ইতালির ঐক্য আন্দোলন

ইতালির ঐক্য আন্দোলন

ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে , ইউরোপের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে । মেটারনিক , জার নিকোলাস , ক্যাসলরী প্রভৃতি পুরাতনপন্থী রাজনীতিজ্ঞদের স্থলে তৃতীয় নেপোলিয়ন , কাভুর , বিসমার্ক প্রভৃতি নতুন নেতার উদয় হয় । ইতালি ও জার্মানীতে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় রাষ্ট্র গঠিত হলে ইউরোপের পুরাতন রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে যায় । এই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ ছিল ইতালির ঐক্য আন্দোলন । 

ভিয়েনা সম্মেলনের অবিচার 

নেপোলিয়নের ইতালি বিজয়ের আগে ইতালি অনেকগুলি রাজ্যে বিভক্তি ছিল । নেপোলিয়ন ইতালিকে নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করে ঐক্যবদ্ধ করলে ইতালিবাসীগণ সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় ঐক্যের কথা ভাববার সুযোগ পায় । তাঁর মাধ্যমে ইতালিতে ফরাসী বিপ্লবের জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা ছড়িয়ে পড়ে । 

কিন্তু ভিয়েনা সম্মেলনে তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয় যখন তারা দেখে যে , ইতালিকে লোম্বার্ডি , পার্মা , টোস্কেনি , মোডেনা , লক্কা , পোপের রাজ্য , পিডমণ্ড , সার্ডিনিয়া ও সিসিলি , নেপলস— এই আটটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত করা হয় ।

ঐক্যের পথে বাধা 

ইতালিকে ঐক্যবদ্ধ করার পথে যে বাধাগুলি ছিল সেগুলি হচ্ছে —

( ১ ) ইতালির উপর অস্ট্রিয়ার মত শক্তিশালী দেশের প্রাধান্য । 

( ২ ) তাছাড়া , পোপের রাজ্যের অবস্থান ছিল ঠিক মধ্য ইতালিতে । কাজেই পোপের রাজ্য দখল না করে উত্তর ও দক্ষিণ ইতালিকে ঐক্যবদ্ধ করা ছিল কষ্ট সাধ্য । কিন্তু পোপের রাজ্য সম্বন্ধে অস্ট্রিয়া , ফ্রান্স প্রভৃতি ক্যাথলিক দেশ ছিল স্বাভাবিক কারণেই স্পর্শকাতর । 

( ৩ ) গ্রীসের মত ইতালিতেও প্রত্যেক নগরীর নিজস্ব ঐতিহ্য ছিল এবং সেই বিশেষ বিশেষ ঐতিহ্যই তাদের প্রত্যেককে অপর নগরগুলি সম্পর্কে ঈর্ষাপরায়ণ করেছিল । 

( ৪ ) ইতালি তখন প্রাদেশিকতা ও আঞ্চলিকতা দ্বারা পূর্ণ ছিল । মেটারনিক লিখেছেন , ” In Italy provinces are against men .”

আরো পড়ুন : কাউন্ট ক্যাভুরের অবদান

গ্যারিবল্ডির অবদান

কার্বোনারী দলের উদ্যোগ 

ইতালির মুক্তি আন্দোলনের প্রথম অগ্রদূত ছিল ‘ কার্বোনারী সম্প্রদায় ’ কার্বোনারী দল ছিল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মুখোশের আড়ালে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সমিতি । ঐতিহাসিক বোল্টন কিং এর মতে , ইতালির মুক্তিকে কার্বোনারীরা ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে । এদের প্রধান কর্মকেন্দ্র ছিল দক্ষিণ ইতালির নেপল‌স । কার্বোনারীগণ ১৮২০ খ্রীষ্টাব্দে বুরবোঁ রাজা চতুর্দশ ফার্ডিনাণ্ডের বিরুদ্ধে ও ১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দে পোপের বিরুদ্ধে দুটি বিদ্রোহ করে , কিন্তু অস্ট্রিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপে কার্বোনারী আন্দোলন দমিত হয় ।

ম্যাৎসিনির নেতৃত্ব 

বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ এইসব বিপদের মাঝে ইতালির জাতীয় আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য প্রয়োজন ছিল সুদক্ষ নেতৃত্বের । এই মহান দায়িত্ব বহন করতে যে সকল মানুষ জীবন পণ করেছেন , তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন জোসেফ ম্যাৎসিনি ( ১৮০৫ – ১৮৭২ খ্রীঃ ) । বাল্যকাল থেকেই তিনি স্বদেশের বিচ্ছিন্নতায় ছিলেন কাতর । প্রথম জীবনে তিনি ‘ কার্বোনারী ‘ নামক গুপ্ত সমিতির সদস্য হন ।  

