গিল্ড বা বণিক সংঘ কী

গিল্ড বা বণিক সংঘ কী

প্রাচীন ভারতে শুঙ্গ , সাতবাহন , ইন্দো-গ্রীক , চোল প্রমুখ আঞ্চলিক শক্তিগুলির রাজনৈতিক উত্থান পতনের মধ্যে ভারতের বণিক সম্প্রদায়ের শক্তি দৃঢ়তর হয়েছিল । উত্তর-পশ্চিম ভারতে অভারতীয় শাসকদের অবস্থান বাণিজ্য বৃদ্ধির সহায়ক হয়েছিল । 

পশ্চিম এশিয়া , মধ্য এশিয়া , ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও চীনের সঙ্গে এই সময় ভারতের বাণিজ্যিক লেনদেন শুরু হয়েছিল । বণিকদের মাধ্যমে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম প্রসারিত হয়েছিল বহির্ভারতে । বণিক শ্রেণী এই সময় পেশাগত স্বার্থে শিল্প বা বাণিজ্যকে সংগঠিত রূপদানে ব্রতী হয়েছিল । Guild বা সঙ্ঘের মাধ্যমে তাদের সাংগঠনিক রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । প্রাচীন সাহিত্যে গণ , পুঞ্জ , সঙ্ঘ বা নিগম প্রভৃতি শব্দগুলি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে । 

গিল্ডের উৎপত্তির কারণ

প্রাচীন ভারতে ঠিক কি কারণে Guild বা সঙ্ঘের উৎপত্তি হয়েছিল তা বলা কঠিন । সম্ভবত কারিগর বা শ্রমিকশ্রেণী ধনীদের অত্যাচার থেকে নিজেদের বাঁচানোর তাগিদে Guild গঠন করে । পরবর্তীকালে বৃত্তিগত নিরাপত্তা রক্ষার তাগিদে বণিক , সৈনিক , পুরোহিত প্রভৃতি বিভিন্ন পেশার মধ্যে সঙ্ঘ তৈরির প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে । 

Guild তৈরির আর একটি কারণ হিসাবে শিল্পের স্থানীয়করণ ( localisation ) কে দায়ী করা হয় । একটি নির্দিষ্ট স্থানে কেবল এক শ্রেণীর কারিগরের অবস্থানের কথা জাতক গ্রন্থগুলি থেকে পাওয়া যায় । ফলে এক একটি অঞ্চলে এক এক পেশায় সঙ্ঘ গঠন সহজ হয় । ধীরে ধীরে গিল্ডের আয়তন বৃদ্ধি পাবার ফলে এই সংগঠনের মাধ্যমে নিরাপত্তার পাশাপাশি এর সদস্যরা সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির সুযোগ পায় । উপরন্তু গিল্ডের সাথে যুক্ত বণিক বা কারিগর গিল্ডের সম্মিলিত মনোভাব থেকে বিশেষ আত্মসম্মান বোধ অর্জন করত । 

গিল্ডের সাংগঠনিক ভিত্তি 

Richard Fick মনে করেন শিল্প ও বাণিজ্যে গিল্ডের সাংগঠনিক চরিত্র এক ছিল না । বংশানুক্রমিক বাণিজ্যে লিপ্ত ব্যবসায়ীরা তাদের নেতার অধীনে সঙ্ঘবদ্ধ হত । কিন্তু তাদের সংগঠন খুব উঁচু স্তরে ছিল না । অন্যদিকে কারিগররা বংশানুক্রমিক ভাবে বৃত্তি গ্রহণ করতো । তাই Guild গঠনের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিকতা ছিল । তবে শিল্পে যতটা নিশ্চিত ভাব ছিল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ততটা ছিল না । 

আরো পড়ুন : প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান

প্রাচীন সাহিত্যে গিল্ড ব্যবস্থা

বৈদিক সাহিত্যে গিল্ডের সমধর্মী সংগঠনের আভাস পাওয়া যায় । কিন্তু বৌদ্ধ শাস্ত্র ও জাতক সমূহে গিল্ডের স্পষ্ট উল্লেখ আছে । জাতকের বিভিন্ন অংশ থেকে গিল্ডের গুরুত্ব সম্পর্কে জানা যায় । প্রতি গিল্ডের প্রধান পরিচালককে বলা হত অধ্যক্ষ বা মুখ্য । জাতকে একেই বলা হয়েছে জেথত্থক বা প্রমুখ । এর প্রধান পরিচালক সাধারণত ধনী ব্যক্তি হতেন বা রাজানুগ্রহ ভাজন হতেন । অধ্যক্ষকে সাহায্য করত পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট হিতবাদিনকার্যচিন্তক নামক দুটি উপদেষ্টা সমিতি । 

অর্থশাস্ত্রে জানা যায় একজন হিসেব পরীক্ষক বাণিজ্যিক গিল্ডগুলির হিসেব রক্ষা করতেন । ধর্মশাস্ত্রের যুগে গিল্ডের রীতিনীতিকে আইনের স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং গিল্ডের অধিকার ও মর্যাদা রাষ্ট্র দ্বারা সুরক্ষিত করার অস্বীকার করা হয় । গিল্ডের সনদ মান্য করা সদস্যদের ক্ষেত্রে ছিল বাধ্যতামূলক । 

গিল্ডের অর্থনৈতিক ভূমিকা 

গিল্ডের উৎপত্তির মূলে ছিল কারিগরি বৃত্তিগুলিকে সংগঠিত ও সুরক্ষিত করার প্রেরণা । পেশাগত শিল্প বাণিজ্যের ক্ষেত্র সুগম করার পাশাপাশি প্রাচীন গিল্ডগুলি আধুনিক ব্যাঙ্কের ভূমিকা পালন করত । নগদ অর্থ বা স্থাবর সম্পত্তি আমানত হিসেবে জমা রেখে গিল্ড ঋনদান করতো । সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে আমানতকারী হিসেবে দেখা যায় । এই থেকে গিল্ডের জনপ্রিয়তা ও বিশ্বস্ততা প্রমাণিত হয় । 

