ভৌগোলিক আবিষ্কারের কারণ ও ফলাফল

ভৌগোলিক আবিষ্কারের কারণ ও ফলাফল

পঞ্চদশ শতকের ইউরোপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল বিভিন্ন ভৌগোলিক আবিষ্কার এবং ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের প্রসার । অজানাকে জানার ইচ্ছা , বাস্তব অর্থনৈতিক তথা বাণিজ্যিক প্রয়োজন , বিজ্ঞানের অগ্রগতি প্রভৃতি একাধিক কারণের সমন্বয়ে মানব সভ্যতা প্রত্যক্ষ করেছিল এক নতুন পৃথিবীকে । বস্তুত মধ্যযুগে ইউরোপীয়দের ভৌগোলিক জ্ঞান ছিল খুবই সীমিত । 

টলেমির ‘ ভৌগোলিক বিবরণ ‘ -ই ছিল সেকালের একমাত্র গ্রন্থ , যা থেকে তারা পৃথিবীর অবস্থান ও প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করত । তারা মনে করত সীমান্ত অঞ্চলে সমুদ্রের জল টগবগ করে ফুটছে । আফ্রিকা মহাদেশে সর্বদা আগুনের উত্তাপ অনুভূত হয় ইত্যাদি । এই ভ্রান্ত ধারণার ফলে মধ্যযুগে সমুদ্র যাত্রার কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি । ইতিমধ্যে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল মুসলমান হ্রদে পরিণত হলে প্রাচ্যদেশ কয়েকটির সাথে ইউরোপের যে পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল , তাও নষ্ট হয়ে যায় । ইউরোপের রাজনীতি ও অর্থনীতি একান্ত ভাবেই মহাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে । 

ভৌগোলিক আবিষ্কারের কারণ

ভৌগোলিক আবিষ্কারের কারণ গুলি হল ─

ধর্ম যুদ্ধের প্রভাব :

ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের সূত্রে একাদশ শতকে পুনরায় প্রাচ্য দেশ সম্পর্কে ইউরোপীয়গণ উৎসাহিত হয় । ধর্মযুদ্ধের প্রেরণায় বহু খ্ৰীষ্টান মধ্যপ্রাচ্যে অভিযান চালায় । প্রাচ্যদেশের অতুল ধনসম্পদ , বিলাসময় জীবনযাত্রা এই অঞ্চল সম্পর্কে তাদের আগ্রহী করে তোলে । প্রাচ্যদেশের সুস্বাদু মসলা , হীরে , জহরত , সুগন্ধি দ্রব্য ইত্যাদি পাওয়ার জন্য তারা উন্মুখ হয়ে ওঠে । 

প্রাচ্য দেশে বাণিজ্যের সম্ভাবনা :

ইতালীয় পর্যটক ও বণিক মার্কোপোলো মধ্য এশিয়া হয়ে চীন , জাপান , ব্রহ্মদেশ ও ভারত পরিভ্রমণ করে কিছুটা জলপথ ও কিছুটা স্থলপথে স্বদেশে ফিরে যান । স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে তিনি তাঁর এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে বর্ণনা করে যে পুস্তক প্রকাশ করেন ( Account of Marcopolo ) তা পাঠ করে সোনার দেশ চীন ও ভারতে আসার জন্য ইউরোপীয়গণ আগ্রহান্বিত বোধ করেন । 

এদিকে আরবীয় বণিকদের মাধ্যমে প্রাচ্য দেশের মালমসলা ইউরোপে আসত । ইউরোপীয় বণিকদের মাধ্যমে তা আবার এখানকার নানা দেশে প্রেরিত হত । এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা ছিল ইতালীর । এই বাণিজ্যের সূত্রে ইতালীর নগর ও বন্দরগুলি হয়ে উঠেছিল সম্পদশালী । স্বাভাবিক কারণেই অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলিও প্রাচ্যের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করে নিজেদের শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে উদগ্রীব ছিল । 

অটোমান তুর্কীদের আক্রমণ :

পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগে অটোমান তুর্কী জাতির আকস্মিক আক্রমণের ফলে রোমান সাম্রাজ্যের একাংশ ও আরবদেশ তাদের দখলে চলে গেলে সমস্ত পরিস্থিতিটাই পাল্টে যায় । তুর্কীরা ইউরোপের সাথে প্রাচ্যদেশের যোগসূত্র স্থলপথগুলি বন্ধ করে দেয় । ফলে প্রাচ্যের মসলা ও সম্পদ ইউরোপে আসা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় । এমতাবস্থায় প্রাচ্যের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের সন্ধান তাদের কাছে আবশ্যিক হয়ে দাঁড়ায় । 

নবজাগরণের শিক্ষা :

অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার সাথে নবজাগরণ জনিত প্রেরণা নতুন সমুদ্রপথে আবিষ্কারের কাজকে ত্বরান্বিত করে । ‘ রেনেসাঁস ’ বা ‘ নবজাগরণ ‘ মানুষের মনে জানার স্পৃহা বাড়িয়ে তুলেছিল । এর ফলে একদল মানুষ যেমন শিল্পে বা সাহিত্যে নতুনত্বের প্রকাশ ঘটাতে ব্যস্ত ছিলেন , তেমন একদল মানুষ প্রকৃতির উৎস সন্ধানে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন । ইতিমধ্যে দিকনির্ণয় যন্ত্র , নক্ষত্র পরিমাপক যন্ত্র , সামুদ্রিক চার্ট ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়ে যাওয়ার ফলে সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে অজানাকে জানার আগ্রহ বেড়েছিল ভীষণভাবে ।

বণিকদের উদ্যোগ :

ভৌগোলিক আবিষ্কারের পশ্চাৎপট ও প্রেরণা হিসেবে  বণিক শ্রেণীর অবদানের কথা বলা হয় । অভিজাত তান্ত্রিক মধ্যযুগের ইউরোপে ধনবান হওয়া সত্ত্বেও বণিকশ্রেণীর সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিপত্তি ছিল না । তাই এই গোষ্ঠীর মানুষ নতুন নতুন ভূখণ্ডে বাণিজ্য প্রসার করে একই সাথে নিজেদের আর্থিক সংগতি বৃদ্ধি করতে এবং স্বদেশবাসীর চোখে নিজেদের ভাবমূর্তি তথা গুরুত্ব বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট হয়েছিল । ভৌগোলিক আবিষ্কারে এরা সাহায্য করে নানাভাবে । 

পর্তুগীজ নাবিকদের উদ্যোগ :

নতুন জলপথ ও ভূখণ্ড আবিষ্কারের কাজে সবথেকে বেশী অগ্রণী ছিল পর্তুগীজ নাবিকগণ । পর্তুগালের যুবরাজ হেনরি সমুদ্র অভিযানে দারুণ উৎসাহী ছিলেন । নৌ বিদ্যায় পারদর্শিতা ও সমুদ্র যাত্রায় পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য ইতিহাসে তিনি ‘ নাবিক হেনরি ‘ ( Henry the Nevigator ) নামে খ্যাত হয়ে আছেন । নৌ বিদ্যা শিক্ষার জন্য তিনি একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন । তাঁর উৎসাহে অনুপ্রাণিত হয়ে কয়েকজন পর্তুগীজ যুবক প্রাচ্যদেশে পৌঁছানোর সমুদ্রপথ আবিষ্কারের চেষ্টা করেন । 

১৪৮৬ খ্রীষ্টাব্দে পর্তুগীজ নাবিক বার্থেলোমিউ দিয়াজ নৌ অভিযান চালিয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত অগ্রসর হন । সেখানে সমুদ্রের উত্তাল রূপ দেখে তিনি এই অঞ্চলের নাম দেন ‘ ঝড়ের অন্তরীপ ’ ( Cape of Storm ) । কিন্তু তৎকালীন পর্তুগাল রাজের বিশ্বাস জন্মেছিল যে , এই পথ ধরেই ভারতবর্ষে পৌঁছানো যাবে । তাই তিনি এর নামকরণ করেন ‘ উত্তমাশা অন্তরীপ ‘ ( Cape of Good Hope ) । 

