ইকতা ব্যবস্থা কী

ইকতা ব্যবস্থা কী

‘ ইকতা ‘ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল একটি অংশ বা এলাকা । এবং রাজস্ব ব্যবস্থার বিচারে ইকতা শব্দের সাধারণ অর্থ হল ভূমি থেকে উৎপাদিত শস্যের ওপর কোনাে বিশেষ ব্যক্তি বা সমষ্টিকে সরকার কর্তৃক অধিকার দান । 

কে. এম. আশরফের  মতে খলিফা মুকতাদ সম্ভবত ইকতা ব্যবস্থার উদ্ভাবন করেন । একাদশ শতকে নিজাম-উল-তুসি নামে একজন সেলজুক তুর্কি ঐতিহাসিক এর ‘ সিয়াসৎ নামা ‘ নামক গ্রন্থে ইকতা প্রথার প্রচলনের উল্লেখ পাওয়া যায় । ত্রয়ােদশ শতকের সূচনা পর্বে দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিস ভারতে প্রথম ইকতা প্রথা বা ইকতা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন ।

ইকতা ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য

সুলতানি আমলে ‘ ইকতা ‘ ছিল একটি আর্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থা । ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কৃষকদের উৎপাদনের উদ্বৃত্ত অংশের একাংশ রাষ্ট্রের প্রাপ্য বলে বিবেচিত হত । ইরফান হাবিবের মতে , কৃষকদের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত ফসল আদায় করার জন্য যে প্রথা উদ্ভাবিত হয়েছিল , তাই ‘ ইকতা প্রথা ‘ নামে খ্যাত । সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক কাঠামোকে কোনভাবে দায়বদ্ধ না করে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ ও তা বণ্টনের ব্যবস্থা করা হয় । একজন শাসকের অধীনে দু’ধরনের জমি থাকত । যথা— 

( ১ ) সুলতানের খাস জমি বা রাজকীয় জমি , একে বলা হত ‘ খালিসা ‘ । এই জমির রাজস্ব সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করে সবটা রাজকোষে জমা দেওয়া হত । 

( ২ ) দ্বিতীয় ধরনের জমি সুলতান নির্দিষ্ট শর্তে ও কাজের বিনিময়ে তাঁর সৈনাধ্যক্ষ , সৈনিক ও অভিজাতদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন । এই জমিকে বলা হত ‘ ইকতা ‘ । ইকতার প্রাপককে বলা হত ‘ ইকতাদার ’ বা ‘ মাকতি ‘ । কখনো কখনো এঁরা ‘ ওয়ালি ‘ বা ‘ উলিয়াৎ ‘ নামেও অভিহিত হতেন । 

( ৩ ) এই মাকতিগণ নিয়মিত রাজস্ব আদায় ছাড়া প্রজাদের উপর অন্য কোন অধিকার আরোপ করতে পারতেন না । জমি ও কৃষকদের উপর মাকতির কোন স্থায়ী অধিকার ছিল না । মাকতি জানতেন যে , দেশ ও প্রজাকুলের উপরে একমাত্র সুলতানের অধিকার আইনত স্বীকৃত । 

( ৪ ) মাকতি ছিলেন সুলতান নিযুক্ত অছি মাত্র । অবশ্য মাকতি সুলতানের ইচ্ছানুসারে ইকতা থেকে আদায়ীকৃত রাজস্বের একাংশ ভোগ করতে পারতেন । বিনিময়ে তিনি একটি সেনাবাহিনী পোষণ করতেন , এবং সুলতানের প্রয়োজনে এই বাহিনী দ্বারা তাঁকে সাহায্য করতেন । তাছাড়া ঐ বাহিনীর মাধ্যমে নিজ নিজ অঞ্চলে শান্তি রক্ষা করা , নিরাপত্তা বিধান করা ও সুলতান বিরোধী যে কোন আন্দোলন দমন করাও মাকতি দের কর্তব্য ছিল । 

আরো পড়ুন : সুলতানি যুগের শাসন ব্যবস্থা

মনসবদারি প্রথা

ইকতা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য 

দিল্লির সুলতানরা ইকতা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে কয়েকটি উদ্দেশ্য পূরণ করতে চেয়েছিলেন । যেমন—

