উপদ্বীপের যুদ্ধ বলতে কী বোঝো 

উপদ্বীপের যুদ্ধ বলতে কী বোঝো 

মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থাকে কার্যকরী করার জন্য নেপোলিয়ন স্পেন ও আইবেরীয় উপদ্বীপ অঞ্চলকে , বিশেষত পর্তুগালকে নিজ প্রভাবাধীনে আনতে চেষ্টা করেন । এর ফলেই স্পেন ও পর্তুগালের সাথে তাঁর সংঘাতের শুরু হয় , যা শেষ পর্যন্ত বৃহৎ উপদ্বীপের যুদ্ধের সূচনা করে । 

স্পেনের সাথে চুক্তি 

বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে পর্তুগাল ছিল ইংল্যাণ্ডের পুরানো মিত্র । ১৮০৬ খ্রীষ্টাব্দে নেপোলিয়ন ‘ মহাদেশীয় ব্যবস্থা ‘ ঘোষণা করার পর পর্তুগালকে ইংল্যাণ্ডের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে নির্দেশ দেন । কিন্তু পর্তুগাল নেপোলিয়নের আদেশ মানতে অস্বীকার করলে তিনি পর্তুগালকে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন । কিন্তু পর্তুগালে যাওয়ার সহজতর পথ ছিল স্পেনের মধ্য দিয়ে । তাই নেপোলিয়ন স্পেনকে পর্তুগাল বিরোধী অভিযানে সামিল করেন । 

সেই সময় স্পেনের রাজা ছিলেন বুরবোঁ বংশীয় ষষ্ঠ চার্লস । কিন্তু আসল ক্ষমতা ছিল রানীর প্রিয় পাত্র গোদয় ( Godoy ) এর হাতে । নেপোলিয়ন পর্তুগালের দক্ষিণ অংশ গোদয়কে দেওয়ার শর্তে স্পেনের মধ্য দিয়ে সৈন্য চালনার অনুমতি লাভ করেন । 

আরো পড়ুন : নেপোলিয়নের উত্থানের কারণ

স্পেন আক্রমণ 

বস্তুত এই চুক্তি নেপোলিয়নের কাছে কার্যোদ্ধারের অস্ত্র ভিন্ন কিছুই ছিল না । ফ্রান্সের নিরাপত্তার কারণে তিনি স্পেন থেকেও বুরবোঁ বংশের শাসনকে উৎখাত করতে মনস্থ করেছিলেন । যাই হোক , পূর্ব চুক্তি মত ১৮০৭ খ্রীষ্টাব্দে জেনারেল জুনোর নেতৃত্বে একটি ফরাসী বাহিনী স্পেনীয় বাহিনীর সহযোগিতায় পর্তুগাল অধিকার করে । পর্তুগাল দখল করেই নেপোলিয়ন স্পেন দখল করতে উদ্যোগী হন ; এবং পতুর্গাল বিজয়ের অজুহাতে স্পেনের অভ্যন্তরে সৈন্য সমাবেশ করতে থাকেন । 

স্পেনের অন্তর্কলহ 

এই সময়ে স্পেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির আকস্মিক পরিবর্তন নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে সাহায্য করে ।

ক্যাথলিক বিরোধী নেপোলিয়নের সাথে চুক্তির অপরাধে উগ্র স্পেনীয় ক্যাথলিক জনগণ গোদয় ও রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে । যুবরাজ ফার্ডিন্যান্ড জনগণের সাথে হাত মেলান । গোদয় বিদ্রোহী সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী হন । নেপোলিয়ন রাজা চার্লস ও যুবরাজ ফার্ডিন্যান্ডকে বেয়ন নামক স্থানে ডেকে পাঠিয়ে দু’জনকেই সিংহাসনের দাবি ত্যাগ করতে বাধ্য করান । তারপর নিজ ভ্রাতা যোশেফ বোনাপার্টকে স্পেনের সিংহাসনে বসান । বেয়ন থেকেই তিনি স্পেনের জন্য একটি নতুন সংবিধান ঘোষণা করেন । রাজপরিবারকে নির্বাসনে পাঠানো হয় । 

স্পেনবাসীর আন্দোলন 

যোশেফকে স্পেনের সিংহাসনে বসিয়ে নেপোলিয়ন বিরাট ভুল করেন । তিনি ভেবেছিলেন , যেহেতু স্পেনে অভিজাতশ্রেণী ও প্রতিক্রিয়াশীল যাজকদের অবাধ কর্তৃত্ব , সেহেতু উদারপন্থী ফরাসী শাসনকে স্পেনবাসী স্বাগত জানাবে । কিন্তু তাঁর এই অবৈধ সরকারকে স্পেনবাসী এক মুহূর্তের জন্যও মেনে নিতে পারেনি । তারা জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সশস্ত্র আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে । এতদিন নেপোলিয়ন বিভিন্ন রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন । এই প্রথম তিনি একটি জাগ্রত জাতির মুখোমুখি হলেন । 

