রাজপুত কাদের বলা হয়

রাজপুত কাদের বলা হয়

‘ রাজপুত্র ‘ শব্দটির অপভ্রংশ রূপ হল ‘ রাজপুত ‘ । হর্ষবর্ধনের পূর্বে উত্তর ভারতে রাজপুত জাতির অভ্যুত্থান ভারত  ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা । দ্বাদশ শতাব্দীর মুসলমান আক্রমণ প্রতিহত করে হিন্দুধর্ম , সংস্কৃতি ও সভ্যতা রক্ষার জন্য রাজপুতদের আত্মদানের বীরত্বপূর্ণ কাহিনী আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়ে থাকে । 

ড. স্মিথের মতে , অষ্টম ও দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী কালে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাজপুতদের ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । তাই বহু পণ্ডিত ৭১২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে ভারতের ইতিহাসে ‘ রাজপুত যুগ ‘ বলে অভিহিত করেছেন । 

রাজপুত জাতির উৎপত্তি

রাজপুতদের উৎপত্তি সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে । 

( ১ ) জি. এস. ওঝা , সি. ভি. বৈদ্য প্রমুখ কাহিনী ও কিংবদন্তীর উপর নির্ভর করে রাজপুতগণকে সূর্য ও চন্দ্র বংশোদ্ভূত বলে অভিহিত করেছেন । মেবারের রানাগণ নিজেদের রামচন্দ্রের বংশধর বলে দাবি করতেন । 

( ২ ) আবার নৃতত্ত্বমূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে অনেকে রাজপুতদের আর্যগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে মন্তব্য করেছেন । 

( ৩ ) কিন্তু স্মিথ প্রমুখ ঐতিহাসিক এই দাবি অযৌক্তিক বলে বলেছেন যে , রাজপুত জাতির আর্যীকরণের যুক্তি এই যে , তারা সতীদাহ , জহরব্রত , সূর্য আরাধনা ইত্যাদি আর্যদের আচার অনুষ্ঠানগুলি অনুসরণ করত , রাজপুত রাজারা অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করতেন ইত্যাদি । কিন্তু এইসব যুক্তিকে খণ্ডন করে বলা হয় যে , সতীদাহ , জহরব্রত বা অশ্বমেধ যজ্ঞ ইত্যাদি প্রথা ভারতীয়দের কাছে বহুল পরিচিত ও প্রচলিত । তাই এই অনুক্ষণ পালনের জন্যই রাজপুতদের আর্য বলা যুক্তিপূর্ণ নয় । 

( ৪ ) এই প্রসঙ্গে কবি চাঁদবরদাই’র ‘ অগ্নিকুল তত্ত্বে’র কথা বলা যায় । ‘ পৃথ্বীরাজ রসো ’ কাব্যে তিনি উল্লেখ করেছেন যে , বশিষ্ঠ মুনির যজ্ঞকুণ্ড থেকে রাজপুত মাটির সৃষ্টি হয়েছে । যজ্ঞকুণ্ড থেকে উত্থানের ব্যাখ্যা হল অগ্নিকর্তৃক যুদ্ধীকরণ । নীচবংশ সম্ভৃতদের ক্ষেত্রেই অগ্নিশুদ্ধির প্রয়োজন হয় , উচ্চকুলজাত অর্থাৎ আর্যদের ক্ষেত্রে নয় । অবশ্য ‘ অগ্নিকুল তত্ত্বে’র ঐতিহাসিক ভিত্তি সম্পর্কেও পণ্ডিতদের দ্বিধা আছে । 

‘ রাজস্থানের ইতিহাস ‘ গ্রন্থের রচয়িতা কর্নেল টড এবং অন্যান্য আধুনিক পণ্ডিতদের মতে , বহিরাগত হন , গুর্জর প্রভৃতি জাতির সাথে ভারতীয় জাতিগুলির সংমিশ্রণে রাজপুতদের উদ্ভব হয়েছিল । বৃত্তি অনুসারে যারা রাজ্য স্থাপন করে শাসনকার্য শুরু করেছিল , তারা রাজপুত বা ‘ ক্ষত্রিয় ‘ নামে পরিচিতি লাভ করে । রাজপুতনার কোন কোন অঞ্চলে ‘ রাজপুত ‘ শব্দের অর্থ ক্ষত্রিয় সামন্ত বা জায়গিরদারদের অবৈধ সন্তান । স্মিথও এই মতকে সমর্থন করেছেন । তবে রাজপুতদের সব গোষ্ঠীই বহিরাগত জাতির সংমিশ্রণে উদ্ভূত ছিল না । যেমন , চান্দেলগণ ও গাহড়বালগণ ছিল ভারতীয় জাতিগোষ্ঠী থেকে উদ্ভুত ।