( ১ ) সুলতানেরা ইকতা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আসলে আমির ওমরাহদেরই সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিলেন । 

( ২ ) সুলতানি সাম্রাজ্য সীমা উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় দূরবর্তী অঞ্চল গুলির ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং যােগাযােগের অসুবিধা দেখা দিয়েছিল । তাই ইকতাদারদের ইকতা প্রদানের মধ্যে দিয়ে এই অসুবিধা দূর করার চেষ্টা করা হয়েছিল । 

( ৩ ) নতুন নতুন বিজিত অঞ্চলগুলি থেকে রাজস্ব আদায় প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল । এই অনিশ্চয়তা দূর করবার জন্য ইক্তাদারদের নিয়োগ করা হয়েছিল । 

( ৪ ) দিল্লি সুলতানি শাসনকে সুরক্ষিত ও দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য এবং সামন্ততন্ত্রের ধ্বংস সাধন করবার লক্ষ্যে ইকতা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল ।

সুলতানি যুগের ইকতা ব্যবস্থা

ইলতুৎমিসের আমলে ইকতা ব্যবস্থা :

ইলতুৎমিস মূলত তুর্কী সেনাপতিদের মধ্যে ইকতা বিলি করেন এবং ইক্তা ব্যবস্থাকে প্রাদেশিক শাসনের ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলেন । তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল নববিজিত অঞ্চলের উপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা । এজন্য তিনি তুর্কী সমর নায়কদের মধ্যে নববিজিত স্থানগুলিকে ইকতা হিসেবে বিলি করে দেন । কিন্তু ইকতা ব্যবস্থার মধ্যেই সামন্ততন্ত্রের বীজ লুকিয়ে থাকায় বিচক্ষণ ইলতুৎমিস মাকতিদের বিভিন্ন ইকতায় বদলি করার নীতি নেন । কেবল দোয়াব অঞ্চলেই তিনি প্রায় ২ হাজার তুর্কী সৈনিকদের মধ্যে ইকতা বিলি করেন । তাঁর তীক্ষ্ণ নজরদারির ফলে এই সকল ইক্তাদার সুলতানির সহায়ক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য ছিলেন । 

বলবনের আমলে ইকতা ব্যবস্থা :

ইলতুৎমিসের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে এবং গিয়াসুদ্দিন বলবন কর্তৃক সিংহাসনে আরোহণের মধ্যবর্তীকালে ইকতা ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত বিপজ্জনক দিকটি প্রকট হতে থাকে । মাকতিরা কেন্দ্রীয় সরকারকে অগ্রাহ্য করতে শুরু করেন । ফলে সুলতানি সাম্রাজ্যের সংহতি ও শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ইকতা ব্যবস্থা সুলতানির দুর্বলতার ও বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায় । 

এই অবস্থায় বলবন ইক্তার উপর কেন্দ্রের কর্তৃত্ব সুদৃঢ় ও নিশ্চিত করার জন্য কিছু ব্যবস্থা নেন । বড় ইকতার মাকতিদের প্রধান কর্তব্য ছিল ইকতার ব্যয় সঙ্কুলানের পর উদবৃত্ত অর্থ কেন্দ্রীয় রাজকোষে জমা দেওয়া । কিন্তু মাকতি এমনভাবে হিসেব প্রস্তুত করতেন যে , অর্থ কখনই উদবৃত্ত হত না । বলবন ইকতার হিসেব রক্ষা ও কেন্দ্রের প্রাপ্য যথাযথ আদায়ের জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেন । ‘ খোয়াজা ‘ নামক এক শ্রেণীর হিসাব পরীক্ষক নিয়োগ করে ইক্তার প্রকৃত আয়-ব্যয় এবং উদবৃত্ত অর্থের সঠিক হিসেব রক্ষার ব্যবস্থা করেন । 

আলাউদ্দিন খলজীর আমলে ইকতা ব্যবস্থা :