স্পেনের সমর্থনে ইংল্যাণ্ড 

যোশেফ মাদ্রিদে পৌঁছবার আগেই স্পেনবাসী তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে । ধীরে ধীরে বিদ্রোহ স্পেনের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে । প্রতিটি প্রদেশে গড়ে ওঠে জুন্টা ( Junta ) বা প্রতিরোধ সমিতি । জুণ্টারা স্থানীয় প্রশাসন হাতে নিয়ে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরিচালনা করতে থাকে । একই সাথে তারা সাহায্যের জন্য আবেদন জানায় ইংল্যাণ্ডের কাছে । ১৮০৮ খ্রীষ্টাব্দে বেলেনে একটি ফরাসী বাহিনী স্পেনীয় বিদ্রোহীদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় । 

এই অবিশ্বাস্য ঘটনা একদিকে যেমন ফরাসী বাহিনীর অপরাজেয়তাকে ক্ষুণ্ণ করে , তেমনি দারুণভাবে উৎসাহিত করে স্পেনীয় জুণ্টাকে । ইতিমধ্যে ডিউক অব ওয়েলিংটনের নেতৃত্বের বিরাট ইংরেজ বাহিনী পর্তুগালে অবতরণ করলে শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী উপদ্বীপের যুদ্ধ ( ১৮০৮-১৮১৩ খ্রীঃ ) । 

আন্দোলনের প্রকৃতি 

স্পেনবাসীর আন্দোলনের প্রকৃতি সম্বন্ধে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে । সাধারণভাবে এটিকে সাম্রাজ্যবাদী নির্লজ্জ হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ‘ জনগণের জাতীয়তাবাদী জাগরণ ’ বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে ।

কিন্তু আধুনিক গবেষকদের মতে , স্পেনের এই আন্দোলনের মূল নেতা ছিলেন অভিজাত ও যাজকেরা সাধারণ মানুষ নয় । যাজক ও অভিজাতরা ফরাসী বিপ্লবের ধর্ম বিরোধী চরিত্র সম্বন্ধে আতঙ্কিত হয়ে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে । স্পেনের সাধারণ মানুষের ধর্মবোধ ও রাজতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য ছিল সুগভীর । স্বভাবতই যাজক ও অভিজাতদের পরিচালিত প্রতিরোধ আন্দোলনে স্পেনের সাধারণ মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করেনি । 

যুদ্ধের গতি

স্পেন ও পর্তুগাল উভয় দেশ ফরাসী বিরোধী হওয়ার ফলে ইংল্যাণ্ডের বাহিনী সঞ্চালনে অনেক সুবিধা হয় । ওয়েলিংটন প্রথমেই পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের দিকে অগ্রসর হন । ভিসেরার যুদ্ধে জুনোর নেতৃত্বাধীন ফরাসী বাহিনী পরাজিত হয় ; এবং সিন্দ্রার কনভেনশন অনুযায়ী ফরাসী বাহিনী পর্তুগাল ত্যাগ করতে বাধ্য হয় । 

এর পরই নেপোলিয়ন এক বিরাট বাহিনী নিয়ে স্পেনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন । পরপর কয়েকটি যুদ্ধে তিনি স্পেনীয় বাহিনীকে বিধ্বস্ত করে দেন । তারপর তিনি স্যার জন মুরের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ বাহিনীকে আক্রমণ করেন । মুর নেপোলিয়নকে দক্ষিণ স্পেনে সরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে ক্রমশ পিছু হটতে থাকেন । তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সের সাথে নেপোলিয়নের যোগাযোগটা ছিন্ন করা এবং দক্ষিণ স্পেনের জাতীয় জাগরণকে সংহত হতে সময় করে দেওয়া । অবশেষে ‘ করুণা’তে উভয়ের সংঘর্ষ হয় । যুদ্ধে মুর নিহত হন , কিন্তু ইংরেজ বাহিনী জয়লাভ করে । 

