ইতালীর নগর জীবনের বৈশিষ্ট্য

ইতালীর নগর জীবনের বৈশিষ্ট্য

আধুনিক যুগের প্রারম্ভে চতুর্দশ শতকে ইতালীতে এবং কিছু পরে ষোড়শ শতকে পশ্চিম ইউরোপে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে যে ব্যাপক রূপান্তর শুরু হয়েছিল তা বিশ্বের ইতিহাসে আধুনিকতার প্রথম পদক্ষেপ বলা হয় । এই তিন শতক ধরে ইউরোপে মানব জীবন ও মানবিক সত্তা সম্পর্কে নতুন চেতনার বিকাশ ঘটে । 

এই পর্বে সৃজনশীল উদ্যোগ ও প্রতিভার স্ফুরণকে বিশেষ রূপে চিহ্নিত করার জন্য Renaissance বা নবজাগরণ কথাটি ব্যবহৃত হয় । বলা যায় রেনেসাঁস ছিল ইউরোপের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ আন্দোলনগুলির মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ । এই আন্দোলন মানব জীবনের সমস্যাগুলির প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে । মোটামুটিভাবে ( ১৩৩০-১৫৩০ খ্রীঃ ) পর্যন্ত সময়কালকে রেনেসাঁর সূচনা বা উত্তর পর্ব বলা হয় । 

প্রধানত দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে রেনেসাঁসের তাৎপর্য লক্ষ্য করা যায় ㅡ প্রথমত , রেনেসাঁ যুগে পুরানো ধ্রুপদী ( Classical ) বিদ্যা চর্চার পুনর্জাগরণ ঘটে এবং দ্বিতীয়ত , এই সময় এমন অনেক নতুন জ্ঞান সঞ্চারিত হয় যা নিকট ভবিষ্যতে আধুনিক ভাবনা চিন্তার ভিত্তি গড়ে ওঠে । 

স্বাধীন নগর 

রেনেসাঁর প্রথম সূত্রপাত হয়েছিল ইতালীর নগরগুলিতে , প্রাক-রেনেসাঁস যুগে ইতালীয় নগরগুলি সম সাময়িক উত্তর ইউরোপের রাষ্ট্রগুলির থেকে আলাদা ছিল । তবে দক্ষিণ ইতালীতে ক্যাথলিক যাজক শ্রেণী ও সামন্ত প্রভুদের প্রাধান্য ছিল স্পষ্ট । কিন্তু ইতালীর উত্তরাঞ্চলে বাণিজ্যিক শহরগুলিতে নাগরিক জীবনের নিয়ন্ত্রণ ছিল সম্পন্ন বণিকদের হাতে । দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে উত্তরাঞ্চলের নগরগুলি জার্মান সম্রাটদের আগ্রাসন প্রতিরোধ করেছিল । 

পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য ও পোপদের মধ্যে রাজ্য দখলের সংঘাত ইতালীতে কোন জাতীয় রাষ্ট্র গড়ে উঠতে দেয়নি । পোপ ও পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের বিরোধের সুযোগ নিয়ে ইতালীর নগর রাষ্ট্রগুলি স্বাধীন হয়ে উঠেছিল । মোটামুটিভাবে পঞ্চদশ শতকের শেষ পর্যন্ত প্রথম সারির ইতালীয় নগর রাষ্ট্রগুলি যেমন — ফ্লোরেন্স , মিলান , নেপলস ও ভেনিস মোটামুটি ভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখেছিল । 

১৪৯৪ তে ফরাসী আক্রমণের ফলে নতুন সংকট দেখা দেয় । ১৫৮৭ তে অস্ট্রিয়ার হ্যাবসবার্গ বংশীয় শাসক পঞ্চম চালর্স ইতালীর উপর আধিপত্য বিস্তার করেন । এই চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত কোন কেন্দ্রীয় শক্তির উপস্থিতি না থাকায় ইতালীয় নগর রাষ্ট্রগুলি স্বাধীনভাবে নিজেদের ভাগ্য গড়ে নিতে পেরেছিল । 

উদার রাষ্ট্রনীতি 

উত্তর ইতালীর নগর রাষ্ট্রগুলিতে প্রজাতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল । তবে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ একটি ছোট অভিজাত শ্রেণীর হাতেই সীমিত ছিল । এই নগরের সাধারণ মানুষেরা যথেষ্ট ধর্মপ্রাণ ছিলেন তবে নাগরিক প্রশাসনে যাজক শ্রেণীর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না । সম্পন্ন বণিকদের একটি অভিজাত গোষ্ঠী সহযোগী কারিগর ও দোকানদারদের সহায়তায় নাগরিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করত । 

তবে ত্রয়োদশ শতক থেকে আভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার ও ক্রমাগত জার্মান আগ্রাসনের প্রেক্ষিতে কোন কোন শহরের প্রশাসনিক ক্ষমতা সমর নায়কদের কুক্ষিগত হয়েছিল । যেমন — ইউরোপের নবজাগরণের উৎস কেন্দ্র ছিল ফ্লোরেন্স । কিন্তু সেখানে প্রজাতান্ত্রিক শাসন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে মেদিচি পরিবারের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ।

