সমাজতন্ত্রবাদের উদ্ভব

শিল্প বিপ্লব প্রসূত কারখানা প্রথার দোষ ত্রুটি দূরীকরণের জন্যই সমাজতন্ত্রবাদের উৎপত্তি হয়েছে । শিল্প বিপ্লবের ফলে কলকারখানার মালিকেরা দ্রুত অধিক দ্রব্য উৎপাদন ও বিক্রয় করে প্রচুর মুনাফা লাভ করতে থাকে । কিন্তু শ্রমিকদের এরা কখনই ন্যায্য মজুরি দিত না । দেশের মোট সম্পদ বৃদ্ধি পেলেও বণ্টন ব্যবস্থার ত্রুটির ফলে তা মুষ্টিমেয় শিল্প মালিকের হাতে সঞ্চিত হতে থাকে । অল্প মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হওয়ার ফলে শ্রমিকদের অবস্থা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে । শ্রমিক পরিবারগুলি অর্ধাহারে , অনাহারে জীবন যাপন করতে বাধ্য হয় । মুনাফার অর্থে শ্রমিকের কোন দাবি না থাকার ফলে দিন দিনই মালিক ও শ্রমিকের আর্থিক ব্যবধান বৃদ্ধি পেতে থাকে । এইরূপ বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে শ্রমিকদের তথা দেশবাসীকে বাঁচানোর জন্যই সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার উদ্ভব ঘটে । 

সমাজতান্ত্রিকরা মনে করেন ভূমি , জল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদে ব্যক্তিগত মালিকানা থাকা অন্যায় । কারণ এগুলি কারও সৃষ্টি নয় , এগুলি প্রকৃতির দান । তাই এইসব প্রাকৃতিক সম্পদে সবার সমান অধিকার থাকা বাঞ্ছনীয় । ব্যক্তিগত শিল্পোদ্যোগ বা সম্পত্তির অধিকার শোষণের জন্ম দেয় । কারণ ব্যক্তি মালিকানা স্বীকৃত হলে অধিক মুনাফা লাভের প্রবণতা দেখা দিতে বাধ্য । আর কেবলমাত্র শোষণের দ্বারাই তা সম্ভব । তাই সমাজতান্ত্রিকরা বলেন উৎপাদন ব্যবস্থার উপর থাকবে সার্বিক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ । এবং উৎপাদিত সামগ্রী বণ্টনেরও মালিক হবে রাষ্ট্র । তা হলে ব্যক্তিগত মুনাফা বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকবে না ।

‘ সমাজতন্ত্রবাদ ’ কথাটি ঊনবিংশ শতকে উদ্ভূত হলেও , বহু পূর্বেই চিন্তাবিদরা শোষণ মুক্ত সমাজ ব্যবস্থার কথা চিন্তা করতে শুরু করেন । ইংরেজ মনীষী জেরেসি বেথাম , জেমস মিল , জন স্টুয়ার্ট মিল প্রমুখ শ্রমিকশ্রেণীকে ন্যায্য মজুরি প্রদান করা ও তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা ও শোষণের তীব্রতা হ্রাস করার প্রয়োজনীয়তার প্রতি নির্দেশ করেছেন । অবশ্য ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ বা উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কথা তাঁরা বলেননি । ফরাসী বিপ্লবী ফ্রাঁসোয়া বিবিউফ সরকারের নিয়ন্ত্রণে জাতীয় আয় বণ্টনের পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন । অবশ্য তাঁকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করে তাঁর ভাবনাকে সমাধিস্থ করা হয় । 

আরো পড়ুন : 1917 সালের রুশ বিপ্লবের কারণ

আদি সমাজতান্ত্রিকগণ 

আধুনিক সমাজতন্ত্রবাদের উদ্ভব ঘটে ঊনবিংশ শতকের তৃতীয় দশক থেকে । এই সময়ে রবার্ট আওয়েন , সেণ্ট সাইমন , চার্লস ফুরিয়ার , লুই ব্ল্যাঙ্ক প্রমুখ চিন্তাবিদের আবির্ভাব ঘটে । এঁরা প্রত্যেকেই ব্যক্তি মালিকানার অবসানে , উৎপাদনে ও বণ্টনে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের তত্ত্ব প্রচার করেন । এঁরা ‘ আদি সমাজতন্ত্রবাদী ’ নামে পরিচিত হয়েছে । এঁদের বক্তব্যের কিছু কিছু অবাস্তবতা ও অসম্পূর্ণতাকে লক্ষ্য করে কার্ল মার্কস্ এঁদের ‘ ইউটোপীয় ’ বা ‘ ভাববাদী ‘ বলে অভিহিত করেছেন । 