এই পথ ধরেই ভাস্কো ডা গামার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে আর এক পর্তুগীজ নাবিক ক্যাব্রাল ১৫০০ খ্রীষ্টাব্দে এক বিশাল বাহিনীসহ দক্ষিণ ভারতে উপস্থিত হন । কালিকট , গোয়া সহ দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি স্থানে ক্যাব্রালের চেষ্টায় পর্তুগীজ বাণিজ্য কুঠি স্থাপিত হয় । অতঃপর একে একে ইংরেজ , ফরাসী , ওলন্দাজ প্রভৃতি বণিকগোষ্ঠী ভারতে এসে বাণিজ্যকুঠি পত্তন করে ও ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করে । 

স্পেনীয় নাবিকদের উদ্যোগ :

এতকাল পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরকে কেন্দ্র করেই ইউরোপ ও প্রাচ্যদেশগুলির বাণিজ্যিক লেনদেন চলত । এখন ইতালীর পর্যটক ক্রিস্টোফার কলম্বাস আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে সক্ষম হলে ইউরোপের নিকট বিশ্বের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয় । কলম্বাস স্পেনের রানী ইসাবেলার সাহায্যে এক নৌ বহর  সহ ১৪৯২ খ্রীষ্টাব্দে আটলান্টিকে পাড়ি জমান এবং আমেরিকার উপকূলে বাহমা দ্বীপপুঞ্জে এসে উপস্থিত হন । কিন্তু তাঁর ধারণা হয়েছিল যে , ভারতের উপকূলে এসে পৌঁছেছেন । তাই এই দ্বীপটি ও সংলগ্ন অঞ্চল ‘ ইন্ডিজ ’ নামে পরিচিত হয় । 

আমৃত্যু কলম্বাস বুঝতে পারেননি যে , তিনিই বিশ্বের কাছে একটি নতুন মহাদেশকে তুলে ধরেছেন । পরবর্তী কালে আমেরিগো ভেসপুচি নামক জনৈক নাবিক আমেরিকা মহাদেশের উপকূল প্রদক্ষিণ করেন । তাঁর নামানুসারে এই মহাদেশের নাম হয় ‘ আমেরিকা ’ । 

স্পেনীয় নাবিক ম্যাগেলান ১৫২১ খ্রীষ্টাব্দে আমেরিকার পূর্ব উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে একটি দ্বীপ আবিষ্কার করেন । স্পেনের যুবরাজ ফিলিপের নামানুসারে এটি ‘ ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ ‘ নামে পরিচিত হয় । মেক্সিকোর সোনার লোভে দলে দলে স্পেনীয় বণিক ঐ অঞ্চলে অভিযান চালায় । আরনাণ্ডো কোর্টিস মেক্সিকো দখল করে নেন । ক্রমে ক্রমে নিকারাগুয়া , গুয়েটমালা , ইকুয়েডর , লিমা প্রভৃতি বহু অঞ্চল স্পেনীয় বিজেতাদের দখলে চলে যায় । স্থানীয় জনগণের কাছে এদের পরিচিতি হয় ‘ কনকুইসটেডর ‘ ( Conquistador ) নামে । অতঃপর ইংরেজ , পর্তুগীজ , ফরাসী বণিকেরাও আমেরিকায় উপস্থিত হয়ে উপনিবেশ গড়ে তোলে । 

ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলাফল

ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলে ইউরোপ এবং আবিষ্কৃত ভূখণ্ড গুলিতে নানা পরিবর্তন সূচিত হয় । 

প্রথমত , ভৌগোলিক আবিষ্কার ইউরোপের দেশগুলিতে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘর্ষের মুখোমুখি ঠেলে দেয় । নতুন নতুন ভূখণ্ডে উপনিবেশ স্থাপন করার লক্ষ্যে ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলি সশস্ত্র সংঘর্ষে লিপ্ত হয় । স্পেন , ইংল্যাণ্ড , ফ্রান্স , হল্যাও , প্রভৃতি দেশের মধ্যে সংঘটিত হয় এ ধরনের একাধিক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ । 