বাণিজ্যিক স্বাচ্ছল্য 

উত্তর ইতালীর অধিকাংশ নগর বেঁচে ছিল বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসাবে । ইতালীর নগরগুলি থেকে সমুদ্র বাণিজ্য ইউরোপীয় ভূখণ্ডের সঙ্গে এশিয়ার বাণিজ্যগুলির সঙ্গে সংযুক্তি ঘটায় । ভূমধ্যসাগরের তটবর্তী অঞ্চলে ইতালীর নগরগুলির বাণিজ্য জীবনের সূচনা ঘটেছিল দ্বাদশ শতকে । এই বাণিজ্যিক শ্রী বৃদ্ধির প্রাথমিক উপাদান ছিল ধর্ম যুদ্ধ বা Crusade প্রথম পর্বে ইতালীয় বাণিজ্যে অগ্রণী ভূমিকা নেয় । পিসা নগরীর বণিকেরা বস্তুত সে সময় ফ্লোরেন্স , জেনোয়া , মিলান , ভেনিস প্রভৃতি নগর কৃষি অর্থনীতির উপর অধিক নির্ভরশীল ছিল । 

দ্বাদশ শতকের শেষ পর্ব থেকে উত্তর ইতালীর এই নগরগুলি ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করে । এশীয় বণিকদের পণ্য সম্ভার ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলি থেকে ইতালীয় বণিকদের জাহাজ মারফত উত্তর ইতালীর বন্দরগুলিতে যেত । সেখান থেকে মসলা ও নানা ধরনের মূল্যবান পাথর , মণি মুক্তা চলে যেত ইউরোপের অনান্য অঞ্চলে । চতুর্দশ শতকের প্লেগ জনিত মহামারী সত্ত্বেও ষোড়শ শতক পর্যন্ত ইউরোপীয় বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল ইতালীর এই নগরগুলির হস্তগত । 

ষোড়শ শতকের পর ইউরোপীয় সমুদ্র বাণিজ্যে ইতালীয় বণিকদের প্রাধান্য সঙ্কুচিত হয় । তবে যতদিন পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যে ইতালীর নিয়ন্ত্রণ ছিল , ততদিন নগর অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল বড় বড় কিছু ব্যাঙ্ক । এই ব্যাঙ্কগুলি নগরগুলির বাণিজ্যে বিপুল পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করত । স্থানীয় ব্যাঙ্কগুলি ছাড়াও বণিকেরা তাদের বাণিজ্যিক ও শিল্প উৎপাদনের জন্য ব্যাঙ্কিং ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছিল । পোপ , বিভিন্ন শাসক এবং সমাজের উচ্চবৃত্ত মানুষেরা ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিতেন । 

১৫-১৬ শতকে ইতালীর বড় বড় শহরগুলিতে মুদ্রা বাজার তৈরী হয়েছিল । বিশেষ করে ফ্লোরেন্সের বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্কিং কোম্পানি ইতালীতে এবং ইতালীর বাইরে বহু জায়গায় তাদের প্রতিনিধি স্থাপন করেছিল । পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফ্লোরেন্সের মেদিচি পরিবার নেপলস , ভেনিস , জেনেভা , পিসা , লণ্ডন , মিলান ও লিয়ঁতে তাদের শাখা খুলেছিল । 

বুদ্ধিজীবী শ্রেণী 

প্রতিষ্ঠিত বণিক পরিবারগুলির শক্তির উৎস ছিল পারিবারিক সংহতি , এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নগরের প্রশাসনে তাদের কর্তৃত্ব । তবে প্রশাসনিক ক্ষমতা চিরস্থায়ী ছিল না । বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে অবনমনের সঙ্গে সঙ্গে কোন কোন পরিবার নগর প্রশাসনে তথা রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্ব হারিয়ে ছিল । যাইহোক— 

( i ) নগরবাসী ভূস্বামী , 

( ii ) অভিজাত বণিক গোষ্ঠী , এবং 

( iii ) তাদের সহায়ক বুদ্ধিজীবী ও আইনজীবী । 

এই তিন ধরনের মানুষ নগরের রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতেন । এই আইনজীবী ও কারণিকদের আধুনিক বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর পূর্বসূরী হিসাবে চিহ্নিত করা হয় । তবে বুদ্ধিজীবী ও বণিকদের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানা কষ্টকর । কারণ আইনজীবীদের অনেকেই ছিলেন বণিক কিংবা বাণিজ্যে পুঁজি লগ্নীকারী । তবে এই শ্রেণীর শিক্ষা দীক্ষা ও স্বাচ্ছল্য ইতালীতে নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ছিল বিশেষ গুরত্বপূর্ণ । 

আরো পড়ুন : রেনেসাঁস বা নবজাগরণ বলতে কী বোঝো

ইউরোপের ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের কারণ

ভৌগোলিক আবিষ্কারের কারণ ও ফলাফল

error: Content is protected !!