সেণ্ট সাইমন : 

সমাজতন্ত্রবাদের আদি প্রবক্তা হিসেবে ফরাসী চিন্তাবিদ সেণ্ট সাইমন ( ১৭৬০-১৮২৫ খ্রীঃ ) কে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে । তিনি ঘোষণা করেন যে , শ্রমিকশ্রেণীর হাতেই সমাজের ভবিষ্যৎ নিহিত আছে । সমাজে ধন বণ্টনের বৈষম্য হেতু ধনী ও দরিদ্রের সৃষ্টি হয়েছে । এই অসাম্য দূর না করলে সমাজে শান্তি আসবে না । তিনি মনে করেন , সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিকট হওয়া জরুরী । কারণ উৎপাদনের উপাদান তাদের হাতেই থাকা দরকার— যারা এর সদ্ব্যবহার করতে সক্ষম । 

অর্থাৎ প্রকৃত শ্রমিক বা কৃষকের হাতেই শিল্প বা জমির মালিকানা থাকা বাঞ্ছনীয় । এজন্য তিনি শ্রমিক ও মালিকের সহযোগিতা ও সমবায়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন । তিনি এও বলেন যে , সমাজে নীতিবোধ ও শিক্ষার প্রসার ঘটলে মানুষের শোষণ প্রবণতা কমবে এবং শিক্ষিত সমাজ দারিদ্র্যের অবসানে আগ্রহী হবে । ‘ 

নিউ খ্রীশ্চিয়ানিটি ’ ( New Christianity ) নামক গ্রন্থে তিনি বলেন যে , খ্রীষ্টধর্মের মূলনীতি দরিদ্রের উন্নতি বিধানের আদর্শে মানুষের উদ্বুদ্ধ হওয়া দরকার । তাঁর পরিকল্পিত সমাজের দায়িত্ব থাকবে সৎ ও মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের হাতে । তাঁর পরিকল্পিত আদর্শ সমাজব্যবস্থার মূল সূত্র হল বিশ্বের সমস্ত মানুষের জন্য একটি সমবায় গড়ে তোলা , যেখানে প্রত্যেকের স্থান নির্ণীত হবে তার ব্যক্তিগত দক্ষতা অনুযায়ী এবং পুরস্কৃত হবে তার কর্ম অনুযায়ী । 

সাইমনের বক্তব্যে বহু অসংগতি লক্ষ্য করা যায় । তিনি শ্রেণী সমন্বয়ের দ্বারা শোষণের অবসান কামনা করেছেন । আবার শোষিত মানুষকে সংঘবদ্ধ হবার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন । সার্বিক সমন্বয় ঘটলে শ্রেণী ভিত্তিক সংঘবদ্ধ হবার কথা অবান্তর । এতদসত্ত্বেও সমাজবাদী আন্দোলনে তিনি ছিলেন মন্ত্রগুরু । তিনিই প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন যে , অর্থনীতিই সমাজ ও রাজনীতির নিয়ন্ত্রক । তাই মার্কস ও এঙ্গেলস সাইমনের কৃতিত্বকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছেন । এঙ্গেলস বলেছেন , সাইমনের মধ্যে পরবর্তীকালের সমাজবাদের বহু বক্তব্য পাওয়া গেছে । 

রবার্ট আওয়েন :

ব্রিটিশ সমাজতান্ত্রিক রবার্ট আওয়েন ( ১৭৭১-১৮৫৮ খ্রীঃ ) ছিলেন সেণ্ট সাইমনের সমসাময়িক । ‘ সমাজতন্ত্রবাদ ’ শব্দটি তিনিই প্রথম ব্যবহার করেন । তাঁকে ব্রিটিশ সমাজতন্ত্রবাদের জনক বলে অভিহিত করা হয় । প্রথম জীবনে তিনি ম্যাঞ্চেস্টারের একটি কাপড়কলের ম্যানেজার ছিলেন । ফ্যাক্টরী প্রথার বিভিন্ন কুফল নিজের চক্ষে তিনি দেখেছিলেন । তাই শ্রমিকদের উন্নতির জন্য তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন । নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতা বলে তিনি নিউ ল্যানার্ক নামক স্থানে একটি আদর্শ কাপড়কল স্থাপন করেন । 