দ্বিতীয়ত , নব আবিষ্কৃত ভূখণ্ডগুলিতে ইউরোপীয় জাতি সমূহের অনুপ্রবেশ ও বসতি স্থাপনের ফলে ঐসব অঞ্চলের আর্থ সামাজিক জীবনে পরিবর্তন দেখা দেয় । সুসভ্য ও শক্তিশালী ইউরোপীয়দের আগমন ও বসবাসের ফলে ঐসব অঞ্চলের আদি সভ্যতা ও কৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যায় এবং এক ধরনের মিশ্র সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে । অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নব আবিষ্কৃত অঞ্চলগুলি বহিরাগত ঔপনিবেশিকদের শোষণের ক্ষেত্রে পরিণত হয় । 

আমেরিকা ও এশিয়া মহাদেশ থেকে প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ চলে আসে ইউরোপের দেশগুলিতে । তুলো , কাঁচা লোহা , সোনা , পশম ইত্যাদি নামমাত্র মূল্যে সংগ্রহ করে ঔপনিবেশিক দেশগুলি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে , আর সবকিছু হারিয়ে শ্রীহীন হয়ে পড়ে নতুন ভূখণ্ডগুলি । উদ্ভব ঘটে একদেশদর্শী ‘ মার্কেন্টাইলবাদ তত্ত্বের ‘ ( Mercantilism ) । ইউরোপের দেশগুলি আমদানি কমিয়ে রপ্তানি বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করে । ফলে মাতৃ দেশগুলির শিল্প বাণিজ্যের স্বার্থে ঔপনিবেশিকরা অধিকৃত ভূখণ্ডগুলির অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সম্পূর্ণভাবে পঙ্গু করে দিতে থাকে । 

তৃতীয়ত , ইতিপূর্বে ইউরোপের দেশগুলি , প্রধানত ইতালী , আরবের মাধ্যমে প্রাচ্য দেশের সাথে বাণিজ্য চালাত । ভূমধ্যসাগরে জলপথ আবিষ্কৃত হবার ফলে ইউরোপের সাথে প্রাচ্যের সরাসরি যোগাযোগ ঘটে । ফলে আরবদের বাণিজ্য মার খায় । ইতালীর ভেনিস , জেনোয়া , পিসা প্রভৃতি নগর ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের সূত্রে খুবই সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠতে পারে । 

কিন্তু কলম্বাস আটলান্টিক মহাসাগরের জলপথ আবিষ্কৃত করলে ভূমধ্যসাগরের বাণিজ্যিক গুরুত্ব হ্রাস পায় । ইতালীর নগরগুলির পরিবর্তে ইংল্যাণ্ডে , ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের একাধিক শহর , যেমন – লণ্ডন , লিভারপুল , আমস্টারডাম , মার্সেই , তুলো প্রভৃতি বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে । মেক্সিকোর সোনার খনির মালিক হয়ে স্পেন ইউরোপের সর্বাধিক ধনী দেশে পরিণত হয় । 

চতুর্থত , ভৌগোলিক আবিষ্কার ও ঔপনিবেশিক বাণিজ্য বিস্তারের ফলে বণিক সম্প্রদায় ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হাতে অর্থাগম ঘটে দ্রুত গতিতে । আর্থিক প্রতিপত্তি এই শ্রেণীকে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি স্থাপনে উদ্যোগী করে । এই শ্রেণী ক্রমে দখল করে মধ্যযুগের যাজক , অভিজাত ও ভূস্বামীদের স্থান । পরবর্তী কালে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নেতৃত্বেই সামন্ত প্রথা বিরোধী তথা উদারতাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধে । 

আরো পড়ুন : আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো

ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক কারণ গুলি আলোচনা করো

ভারতে ইউরোপীয় বণিকদের আগমন

error: Content is protected !!