ইতিমধ্যে অস্ট্রিয়া ফ্রান্স আক্রমণ করলে নেপোলিয়ন সুল্ট এর হাতে ফরাসী বাহিনীর দায়িত্ব দিয়ে স্পেন ত্যাগ করতে বাধ্য হন । ওয়েলিংটন সুল্টকে পরাজিত করে মাদ্রিদের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন । সুল্ট এর পরিবর্তে ফরাসী বাহিনীর দায়িত্ব পান ম্যাসেনা । ওয়েলিংটন ট্যাগাস নদী থেকে সমুদ্র পর্যন্ত তিনটি রক্ষাব্যূহ নির্মাণ করে ফরাসী আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকেন । এটিই ‘ টরেস ভেড্রাসের রেখা ‘ নামে খ্যাত । 

ইতিমধ্যে নেপোলিয়ন রুশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন । এই সুযোগে ওয়েলিংটন শ্যালামঙ্কার যুদ্ধে ( ১৮১২ খ্রীঃ ) ফরাসীদের পরাজিত করেন । জোসেফ বোনাপার্ট প্রাণভয়ে স্পেন ত্যাগ করেন । এর পর ওয়েলিংটন ভিত্তোরিয়ার যুদ্ধে ফরাসীদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে পীরেনিজ পর্বতমালা অতিক্রম করে ফ্রান্সে প্রবেশ করেন । এই মুহূর্তে চতুর্দিক দিয়ে আক্রান্ত নেপোলিয়নের মুক্তির আর কোন সম্ভাবনাই ছিল না । 

ফ্রান্সের পরাজয়ের কারণ 

এই যুদ্ধে নানা কারণে ফরাসী বাহিনী পরাজিত হয় । 

প্রথমত , পর্বত সঙ্কুল ও দরিদ্র দেশ স্পেনে বৃহৎ সেনাবাহিনী বা প্রত্যক্ষ যুদ্ধ কার্যকর ছিল না । পক্ষান্তরে স্পেনবাসীর গেরিলা যুদ্ধ পদ্ধতি বেশী কার্যকর হয়েছিল । 

দ্বিতীয়ত , স্পেনবাসীর জাতীয়তাবোধ তাদের অনেক বেশী ঐক্যবদ্ধ ও উৎসর্গীকৃত করে তুলেছিল । 

তৃতীয়ত , নেপোলিয়ন স্বয়ং স্পেন যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারেননি । তাঁর সেনাপতিরা ইংল্যাণ্ডের সেনাপতিদের তুলনায় কম দক্ষ ছিলেন । 

স্পেনীয় যুদ্ধের গুরুত্ব 

উপদ্বীপের যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম । নেপোলিয়ন স্বয়ং স্বীকার করেছিলেন , “ স্পেনীয় ক্ষতই আমার পতনের কারণ ” একথা বহুলাংশে সত্য । এই যুদ্ধে পরাজয় নানাভাবে তাঁর ভাগ্য বিপর্যয়ের কারণ সৃষ্টি করে । 

প্রথমত , তিনি ভেবেছিলেন যুদ্ধ ক্ষণস্থায়ী হবে , কিন্তু তা হয়নি । জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ স্পেনবাসীর আক্রমণ মোকাবিলায় তাঁকে বহু সময় ব্যয় করতে হয় । স্পেনে বিরাট বাহিনী নিয়োজিত থাকার ফলে অন্যত্র ফরাসী বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে । 

দ্বিতীয়ত , নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে গোটা স্পেনে জাতীয়তাবাদী গণজাগরণের অভূতপূর্ব বহিঃপ্রকাশ দেখা দিয়েছিল । জাতীয়তাবাদের শক্তি যে কত গভীর ও সুদৃঢ় , তা প্রত্যক্ষ করেছিল সারা পৃথিবী । নেপোলিয়নের অধীন জাতিগুলির এই ধারণা হয় যে , স্পেনীয় বিদ্রোহের অনুকরণে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে সাফল্য আসবেই । এইভাবেই জার্মান – জাতীয়তাবাদ আন্দোলন প্রভাবিত হয় । জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সমূহের কাছে শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়নকে পর্যুদস্ত হতে হয় । 

তৃতীয়ত , ইংল্যাণ্ডের স্থলবাহিনী উপযুক্ত রণাঙ্গনের অভাবে স্থলযুদ্ধে পারদর্শিতা অর্জন করতে পারেনি । কিন্তু স্পেনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনী স্থলযুদ্ধে দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয় এবং ফরাসী যুদ্ধ পদ্ধতি সম্বন্ধে সচেতন হতে পারে । এইভাবে স্পেনীয় যুদ্ধ নেপোলিয়নকে দুর্বল করে তোলে এবং তাঁর পতনের পথ প্রশস্ত করে ।

আরো পড়ুন : নেপোলিয়নের সংস্কার গুলি আলোচনা করো

তৃতীয় নেপোলিয়নের অবদান আলোচনা করো

error: Content is protected !!