তিনি মনে করতেন , মানুষ যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে সহযোগিতার ভিত্তিতে তার অর্থনৈতিক জীবন পরিচালিত করে , তা হলেই সার্বিক উন্নতি সম্ভব । তিনি তাঁর কারখানায় নিযুক্ত শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত মজুরি , স্বাস্থ্যকর আবাসন , শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য বিদ্যালয় এবং বৃদ্ধ বয়সের জন্য বার্ধক্য ভাতার ব্যবস্থা করেন । এইভাবে তিনি তাঁর কারখানাকে শ্রমিকদের তীর্থক্ষেত্রে পরিণত করেন । তিনি এই সত্য প্রতিষ্ঠা করেন যে , মালিকের স্বার্থ সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়েও শ্রমিকদের মঙ্গল করা সম্ভব । অবশ্য তাঁর দৃষ্টান্ত অন্যান্য শিল্প মালিকদের প্রভাবিত করতে পারেনি । 

রবার্ট আওয়েনর মতাদর্শ :

তিনি পুঁজিবাদী শোষণকে শ্রমিক শ্রেণীর অজ্ঞতার অন্যতম ফল বলে মন করেন । তিনি মনে করতেন , যেদিন শ্রমিকরা আত্মসচেতন হবে , তাদের ভূমিকা ও অবদান সম্পর্কে নিশ্চিতমনা হবে , সেদিনই শোষণের অবসান ঘটবে । সাম্যবাদ স্থাপনের প্রাথমিক শর্ত হিসেবে তিনি ব্যক্তি মালিকানার অবদান আবশ্যিক বলে ঘোষণা করেন । ব্যক্তি মালিকানার পরিবর্তে তিনি গণ মালিকানা ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন দেখতেন । তা ছাড়া তাঁর সাম্যবাদে ধর্মের কোন ভূমিকা ছিল না । দু’দিক থেকেই আওয়েন এর সাথে মার্কসের বক্তব্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায় । তাঁর কল্পনার সমাজ ছিল সমবায় ভিত্তিক ( Co-operation based ) । 

তবে আওয়েন এর মতাদর্শও স্বয়ং সম্পূর্ণ নয় । তিনি যে সমবায় সমাজের কথা বলেছেন , তার জন্য কেবল গণচেতনার প্রয়োজন ছিল না , সেই সঙ্গে প্রয়োজন ছিল বিপুল পরিমাণ সম্পদের । তিনি নিজেও সেই সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছিলেন । অবশ্য শ্রমিকশ্রেণীর প্রতি তাঁর দরদ ছিল অকৃত্রিম এবং সামাজিক শোষণের অবসানে তাঁর আন্তরিকতা ছিল চূড়ান্ত । 

অনেকে আওয়েনকে সমাজতান্ত্রিক না বলে সংস্কারক বলার পক্ষপাতী । কারণ তিনি উৎপাদনের উৎপাদন ও উৎপাদিত সামগ্রীর অধিকার বা বণ্টন ব্যবস্থা সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কথা বলেননি । তাই সংস্কার কর্মসূচী শ্রমিকদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি । কারণ এই ব্যবস্থায় শ্রমিকদের উন্নতি বা মঙ্গল সম্পূর্ণভাবেই মালিকের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল ছিল । 

চার্লস ফুরিয়ার :

আদি সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ফরাসী চিন্তাবিদ চার্লস ফুরিয়ার ( ১৭৭২-১৮৩৭ খ্রীঃ ) । তিনি সকলের মধ্যে একতার ভাব জাগ্রত করে সহযোগিতার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের চেষ্টা করেন ।

এজন্য তিনি পনের শত ব্যক্তি সমন্বিত এক একটি স্বয়ং ‘ কমিউন ‘ বা ‘ ফ্যালাঞ্জ ‘ ( Phalange ) গঠনের পরিকল্পনা করেন । এইসব কমিউনের সদস্যরা নিজেদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি , যেমন— খাদ্য , বস্ত্র , গৃহ , পথঘাট ইত্যাদি নিজেরাই প্রস্তুত করবে এবং নিজেরাই ভোগ করবে । এতে প্রত্যেকেই নিজ নিজ দক্ষতা ও পছন্দ অনুযায়ী কাজ বেছে নিতে পারবে এবং উপযুক্ত স্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে । এই ব্যবস্থায় পারস্পরিক সম্ভাব ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে , শোষক হবার বা শোষিত হবার পথ বন্ধ হয়ে যাবে । 