মসি ছেড়ে অসি ধারণা করে তিনি দেশকে বিদেশী শাসন মুক্ত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন । কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে এই গুপ্ত দলের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের অসারতা তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় । নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচী ছাড়াই কার্বোনারী দলের বিক্ষিপ্ত ধ্বংসাত্মক কাজ তাঁকে আশাহত করে । তাত্ত্বিক ও আদর্শবাদী ম্যাৎসিনি শেষ পর্যন্ত কার্বোনারী দলের সাথে সংস্রব ত্যাগ করেন । নতুন পথের সন্ধানে রত হন তিনি । ম্যাৎসিনি অনুভব করেন যে , আত্মশক্তি , আত্মত্যাগের প্রেরণা এবং জাতিগত বিকাশ ছাড়া ইতালিকে ঐক্যবদ্ধ করা যাবে না । 

ইয়ং ইতালি দল 

ইতালির ঐকা আন্দোলনে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল অস্ট্রিয়া । ম্যাৎসিনি যথার্থই উপলব্ধি করেন যে , অস্ট্রিয়ার সাথে যুদ্ধ ব্যতিরেকে ইতালিকে ঐক্যবদ্ধ করা যাবে না । এই যুদ্ধে তিনি ইতালির যুবশক্তিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে আহ্বান জানান । তিনি মনে করতেন , ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য ইতালিবাসীর আত্মপ্রস্তুতি ও আত্মত্যাগ আবশ্যিক । কেবলমাত্র বিদেশী শক্তি সাহায্য বা ধ্বংসাত্মক কাজের দ্বারা অভীষ্ট পূরণ হবে না । তিনি বলতেন , ‘ কেবল একটা আত্মনির্ভরশীল জাতিই প্রকৃত শক্তির অধিকারী হতে পারে ।” 

ইতালিবাসীকে দেশপ্রেম , জাতীয়তাবোধ ও আত্মত্যাগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ম্যাৎসিনি ‘ ইয়ং ইতালি ‘ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন । অনুর্ধ চল্লিশ বছরের যে কোন ইতালিয় এই সংঘের সদস্য হতে পারত । নিয়মিত শিক্ষাদান , কুচকাওয়াজ , শরীরচর্চা , অস্ত্রশিক্ষা প্রভৃতির মাধ্যমে ইয়ং  ইতালির সদ্যসদের তিনি গড়ে তোলেন একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীরূপে । তিনি বলতেন , ‘ একাগ্রতা ও ঐক্যবদ্ধভাবে ’ কোটি কোটি ইতালিবাসী তাদের কাঙ্ক্ষিত ঐক্য নিজেরাই প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম । তাঁর আহ্বান ছিল ‘ ইতালিকে একাই এগিয়ে চলতে হবে ’ ( “ Italia farada se ; Italy will go alone ‘ ) । 

 ম্যাৎসিনি সমগ্র ইতালির ঐক্যের আহ্বান জানান । তিনি বলতেন , “ ইতালি এবং সমগ্র ইতালির নাম ছাড়া তোমরা অন্য কোন নামে আন্দোলন কোরো না । ” ম্যাৎসিনির আদর্শবাদ কেবল দেশের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না । তিনি ছিলেন সর্বজনীন মুক্তির আদর্শে বিশ্বাসী । তিনি স্বপ্ন দেখতেন যে , ঐক্যবদ্ধ হবার পর নতুন ইতালি বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে গড়ে তুলবে বন্ধুত্বের বন্ধন । প্রতিষ্ঠিত হবে সর্বজনীন শান্তি । এইভাবে ম্যাৎসিনি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য ইতালিবাসীর মানসিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন । 

মূল্যায়ন 

১৮৪৮ খ্রীষ্টাব্দের ফরাসী বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে ইতালির ইয়ং ইতালি দলের সদস্যরাও বিপ্লবে সামিল হয় । কিন্তু সংগঠনের অভাব ও সংহতির অভাবহেতু প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এই বিপ্লবকে দমন করতে সক্ষম হয় । অতঃপর ইতালির ঐক্য আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন কাউণ্ট কাভুর । 

ম্যাৎসিনি নেতৃত্বে ইতালির ঐক্য আন্দোলন সম্পূর্ণ না হলেও , তাঁর শিক্ষার ফলে ইতালিবাসী পরবর্তী বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য অনেকখানি এগিয়ে যেতে সক্ষম হয় । তিনি ইতালিবাসীর মনে যে নৈতিক শক্তি জাগ্রত করেন তা দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের সহায়ক হয় । অনেকে মনে করেন তিনি ছিলেন অতিরিক্ত চরমপন্থী এবং তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল অতীন্দ্রিয় । তথাপি একথা সত্য যে , ইতালির গণজাগরণে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল ।

আরো পড়ুন : জোসেফ ম্যাৎসিনি এর অবদান

ইয়ং ইতালি আন্দোলন

error: Content is protected !!