বৌদ্ধসূত্র অনুসারে প্রাচীন যুগের গিল্ডগুলি তার সদস্যদের অর্থনৈতিক জীবনের পাশাপাশি সামাজিক জীবনকেও নিয়ন্ত্রণ করতো । গৌতম ধর্মসূত্রে বলা হয়েছে যে বিভিন্ন বৃত্তিজীবী শ্রেণী বা গিল্ড নিজ নিজ সদস্যদের জন্য আইন প্রণয়নের অধিকারী ছিল । 

গিল্ডের প্রশাসনিক ভূমিকা 

বিনয় পিটক এ গিল্ডের শাসন ও বিচার ক্ষমতার উল্লেখ পাওয়া যায় । খ্রীঃ পূঃ চতুর্থ শতকে গিল্ড রাষ্ট্র কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছিল । অর্থশাস্ত্রে গিল্ডের সামরিক শক্তির উল্লেখ আছে । রাজা প্রয়োজন হলে এদের সাহায্য নিতেন । একে বলা হত শ্রেণীবল । গিল্ডের ক্রমবিকাশের আর একটি স্তর হল তার রাজনৈতিক বৈধতা লাভ । গিল্ডের অধিকার সেখানে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দ্বারা দৃঢ় ভিত্তি পেয়েছে । 

এইভাবে গিল্ড ক্রমান্বয়ে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি সংস্থায় উন্নীত হয়েছে । গিল্ডের কর্মধারায় বিভিন্ন নিয়মকানুন ছিল । ক্রেতা ও কারিগর উভয়ের স্বার্থ বিবেচনা করে গিল্ড পণ্যমূল্য স্থির করত । প্রতি গিল্ডের নিজস্ব শীলমোহর , প্রতীক ও পতাকা থাকতো । জাতি প্রথার ফলে গিল্ডের সদস্যের অভাব হত না । কারণ নির্দিষ্ট বর্ণ বা উপবর্ণের লোক পুরুষানুক্রমে একই শিল্পচর্চা করত । আবার বর্ণ ব্যবস্থার ফলে বিভিন্ন গিল্ডের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিল । 

D. D. Kosambi গুপ্ত যুগের গিল্ড সম্পর্কে বিশেষ উৎসাহ দেখাননি । তাঁর মতে ভারত রোম বাণিজ্যের পতন ও বৌদ্ধ ধর্মের উত্থানের ফলে ভারতের দুরপাল্লার বাণিজ্যে ভাটা পড়েছিল । পরিবর্তে শুরু হয়েছিল এলাকা ভিত্তিক বাণিজ্য । এই নতুন পরিস্থিতিতে গিল্ডগুলির কার্যকারিতা শিথিল হয়েছিল । 

কিন্তু R.C. Majumdar মনে করেন কুষাণ ও গুপ্ত যুগে গিল্ডের কৌলিন্য ও জটিলতা দুইই বেড়েছিল । নিজের স্বাধীনতাকে প্রয়োগ করে গিল্ডগুলি শক্তির কেন্দ্র ও প্রগতির আধার হয়ে দাঁড়িয়েছিল । গিল্ডগুলি ছিল যুগোপৎ সামাজিক শক্তি ও অলংকার । স্কন্দগুপ্তের ইন্দোরলেখ ও কুমারগুপ্তের মান্দাসোর লেখ থেকে গিল্ডের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায় । 

গিল্ডের ধর্মীয় ভূমিকা

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য গিল্ডের বিভিন্ন দামের উল্লেখ পাওয়া যায় । অনেক সময় গিল্ড নির্দিষ্ট কাজের বিনিময়ে ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতো । যেমন কোন মন্দিরে নিয়মিত প্রদীপ জ্বালানোর জন্য কিংবা বিশেষ সময়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের নতুন পোশাক দেওয়ার জন্য গিল্ড চুক্তিবদ্ধ হত । সাধারণভাবে কোন বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষ গিল্ডের বাইরে থেকে অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারত না । কারণ ব্যক্তির পক্ষে গিল্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সম্ভব ছিল না । তাছাড়া গিল্ডে যোগ দিলে সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেত । 

নেতাদের কর্তৃত্ব 

অনেকের ধারণা গিল্ডের নেতৃবৃন্দ নাগরিক জীবনে বিশেষ প্রতিপত্তি ভোগ করতেন । কিন্তু উষভ দত্তের নাসিক গুহা লিপি থেকে জানা যায় যে এদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না । তখন রাজনীতিকে রাজার বিশেষ অধিকারের বিষয় বলে মনে হত । এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বলা হয় যে রাজার সাথে গিল্ডের অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিল । কারণ সুস্থ বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থাগম ঘটত । তাই রাজা গিল্ডের স্বাভাবিক কাজকর্মে হস্তক্ষেপ করতেন না । 

অর্থাৎ প্রাচীন যুগে গিল্ডগুলি গতানুগতিক বা সংকীর্ণ স্বার্থ সিদ্ধ করার যন্ত্র ছিল না । সুস্থ সংস্কৃতি , সামাজিক নিরাপত্তা ও আর্থিক প্রগতির ক্ষেত্রেও এদের নির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল ।

আরো পড়ুন : বৈদিক যুগের ধর্মীয় জীবন

সিপাহী বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহের ধর্মীয় কারণ

error: Content is protected !!