আগস্ট ব্লাঙ্কি :

ফরাসী চিন্তাবিদ আগস্ট ব্লাঙ্কি ( ১৮৫০-১৮৮১ খ্রীঃ ) ফ্রান্সে বিপ্লববাদী সমাজতন্ত্র প্রচার করেন । তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে , মালিকশ্রেণী কখনই স্বেচ্ছায় তাদের শোষণ বন্ধ করবে না । তিনি বলেন যে , শ্রমিকের মজুরি ( Wage ) এবং মালিকের মুনাফা ( Dividend ) এর মধ্যে সমন্বয় বা আপস সম্ভব নয় । তাই তিনি মালিকশ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রমিকদের আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান । এজন্য অনেকে তাঁকে ‘ আদি নৈরাজ্যবাদী ‘ বলে অভিহিত করেন । 

লুই ব্ল্যাঙ্ক :

আদি সমাজতন্ত্রবাদের গুরু হিসেবে ফরাসী চিন্তাবিদ লুই ব্ল্যাঙ্ক ( ১৮১১-৮২ খ্রীঃ ) এর নাম স্মরণ করা হয় । তিনি ছিলেন কল্পনা বিলাসী সমাজতান্ত্রিক ও কার্ল মার্কসের মধ্যে সেতুবন্ধ স্বরূপ । ‘ Organisation of Labour ‘ নামক গ্রন্থ রচনা করে তিনি বিখ্যাত হন । 

তিনি মনে করতেন , সামাজিক শোষণ বন্ধ করার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন । তাঁর কাছে সমাজতন্ত্রের অর্থই হল রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র । তিনি শ্রমিকদের ভোটাধিকার দাবি করেন । কারণ ভোটাধিকার লাভ করে শ্রমিকশ্রেণী রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারবে । ফলে সরকার শ্রমিক দরদী আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য হবে । তিনি বুর্জোয়া রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গঠনের দাবি জানান । লুই ব্ল্যাঙ্ক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে কারখানা স্থাপনের পক্ষপাতী ছিলেন । তিনি মনে করতেন , ব্যক্তি মালিকানা শোষণের কারণ হতে বাধ্য । 

কিন্তু রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত কারখানায় এই শোষণ থাকবে না । এখানে প্রতি জনতার দক্ষতা অনুযায়ী শ্রম দেবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পারিশ্রমিক লাভ করবে । তিনি প্রচার করেন , কর্মের অধিকার ( Right to work ) মানুষের মৌলিক অধিকার । তাই রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিককে কাজ দিতে বাধ্য । তাঁর এই বক্তব্য ফরাসীবাসীকে আকৃষ্ট করে । তাই ১৮৪৮ এর বিপ্লবের পরে ফ্রান্সে ‘ জাতীয় কর্মশালা ‘ ( National workshop ) ও কর্মসংস্থান বোর্ড গঠিত হয় । অবশ্য এগুলি তাদের ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি । প্রজাতান্ত্রিক দল কূটকৌশলে এগুলিকে বন্ধ করে দেয় । 

উপরোক্ত আদি সমাজতন্ত্রীরা বহুলাংশে অবাস্তব আদর্শবাদিতার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন । কারণ এঁরা প্রায় সবাই মালিকশ্রেণীর হৃদয় পরিবর্তনের মাধ্যমে শোষণের অবসান ও শ্রমিকদের উন্নতির কল্পনা করেছিলেন । তাই এঁরা শ্রমিকদের উদ্বুদ্ধ না করে মালিকদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন । উপরতলা থেকে সংস্কার আসবে এই বিশ্বাস করে আদি সমাজতন্ত্রীরা নিচুতলার কৃষক , শ্রমিক বা সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেননি । অবশ্য তা সত্ত্বেও সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনে এঁদের অবদানকে অস্বীকার করা যায় না । কারণ এঁরাই প্রথম ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদের মূলে কুঠারাঘাত করেন ।

আরো পড়ুন : তৃতীয় বিশ্ব বলতে কী বোঝায়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ

লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি

error: Content is protected !!