আরো পড়ুন : ঔরঙ্গজেবের রাজপুত নীতি

আকবরের রাজপুত নীতি

বিভিন্ন রাজপুত গোষ্ঠী 

ভারতের রাজপুত বংশগুলির মধ্যে গুজরাটের চালুক্যগণ , আজমীর ও দিল্লীর চৌহানগণ , কনৌজের গাহড়বালগণ , বুন্দেলখণ্ডের চান্দেলগণ ও পারমার এবং কলচুরিগণ ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য । 

চালুক্য বংশ : 

গুজরাটের চালুক্য বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন জয়সিংহ । এই বংশের রাজধানী ছিল আনহিলবারা । চালুক্যগণ আজমীরের চৌহানদের সাথে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন । ফলে শক্তি হ্রাস পায় । সেই সুযোগে মালব , মেবার প্রভৃতি অঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ।

চৌহান বংশ : 

চতুর্থ বিগ্রহরাজের আমলে আজমীরে চৌহানগণ এক শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হয় । বিগ্রহরাজ দিল্লী , পূর্ব পাঞ্জাব , দক্ষিণ রাজপুতানা প্রভৃতি অঞ্চল জয় করে চৌহান শাসনকে সুবিস্তৃত করেন । এই বংশের শেষ শাসক তৃতীয় পৃথ্বীরাজকে উত্তর ভারতের শেষ শক্তিশালী হিন্দু রাজা বলে মনে করা হয় । তিনি কালিঞ্জর , আনহিলবার , রোহিলাখণ্ড , মনবা প্রভৃতি স্থান নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন । তাঁর শেষ উল্লেখযোগ্য কীর্তি হল তরাইনের প্রথম যুদ্ধে মহম্মদ ঘুরীকে পরাজিত করা । অবশ্য তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে ( ১১৯২ খ্রীঃ ) পৃথ্বীরাজ ঘুরীর নিকট পরাজিত হন ।

গাহড়বাল বংশ : 

কনৌজে গাহড়বাল বংশের শাসনের সূচনা করেন চন্দ্রদেব । তিনি কলচুরিদের কাছ থেকে এলাহাবাদ , বারাণসী এবং রাষ্ট্রকূটদের কাছ থেকে পাঞ্চাল অধিকার করেন । এই বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক গোবিন্দচন্দ্র উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল কনৌজের অন্তর্ভুক্ত করেন । মহম্মদ ঘুরীর আক্রমণকালে এই বংশের শাসক ছিলেন জয়চন্দ্র । পৃথ্বীরাজের সাথে শত্রুতাবশত জয়চন্দ্র তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বীরাজকে সাহায্য করেননি । নতুবা মহম্মদ ঘুরীর পক্ষে জয়লাভ সম্ভব হত না । অবশ্য পরে মহম্মদ ঘুরীর হাতেই তিনি নিহত হন । 

চান্দেল্ল বংশ :

নবম খ্রীষ্টাব্দে যশোবর্মন বুন্দেলখণ্ডে চান্দেল্ল বংশের প্রতিষ্ঠা করেন । এই বংশের পরাক্রমশালী নৃপতি পরমাদদেব দিল্লীর চৌহানবংশীয় রাজা পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করেন । এই বংশের শেষ নৃপতি ছিলেন পেরামল । তাঁর সময় মাহরা , কালিঞ্জর চান্দেল্লদের রাজ্যভুক্ত ছিল । শিল্প ও স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চান্দেল্ল বংশীয় নৃপতিগণ স্মরণীয় । খাজুরাহোর স্থাপত্য সুষমা মণ্ডিত মন্দিরগুলি এঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত হয়েছিল , যা আজও সৌন্দর্য রসিকদের বিস্ময় সৃষ্টি করে । 

চেদী বংশ : 

উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত গোদাবরী ও নর্মদা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে ছিল চেদী রাজ্য । খ্রীষ্টীয় দশম শতকে লক্ষ্মণ রাজা চেদীবংশের শাসনের সূচনা করেন । দশম শতকে চেদী রাজ্য আর এক রাজপুত বংশ পারমারদের হস্তগত হয় । 

পারমার বংশ : 

প্রতিহার ও চেদী রাজ্যের উপর স্বাধীন পারমার বংশের শাসন শুরু হয় দ্বাদশ শতকে । পারমার বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন ভোজ । সুযোদ্ধা , সুশাসক ও সংস্কৃতিবান শাসক হিসেবে তিনি কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন । বিস্তৃত ভোজপুর হ্রদ ও ধারার সংস্কৃত বিদ্যালয় তাঁর অন্যতম মহান সৃষ্টি । তাঁর মৃত্যুর পরেই পারমারদের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে । 

কালক্রমে তুর্কো-আফগানদের নিকট পরাজিত হলে রাজপুত রাজ্যগুলির অবসান ঘটে ।

আরো পড়ুন : রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য

ষোড়শ মহাজনপদ

প্রথম মহেন্দ্র বর্মন এর কৃতিত্ব

error: Content is protected !!