জ্যাকোবিন ও জিরোন্ডিন দলের মধ্যে পার্থক্য

জ্যাকোবিন ও জিরোন্ডিন দলের মধ্যে পার্থক্য

ফরাসী বিপ্লবের ( ১৭৮৯ খ্রীঃ ) সূচনা করে তৃতীয় সম্প্রদায় ভুক্ত বুদ্ধিজীবী মধ্যবিত্ত ( বুর্জোয়া ) ও সাধারণ মানুষ । কিন্তু কালক্রমে বিপ্লবীদের মধ্যে আদর্শগত বিভিন্নতা দেখা দিতে থাকে । ফলে সংবিধান সভা চলাকালীন সময়েই সদস্যদের মধ্যে গোষ্ঠীগত মতভেদ দেখা দিতে শুরু করে । পরবর্তী পর্যায়ে ফরাসী বিপ্লবে গোষ্ঠী রাজনীতি প্রাধান্য লাভ করে । সেক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে জ্যাকোবিন ও জিরন্ডিন দল । 

দল ব্যবস্থা 

১৭৯১ খ্রীষ্টাব্দের নতুন আইন সভায় গোষ্ঠী রাজনীতি স্পষ্ট রূপ লাভ করে । নতুন আইন সভার অধিকাংশ সদস্য ফিউল্যান্টস , কর্ডলিয়ে এবং জ্যাকোবিন — এই তিনটি গোষ্ঠীভুক্ত ছিল । ক্রমে জ্যাকোবিন দল ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে ; এদের মধ্যে থেকেই জিরন্ডিন গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে ।

জ্যাকোবিন দল 

ফরাসী বিপ্লবের প্রথম পর্যায়ে ফ্রান্সে একাধিক বিতর্ক সভা বা ক্লাব গড়ে উঠেছিল । এদের মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ সোসাইটি অব দি ফ্রেন্ড অব দি কনস্টিটিউশন ‘ । জ্যাকোবিন মঠে এদের সভা বসত বলে এর সদস্যরা ‘ জ্যাকোবিন ‘ নামে পরিচিত হতে থাকে । সংবিধান সভা চলাকালীন জ্যাকোবিন ক্লাবের সদস্যরা অগণতান্ত্রিক নির্বাচনী যোগ্যতার বিরুদ্ধাচরণ করে এবং প্রজাতন্ত্র স্থাপনের জন্য দারি তুলতে থাকে । কিন্তু মিরাবো , লাফায়েত প্রমুখ নরমপন্থী বুর্জোয়া নেতারা উগ্রপন্থীদের দাবিকে অস্বীকার করতে থাকেন । 

উগ্রপন্থী নেতা ম্যারা তাঁর ‘ ফ্রেণ্ড অব দি পিপল ‘ নামক সংবাদপত্রে দাবি করেন যে , বিপ্লব শেষ হয়নি , বিপ্লব চলতে থাকবে । পক্ষান্তরে , মিরাবো সহ উচ্চ বুর্জোয়া নেতারা মনে করতেন , বিপ্লব শেষ হয়ে গেছে । এইভাবে সংবিধান সভায় নরমপন্থী ও উগ্রপন্থী ( জ্যাকোবিন ) নেতাদের মধ্যে সংঘাত শুরু হয় । এরই চরম পরিণতি ঘটে রাজার পলায়ন প্রচেষ্টার প্রশ্নে । চরমপন্থীরা রাজতন্ত্রের অবসান কাম্য বলে মনে করে । 

কিন্তু দক্ষিণপন্থীরা নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র কায়েম রাখতে আগ্রহী হয় । অতঃপর ( ১৬ ই জুলাই , ১৭৯১ খ্রীঃ ) জ্যাকোবিন ক্লাবের দক্ষিণপন্থী সদস্যরা জ্যাকোবিন ক্লাব ছেড়ে লাফায়েত এর নেতৃত্বে ‘ ফিউল্যান্ট ‘ নামে একটি নতুন গোষ্ঠী গড়ে তোলে ।

জিরন্ডিন দল 

নতুন আইন সভায় ‘ জ্যাকোবিন’দের পরিচয় ছিল বামপন্থী হিসেবে । এদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ‘ জিরন্ডিন ‘ নামে অভিহিত হত । প্রথমদিকে এই গোষ্ঠীর নেতা ব্রিসোর ( Brissot ) নামানুসারে এদের ব্রিসোডিন বা ব্রিসোপন্থী বলা হত । জিরন্ডিন কথাটি প্রথম ব্যবহার করেন লামার্তিন । জিরন্ডিন প্রদেশ থেকে নির্বাচিত হবার জন্যই তাদের এই নামকরণ হয় । 

‘ জিরন্ডিন’রা ছিল উচ্চ বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধি । তাই তারা সম্পত্তির অধিকার ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রবক্তা ছিল । এরা সাঁকুলাতদের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বিরোধী ছিল । এদের রাজনৈতিক আদর্শ ছিল বিকেন্দ্রীভূত প্রজাতন্ত্র । 

জিরন্ডিনরা প্যারিসের বিপ্লবী জনতাকে সন্দেহের চোখে দেখত এবং তাদের বিরোধিতা করত । অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বণিক  শিল্পপতিদের সাথে এদের ছিল সখ্যতা । কিন্তু একটি বিপ্লবী ক্রুসেডের দ্বারা এরা বিপ্লবকে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগী হয়েছিল । ফলে নতুন আইনসভায় এরা মন্ত্রিপরিষদ গঠনে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধই এদের কবরের মাটি খুঁড়েছিল ।

আরো পড়ুন : ফ্রান্সে সন্ত্রাসের রাজত্ব বলতে কী বোঝো

টিপু সুলতানের কৃতিত্ব

জুলাই বিপ্লব ও ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের তুলনা

error: Content is protected !!