আলাউদ্দিন খলজীর শাসনকালে ইকতা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করা হয় । তিনি কেবলমাত্র দূরবর্তী অঞ্চলগুলিকে ইক্তা ব্যবস্থার অধীনে রাখেন । দিল্লীর নিকটবর্তী স্থানগুলিকে খালিসা জমিতে পরিণত করে সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি করেন । সৈন্যদের ইক্তার পরিবর্তে নগদ বেতন দানের ব্যবস্থা করেন । এছাড়া আলাউদ্দিন প্রতিটি ইকতার রাজস্বের হার নির্দিষ্ট করে দেন । ফলে ইক্তাদার ফাঁকি দিতে বা শোষণ করতে ব্যর্থ হয় । সেই সঙ্গে তিনি নিয়মিত ইতার আয় ব্যয়ের হিসেব পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন । অযোগ্য বা দুর্নীতিগ্রস্ত ইকতাদারদের তিনি কঠোর শাস্তি দানের ব্যবস্থা করেন । 

গিয়াসুদ্দিন তুঘলকের আমলে ইকতা ব্যবস্থা :

গিয়াসুদ্দিন তুঘলকের আমলে ইক্তাদারদের উপর দিল্লীর নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শিথিল করা হয় । তিনি বিভিন্ন ইক্তার রাজস্ব নির্ধারণ ও তা আদায়ের ব্যাপারেও কিছুটা উদারতা দেখান । ইকতা জমির বার্ষিক রাজস্ব বৃদ্ধির হার ১/১০ বা ১/১১ অংশের অধিক হবে না বলে সিদ্ধান্ত নেন । সামরিক বাহিনীর খরচ বাবদ নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের রাজস্বের কোন অংশ মাকতি ( ইকতাদার ) গ্রহণ করতে পারবে বলে জানিয়ে দেন । 

মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে ইকতা ব্যবস্থা :

মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে রাজস্ব সংগ্রহ ও সেনা বাহিনীর পোষণ কাজ দুটিকে পৃথক করা হয় । রাজস্বের জন্য নির্দিষ্ট ভূখণ্ড সর্বোচ্চ নিলাম দারকে অর্পণ করা হয় । অর্থাৎ ইকতার একাংশে ‘ ইজারাদারী ‘ ব্যবস্থা কায়েম হয় । অন্য অংশ থাকে সেনাবাহিনীর ব্যয় সঙ্কুলানের জন্য । এই অংশটি ইক্তাদারের হাতে থাকে । তিনি সাধারণ সেনাদের নগদ অর্থে বেতন দানের ব্যবস্থা করেন । কেবল অতি উচ্চ পদমর্যাদার সেনাধ্যক্ষগণ ‘ ইকতা ’ পেতে পারতেন । 

ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমলে ইকতা ব্যবস্থা :

ফিরোজের আমলে ইক্তা ব্যবস্থা তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয় । তিনি ইকতার উপর মাকতির বংশানুক্রমিক অধিকার স্বীকার করে নেন । ফলে অযোগ্য ও অদক্ষ ব্যক্তিরা ইক্তার অধিকারী হন । পরিণামে দক্ষ সেনাবাহিনীর সংগ্রাহক হিসেবে ইকতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে । 

ইকতা ব্যবস্থার কতকগুলি সহজাত ত্রুটি লক্ষণীয় । সামন্ত প্রথার কুফল দূরীকরণের উদ্দেশ্যে ইতা প্রচলিত হলেও কালক্রমে এটিই সামন্তপ্রথার ত্রুটিতে আবৃত হয়েছিল । অধিকাংশ খালিসা জমি ইকতার অধীনে আসার ফলে সরকারের রাজস্বখাতে আয় অনেক হ্রাস পেয়েছিল । ইকতা পদ বংশানুক্রমিক হওয়ার ফলে পরবর্তীকালে ইকতাপ্রাপ্ত বংশগুলির রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা প্রকট হয়েছিল ।

আরো পড়ুন : প্রাচীন ভারতে সামন্ততন্ত্রের বিকাশ

রাজপুত কাদের বলা হয়

গুপ্ত যুগকে সুবর্ণ যুগ বলা হয় কেন

error: Content is protected !!